• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫
ads

মতামত

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান দুর্বল হয়ে পড়ছে

  • মাছুম বিল্লাহ
  • প্রকাশিত ২৫ এপ্রিল ২০১৯

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ১১ ও ১২ এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘পাঠদান ও গবেষণা, ভর্তি, নিয়োগ ও প্রশাসন’ শীর্ষক সম্মেলনের এক সেশনে বলেছেন, ‘আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুটি বিষয় প্রয়োজন। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ও ছাত্র সংসদ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা মাধ্যমে পড়ানো হলেও তা উচ্চমানের হয় না। মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ আমরা গ্রহণ করি না। আমাদের প্রয়োজন ছিল মৌলিক বইয়ের, গবেষণার ও অনুবাদের। কিন্তু আমরা তা করতে পারিনি, আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান দুর্বল হয়ে পড়েছে।’ সত্যি কথাই বলেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। একজন শিক্ষার্থীকে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ছোটাছুটি করতে হয়। নারী ভর্তিচ্ছুদের যে কী সমস্যা হয়, তা বুঝেও না বোঝার ভান করেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দেশে যানবাহনের ক্ষেত্রে চলছে এক চরম নৈরাজ্য। দিনে-রাতে রাস্তাঘাটে ঘটছে দুর্ঘটনা। মানুষকে প্রাণ হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হয়। এই কঠিন বাস্তবতায় কেন একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তির জন্য সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে হবে? হোটেল রেস্টুরেন্টে খাওয়া মানে জীবনধ্বংসকারী রোগের জীবাণু ডেকে আনা। তারপরও কেন আমাদের কর্তৃপক্ষ একীভূত না হলেও অন্তত গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা এখনো করতে পারছে না?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান আকর্ষণ ছাত্র সংসদ নেই আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। ২৮ বছর পর প্রশ্নবিদ্ধ ছাত্র সংসদ গঠিত হয়েছে দেশের বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গবেষণা ও মানসম্মত লেখাপড়া যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উল্লেখযোগ্য দিক, যেগুলোর ক্ষেত্রে রয়ে গেছে বিশাল ঘাটতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় একদল শিক্ষার্থী চোখ-মুখ বুজে শুধু পড়াশোনা করে প্রথম শ্রেণি পাওয়ার আশায়। শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের গবেষণা কর্মে অংশগ্রহণ নেই, বাইরের জগৎ সম্পর্কে তাদের কারোরই ধারণা স্পষ্ট নয়। কেউ আছে কবে সরকারি আমলা হবে সেজন্য বিষয়ভিত্তিক লেখাপড়ার চেয়ে বাইরের লেখাপড়া ও সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিভিন্ন বই পড়া নিয়ে ব্যস্ত, আরেকদল রাজনীতি নিয়ে আছে— রাজনীতি নিজেরা করছে, অন্যদের বিশেষ করে অসহায় শিক্ষার্থীদের জোর করে রাজনীতি করাচ্ছে। অন্য আরেক দল আছে নীতিগত রাজনীতি নিয়ে, আদর্শবাদী রাজনীতি নিয়ে। তাদের দলে লোকজন খুবই কম। এ ছাড়া রয়েছে একদল যারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত। এর বাইরেও একদল আছে, তারা কোনো দিকেই পড়ে না। তারা আছে টেন্ডার কোথায় কীভাবে হচ্ছে তার সঙ্গে ভাগাভাগির করা, চাঁদা তোলা ইত্যাদি নিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈচিত্র্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সব বৈচিত্র্যই হতে হয় পজিটিভ; কারণ এটি হচ্ছে বিদ্যাশিক্ষার সর্বোচ্চ পীঠস্থান। কিন্তু রাজনৈতিক মারামারি, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এবং চাঁদাবাজি করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় ‘কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই’ শীর্ষক আলোচনা একটি প্রশংসীয় পদক্ষেপই বলতে হবে। আয়োজকরা এজন্য ধন্যবাদ পেতেই পারেন। গীতিআরা নাসরিন বলেন, “সমাজের উঁচু শ্রেণি এখন তাদের পুঁজিতন্ত্র ধরে রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে চলবে তা নির্ধারণ করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন আমলা হওয়ার জন্য পড়াশোনা করে। ‘মুক্ত ও স্বাধীন’ শব্দ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এখন আর খাটে না। এগুলো ফিরিয়ে আনতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে বিভাজন তৈরির কারাখানায় পরিণত হয়েছে তা যে কোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।”

দুদিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিন দুটি অধিবেশন ও তিনটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশনে ‘বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্র’ এবং দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন : কৌশলপত্র’ বিষয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে অনেক ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যেগুলো ১৯৭৩ অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হয়। আলোচকরা বলেন, এটা শুধু অধ্যাদেশ নয়, এটা একটা ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যখন চিন্তা করার সক্ষমতা, প্রশ্ন করার আগ্রহ, সমাজ ও রাষ্ট্র বিষয়ে মনোযোগ বৃদ্ধি পায় তখন স্বৈরতন্ত্র, নিপীড়ক, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রভুদের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। আলোচকরা এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সরব থাকতে বলেছেন। তারা আরো বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন কেউ প্রতিবাদ করতে না পারে, সেজন্য সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুতুল তৈরির কারখানা নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে। রাষ্ট্র চায় রোবট সোফিয়ার মতো শিক্ষার্থী। পরে ‘১৯৭৩-এর অধ্যাদেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন’, ‘প্রাইভেট ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা’ ও ‘নিওলিবারেল রূপান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক তিনটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিক্ষক এতে অংশ নেন।

বহির্বিশ্বে গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, আমরা তা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছি। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে আমরা কোথাও নেই। কেন নেই সে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন ছিল। আমাদের উচ্চশিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে, অর্থবহ করতে হবে, সৃজনশীল করতে হবে। কিন্তু কীভাবে তা করা হবে, কোথা থেকে তা শুরু করতে হবে— এ বিষয়গুলো আলোচনায় আসার দরকার ছিল। উচ্চমাধ্যমিকের পর আমাদের দেশে মোটামুটি ৩৬ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তিন লাখের মতো পড়াশোনা করে। বাকিরা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়ে। এ ছাড়া কারিগরি, কৃষি, মেডিকেলে প্রায় দুই লাখের মতো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। বাকি ত্রিশ লাখের বেশি শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি কলেজে লেখাপড়া করে। দেশের ৮৩ শতাংশ ছেলেমেয়েই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার জন্য কলেজগুলোতে পড়াশোনা করছে যেখানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা এবং সর্বোপরি গবেষণা ইত্যাদি বিষয়ে কলেজগুলো রয়েছে পেছনের সারির দিকে। এই বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা কেমন হবে, মান কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বা তাদের সবারই এভাবে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি-না তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। দেশের উচ্চশিক্ষার পুরো চিত্র, করণীয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা হলে কিছু সমাধান হয়তো বেরিয়ে আসত।

আমার এক সাবেক সহকর্মী বলেছিলেন, তারা যখন পাকিস্তান আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষার্থীরা তখন মিছিল করে ভিসি অফিসে গেছে একটি দাবি নিয়ে। দাবিটি ছিল পরীক্ষা পেছানো, যেটি শিক্ষার্থীরা প্রায় সময়ই করে থাকে। মিছিল ভিসি অফিসের সামনে যাওয়ার পর ভিসি বেরিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘কী হয়েছে তোমাদের? কী চাচ্ছ তোমরা?’ শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা পেছানোর কথা বলার পরে ভিসি বলেছিলেন, ‘দ্যা ডেট অব ডেথ মে চেঞ্জ বা নট দ্যা এক্সাম। গো ব্যাক টু ইওর ক্লাস। স্টার্ট রিডিং।’ এ কথা শুনে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরে গিয়েছিল। পরীক্ষা যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ ঘটনাটি খুব বেশি কিছু মনে হচ্ছে না, তবে অনেক কিছু। এর সঙ্গে আমরা যদি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বর্তমান আন্দোলনের তুলনা করি, তাহলে কী অর্থ দাঁড়ায় বা কী দেখতে পাই? বর্তমানকালের কোনো ভিসি কি এতটুকু সাহস রাখেন যে, নির্ধারিত তারিখেই পরীক্ষা গ্রহণ করবেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সত্ত্বেও? তারা কি বৃহৎ কোনো ছাত্র সংগঠনের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে সাহস পাবেন বা পান? উত্তর হচ্ছে, পাবেন না বা পান না। কেন পান না, আমরা তার উত্তরও জানি। আবার শিক্ষার্থীদের কথায় যদি আসি, ভিসি বলার পরেও কি শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের প্রতিবাদ না করে ক্লাসে যাবে? যাবে না। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল-ভোলার মহাসড়ক বন্ধ করে দিনের পর দিন আন্দোলন করছে, হাজার হাজার যাত্রীদের, নারী-শিশুসহ অসহায় রোগীদের মহা-দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

তাদের দাবিটা কী? ভিসিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরে যেতে হবে। সরে গেলেই বা কী আর না গেলেই বা কী? বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কী পরিবর্তন হবে? তাদের দাবি তাদের নিজেদের। তাতে সাধারণ মানুষের খুব একটা কিছু আসে যায় না, অথচ তাদের জিম্মি করা হচ্ছে। উচ্চশিক্ষাসহ অনেক ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে, আধুনিক হয়েছে কিন্তু মানবিক গুণাবলি, সৎসাহস, দেশপ্রেম আর আদর্শের জায়গাটিতে রয়েছে প্রচুর ঘাটতি; বরং এসব ক্ষেত্রে আমরা যেন পিছিয়েই যাচ্ছি। আবার ভিসিও পদত্যাগ করবেন না। তাকে কোনো শিক্ষার্থীই চাচ্ছে না, অর্ধেক শিক্ষকও চাচ্ছেন না অথচ তাকে ভিসি থাকতেই হবে। আমরা কি এমন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক চাই? সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, বর্তমানে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে আমরা সেভাবে চাই না।

ওই সম্মেলনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জেনারেল আইয়ুব খান উন্নয়ন দশক উদযাপন করেছিলেন। তার উন্নয়ন দশকের সঙ্গে বর্তমান উন্নয়ন দশকের অভিন্ন জায়গাটা হচ্ছে চলমান দশক দুটি স্বৈরতন্ত্রের। এ ধরনের শাসকরা জনগণকে যতটা না ভয় পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বহু ধরনের নিয়ম ও অনিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র চায় রোবটের মতো শিক্ষার্থী। যেন তাদের যেভাবে বলা হবে, তারা ঠিক সেভাবেই চলবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে অনুগত রাখা হয়। আর এখান থেকেই মাস্তান ও মেরুদণ্ডহীন শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছে।’

 

লেখক : শিক্ষাবিষয়ক গবেষক

masumbillah65@gmail.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads