• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads

মতামত

ভাষার প্রতি ভালোবাসা, আলো-আশার বাংলা ভাষা

  • মোমিন মেহেদী
  • প্রকাশিত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভাষার মাস, ভাষা আন্দোলনের মাস, ভাষা সংরক্ষণের মাস ফেব্রুয়ারি এলেই সোচ্চার হয়ে ওঠেন অ-নে-ক ভাষাসৈনিক ও ভাষা গবেষক। ভাষার মাসে সকল পত্রিকা-চ্যানেল থাকে তাদের দখলে। এই সুযোগে গড়ে নেয় আখেরও কেউ কেউ। এরপর সারা বছর তারা রাজনীতিকদের-ব্যবসায়ীদের গোলাম হিসেবে ব্যস্ত হয়ে থাকেন। যে কারণে নির্মমভাবে বাংলা ভাষা সারা বছর ধর্ষিত হয়; হয় ভাষার চরম দূষণও। কিন্তু তারা কথা বলেন না; আসেন না সমাধানের দাবিতে এগিয়েও। বিনিময়ে আমরা আমাদের মায়ের ভাষা সংরক্ষণের পরিবর্তে দেখি ক্রমশ দূষিত হতে। বৃহ্নলা ভাষা চর্চার মধ্য দিয়ে এগিয়ে আসে স্বাধীনতাবিরোধী-দেশবিরোধীদের রেডিও নামক ভাষা বিকৃতকারী বেশ কিছু এফএম প্রতিষ্ঠান; এগিয়ে আসে স্বাধীনতা বিরোধিতার পাশাপাশি ভাষাবিরোধী গণমাধ্যমও। যেমন- ইনসাফ, জিন্দাবাদ, এলহাম, এলান নামক সহস্রাধিক উর্দু ভাষাচর্চাকারী গণমাধ্যম ও প্রতিষ্ঠান। সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার ধ্বজাধারী আরো সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান তো আছেই। এদের কারণে নিখাদ বাংলা ভাষার-গণমানুষের রাজনৈতিক কোনো দল এগিয়ে যেতে পারছে না। বরং উর্দু-ইংরেজি ভাষার সম্মিলন ঘটিয়ে এগিয়ে আসছে ছলাকলার রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। অথচ আমরা এদের প্রায়ই বলতে শুনি বাংলা ভাষা আমাদের অহঙ্কার ও গর্বের ভাষা। ১৯৫২ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা পেয়েছিলাম বাংলা ভাষার সাংবিধানিক মর্যাদা। বাংলা আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস। বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য রক্ত দিয়েছে পৃথিবীর কোনো জাতি। আর এ ঐতিহাসিক ঘটনার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। রচিত হয় বাংলা ভাষার নতুন অধ্যায়, অধিকতর উচ্চ আসনে উন্নীত হয় ‘বাংলা’। ভাষা আন্দোলনের হাত ধরেই বাঙালি হয় সংঘবদ্ধ, পরবর্তীতে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে বাংলার আকাশে উদিত হয় নতুন সূর্য। বাংলাদেশিরা পায় নিজস্ব পতাকা, নিজস্ব ভূখণ্ড, নিজস্ব দেশ-বাংলাদেশ। এরপর এ পর্যন্ত এ দেশের ক্ষমতায় এসেছে নানা নাটকীয় পরিবর্তন। এদেশের মানুষের চিন্তাচেতনা, জীবন-যাপন প্রণালি সবকিছুতে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। আমরা হয়ে উঠেছি পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকারক। দেশে তৈরি হয়েছে অনেক খ্যাত-অখ্যাত ইংরেজি ভার্সন ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে আমূল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের আসন মজবুত করা ও নিজেদের বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করার জন্য ইংরেজি ভার্সন ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই কোনোভাবেই। কিন্তু আশঙ্কা ও উদ্বেগের জায়গাটি হলো- এসব ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর কারিকুলাম আমাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ? খোঁজ নিলেই দেখতে পাবেন, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষা বাংলায় কথাও বলতে পারে না সঠিকভাবে। বাংলাকে ইংরেজির মতো করে উচ্চারণ, ইংরেজি সাহিত্য, ইংরেজি নভেল, ইংরেজি টিভি সিরিয়াল, ইংরেজি মুভি, ইংরেজি গেমস, ইংরেজি গল্প, ইংরেজি কমিকস ইত্যাদির প্রতি আসক্ত তারা নিজেদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ইত্যাদি তাদের ভাষায় ‘ক্ষ্যাত’। এর জন্য দায়ী কে বা কারা? শুধুই কি শিক্ষার্থীরা? কোনোই দোষ নেই কর্তা ব্যক্তিদের?

বাংলাদেশের গণমাধ্যম অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ধারায় দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে গণমাধ্যমের সংখ্যা। বেতার শিল্পে নতুন ধারা যুক্ত করেছে প্রাইভেট এফএম রেডিও চ্যানেলগুলো। এসব রেডিওতে অনুষ্ঠান উপস্থাপকরা (তাদের ভাষায় রেডিও জকি বা জঔ) শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও বাংলাকে ইংরেজির মতো করে বাংলিশ কায়দায় উচ্চারণ ইত্যাদি মিশিয়ে খিচুড়ি ভাষায় যেসব কথাবার্তা বলেন, স্বভাবতই আমাদের নতুন প্রজন্ম নিজেদের স্মার্ট প্রমাণ করার জন্য সেগুলো অনুকরণ করছে। আর বরাবরই যেহেতু তরুণ সম্প্রদায় মিডিয়াকে আধুনিকতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। সেহেতু তারা এফএম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দূষণ করছে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি ও সমাজকে। কোনোভাবেই, কারোরই যা কাম্য নয়। এখানে এ কথাও মনে করিয়ে দিতে চাই যে, বর্তমান বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী তরুণ। সুতরাং এভাবে চলতে থাকলে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, জঘন্যভাবে বাংলা ভাষা হারাবে তার নিজস্ব স্বকীয়তা। যা যেকোনো উপায়েই প্রতিরোধ করতে হবে বলে আমি মনে করি।

বিবেক-বিবেচনার আলোকে বলতে পারি, আমাদের রাজনীতিক-সাংবাদিক ও ব্যবসায়িক অনেকেই ইংরেজিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মাতৃভাষাকে পরিত্যাগ করছি, ইংরেজির পাশাপাশি একই নামফলকে যদি বাংলাও ব্যবহার করা হয় তবে দেখা যায় সে বাংলাটা গৌনরূপে জায়গা পাচ্ছে। অর্থাৎ যেন না-পারতে তাকে স্থান দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমরা যা করছি তা তো আরো দোষণীয় এ জন্য যে, সেই ইংরেজিটাও শুদ্ধরূপে লিখছি না। তবে এতে করে কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের মতো ব্যক্তি যেমন তার মান বাড়াতে গিয়ে মান খোয়াচ্ছেন; তেমনই জাতি হিসেবে আমাদের সম্মান খোয়াতে হচ্ছে বলে আমি মনে করি। অন্য ভাষার অশুদ্ধ ব্যবহারে, অন্য ভাষার অমর্যাদা করার কারণে সে ভাষার লোকদের কাছে আমরা ছোট হয়ে যাচ্ছি। এমনকি আমাদের করণীয় কতটা, তাও ভুলে যেতে বসেছি। এই পরিস্থিতির উত্তরণে বলছি- সিটি করপোরেশন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামফলকগুলো কত ফুট, কত ইঞ্চি, কত গজ হবে তার জন্য লাইসেন্স ফি-এর সঙ্গে একটা ফিও আদায় করে থাকে। এই নামফলকের আকার-আকৃতির জন্য ফি আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা যদি নামফলক শুদ্ধকরণের জন্য একটা দায়িত্ব পালন করত তাহলে সেটা আমাদের এই লজ্জা থেকে উদ্ধার করতে পারত। অবশ্য তারা এখনো নিয়ম করতে পারে যে, কোনো দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামফলকটি কেমন হবে তার নমুনা নিয়ে, তাতে বাংলাকে প্রাধান্য দিয়ে, অন্য ভাষায় কী কী লেখা হবে তার বিস্তারিত নিয়ে সেগুলোর ভাষাগত শুদ্ধতা নিশ্চিত করে অনুমতি প্রদান করবে। এ কাজের জন্য তারা নিজেরা একটি বিভাগ করতে পারে কিংবা এটি তারা বাংলা একাডেমিকে অনুরোধ করে করিয়ে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমিও এ কাজে জনস্বার্থে সহযোগিতা প্রদানের প্রয়োজনে আলাদা একটি বিভাগ খুলে দায়িত্বশীলদের সুপারিশের ভিত্তিতে নির্ভুল নামফলকের অনুমতি বা অনুমোদন দিতে পারে। এ রকম একটা উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস পেরুলেই আমরা এসব প্রসঙ্গ শিকেয় তুলে রাখি। বাকি এগারো মাস আমরা আর এসব নিয়ে ভাবাভাবির মধ্যে থাকি না। এক্ষেত্রে অবশ্য সংবাদমাধ্যমগুলোরও দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে এখন এই দায়িত্বটা যে, শুদ্ধ ভাষায় বলব এবং নির্ভুল লিখব- এটি নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ- তাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে এই দূষণ ও নৈরাজ্য কমবে।

ব্যক্তির নিজস্ব অবস্থান থেকেও কেউ যদি উদ্যোগী হন শুদ্ধ বলা শুদ্ধ লেখার চেতনায় তাহলেও হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে আমরা একটা বড় কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হব- ভাষার জন্য, একুশের জন্য, দেশের জন্য। আরেকটি বিষয় একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আর শুধু বাঙালি জাতির গর্ব গৌরবের বিষয় নয়, একুশ আজ সারা পৃথিবীর সমস্ত জাতির ভাষা চেতনার দিন। এই গৌরবকে আমরা আরো গৌরবান্বিত করতে সক্ষম হব যদি আমরা আমাদের দেশের সবগুলো নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণ ও সম্মান জানাতে পারি। বাংলাদেশের সবগুলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে একুশের এই মাসব্যাপী আয়োজনের মধ্যে স্থান করে দিতে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব- এটাও একুশের চেতনা। আর এই চেতনাতেই একুশের গৌরব। গৌরবের বাংলাদেশে বাংলা ভাষাকে কোনোভাবেই যেন কেউ পিছিয়ে রাখতে না পারে, সেই লক্ষ্য থেকে ৮ ফাল্গুনে আমাদের শোক দিবস পালনেরও আহ্বান রইল।

 

লেখক : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবি

mominmahadi@gmail.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads