• সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
ধর্ষণ এবং তিন পক্ষের দায়িত্ব

ধর্ষণ এবং তিন পক্ষের দায়িত্ব

প্রতীকী ছবি

মতামত

ধর্ষণ এবং তিন পক্ষের দায়িত্ব

  • অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
  • প্রকাশিত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ধর্ষণ প্রমাণের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ষণের শিকার নারীর শরীর। ধর্ষণের ঘটনার পর ধর্ষিতার উচিত নিজেকে পরিষ্কার বা গোসল না করা। কারণ ধর্ষণকারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর শরীরে কিছু প্রমাণচিহ্ন রেখে যায়। ডাক্তারি পরীক্ষার দ্বারা নারীর শরীর থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণাদি এবং আলামত সংগ্রহ করা যায়, যা ধর্ষণ প্রমাণ ও ধর্ষণকারীকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। ঘটনার সময় যে কাপড় গায়ে ছিল, কাগজের ব্যাগে করে এই কাপড় রক্ষা করা উচিত। এ ছাড়া কাপড়ে রক্ত, বীর্য ইত্যাদি লেগে থাকলে তা যদি ধর্ষণকারীর রক্ত বা বীর্যের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে মামলায় এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। দ্রুত থানায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে। যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তিনিই মামলার প্রধান সাক্ষী হতে পারেন। তার জবানবন্দি পুলিশকে গ্রহণ করতে হবে। তবে কোনো ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি বাধ্য নন। 

ঘটনার দিনের মধ্যে যদি পুলিশ কোনো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তাহলে পরের দিন অবশ্যই প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কিংবা সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে (বিচারিক হাকিম) নালিশি অভিযোগের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে মামলা দায়ের করুন। এ ব্যাপারে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত নারী নয়, তার পক্ষ থেকে যে কেউই (যিনি অপরাধ সম্পর্কে জানেন) এ অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনি যত তাড়াতাড়ি থানায় অভিযোগ দায়ের করবেন, তত তাড়াতাড়ি পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন। কারণ ধর্ষণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষা না করালে ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায় না। ডাক্তারি পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে বা সরকার কর্তৃক এ ধরনের পরীক্ষার উদ্দেশ্যে স্বীকৃত কোনো বেসরকারি হাসপাতালে সম্পন্ন করা যাবে। ডাক্তারি পরীক্ষা হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার অতিদ্রুত সম্পন্ন করবেন এবং ডাক্তারি পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি সার্টিফিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রদান করবেন। ডাক্তারি রিপোর্ট দ্রুত হাতে পেলে পুলিশ দ্রুত ঘটনার তদন্ত শুরু করতে পারবেন। চিকিৎসককে সব কথা খুলে বলতে হবে দ্বিধা না করে।

ধর্ষণ যদি সম্মতিবিহীন হয় তবে ধর্ষিতা মেয়ের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তার পরিহিত কাপড়ে ছেঁড়াফাটা থাকা স্বাভাবিক। ধর্ষণের সময় জোরজবরদস্তি করে এ কার্য সমাধার ফলে মেয়ে যদি নব্য যৌবনপ্রাপ্ত কিংবা ইতোপূর্বে সহবাসের অভিজ্ঞতাহীন হয়ে থাকে এবং গোপনাঙ্গে কমপক্ষে দুটি আঙুল প্রবেশ করাতে কষ্টসাধ্য কিংবা সরু গোপনাঙ্গ হয়ে থাকে, তাহলে ঐুসবহ ৎঁঢ়ঃঁৎব হয়ে গোপনাঙ্গ দিয়ে রক্ত বের হবে এবং সেই রক্ত কাপড়ের নিচের অংশে পরিলক্ষিত হবে। সম্মতিহীন বা সম্মতিসূচক ধর্ষণ উভয় ক্ষেত্রে বীর্যের দাগ শাড়ি বা পেটিকোটের উপরিভাগে পরিলক্ষিত হবে। যদি এমন হয় যে, ধর্ষণের সময় মেয়ের পরনে কোনো কাপড় ছিল না অর্থাৎ উলঙ্গ অবস্থায় ধর্ষণ করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে রক্ত ও বীর্যের দাগ যেই স্থানে বা যে অবস্থানে ধর্ষণ করা হয়েছে, সেই স্থানে বা অবস্থানে পড়বে। সেই চিহ্নিত স্থান বা অবস্থান পুলিশকে দেখাতে হবে, যাতে পুলিশ আলামত সংগ্রহ করে বিচারে ব্যবহার করতে পারে। অনেকেই ভেবে থাকেন, ডাক্তারি পরীক্ষা বা চিকিৎসা অনেক খরচের ব্যাপার। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মেডিকেল পরীক্ষা সম্পূর্ণভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে হবে এবং তা বিনামূল্যে দিতে হবে। পরবর্তী চিকিৎসাও সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে হবে। প্রথমেই ধর্ষিতা পুলিশের কাছ থেকে সবরকম সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। জেলা জজের আওতায় প্রতিটি জেলায় আইন সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে আবেদন করলে ভিকটিম আর্থিক অথবা আইনজীবীর সহায়তা পেতে পারেন। এছাড়া বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কাছে আইনগত সহায়তা পেতে পারেন। থানায় এবং হাসপাতালে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে’ আইনগত ও চিকিৎসা পেতে পারেন।

আইনের ভাষায়, নারী ও শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে অপরাধ প্রমাণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূূর্ণ ও কার্যকর প্রমাণ হিসেবে ডাক্তারি পরীক্ষার সনদপত্রকে বিবেচনা করা হয়। শনাক্ত করা আলামত অভিযুক্তের কি-না তা প্রমাণ করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০০২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা পরিপত্রে ধর্ষণ কিংবা অ্যাসিড বা এ-জাতীয় অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও ডাক্তারি পরীক্ষা সংক্রান্ত বিধান কার্যকর করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পুলিশের রেফারেন্স ছাড়াও ধর্ষণ এবং অন্যান্য সহিংসতার শিকার কোনো নারী ও শিশু যে কোনো সরকারি স্থাপনায় কিংবা সরকার কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে স্বীকৃত কোনো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে যথানিয়মে পরীক্ষা করবেন এবং মেডিকেল সার্টিফিকেট সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক ও নিকটস্থ থানায় প্রেরণ করাসহ, যাকে পরীক্ষা করবেন তাকেও ১ কপি প্রদান করবেন। চিকিৎসক ও তার ক্লিনিক্যাল সহকারীরা নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুকে যথাসাধ্য সেবা দেবেন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাতে হয়— এ নির্দেশনা মোটেই অনুসৃত হচ্ছে না। প্রথমত নির্যাতনের শিকার কেউ হাসপাতালে গেলে থানার রেফারেন্স ছাড়া কর্তব্যরত ডাক্তার মেডিকেল পরীক্ষা করতে রাজি হন না। দ্বিতীয়ত যাকে পরীক্ষা করছেন তাকেও মেডিকেল সার্টিফিকেটের কপি কোনো অবস্থাতেই সরবরাহ করা হয় না। এর কোনো কারণই সুস্পষ্ট নয়। তৃতীয়ত জেলা

পর্যায়ের হাসপাতাল ছাড়া উপজেলা বা আর কোথাও এই পরীক্ষা করা হয় না।

তবে ‘নির্যাতনের শিকার বা তার পরিবারে কারো হাতে মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রদান করা কেন সম্ভব নয়?’— এ ধরনের প্রশ্নে ডাক্তারদের স্পষ্ট জবাব ‘আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে?’ অর্থাৎ নির্যাতনের শিকার ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট জেনে গেলে, তিনি ধরে নিচ্ছেন, সংশ্লিষ্ট ডাক্তার নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে যাবেন। তাহলে কে বা কারা এক্ষেত্রে ডাক্তারের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, সেটাও স্পষ্ট হওয়া দরকার।

তবে আইন বলছে, মেডিকোলিগ্যাল দায়িত্ব পালন করতে পারেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগীয় কর্মকর্তা, জেলা হাসপাতালের আরএমও এবং মেডিকেল অফিসার ও নির্দিষ্ট কর্মকর্তা। সেক্ষেত্রে মেডিকোলিগ্যাল পরীক্ষা করার যোগ্যতাসম্পন্ন ডাক্তার উপজেলা পর্যায়ে তো আছেই, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও এ ধরনের অনেক ডাক্তার রয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে মেডিকোলিগ্যাল পরীক্ষার উপকরণও আছে। সুতরাং এ-জাতীয় পরীক্ষা উপজেলা হাসপাতাল থেকে করে সার্টিফিকেট দিতে আইনি বাধা তো নেই-ই, বরং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা আছে। কিন্তু নির্দেশনা কার্যকর করার কোনো পদক্ষেপ নেই। তবে দেশের সরকারি চিকিৎসালয়গুলোতে, বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিন, অন্যান্য ছুটির দিন এবং কর্মদিবসগুলোতে দুপুর ২টার পর কোনো চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং মেডিকোলিগ্যাল পরীক্ষা তো দূরের কথা, অন্যান্য সাধারণ স্বাস্থ্যসেবাই তো দুরূহ। গ্রাম পর্যায়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে দূরত্ব, যানবাহন, অর্থ সঙ্কট ইত্যাদি কারণে এবং বহুদূর থেকে জেলা সদরে এসে হাসপাতালে ডাক্তার অনুপস্থিত থাকার কারণে ডাক্তারি পরীক্ষা সময়মতো একেবারেই সম্ভব হয় না। ফলে স্বভাবতই নির্যাতিতা নারী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়, অপরাধ উৎসাহিত হয়। আমরা আশা করতে চাই, আইন, নীতিমালা, নির্দেশনা, অবকাঠামো ইত্যাদির সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনসহ সব ধরনের নির্যাতন বন্ধে ডাক্তার, পুলিশ সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। ধর্ষিতারা যেন সঠিক বিচার পায়— এই হোক প্রত্যাশা।

 

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads