• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫
ads
তাকওয়া অর্জনের পথ হলো সিয়াম সাধনা

প্রতীকী ছবি

মতামত

তাকওয়া অর্জনের পথ হলো সিয়াম সাধনা

  • মো. কায়ছার আলী
  • প্রকাশিত ০৮ মে ২০১৯

পবিত্র রমজান মাসেই আল-কোরআন নাজিল করা হয়েছে। শুধু পবিত্র আল-কোরআনই নয়, এই রমজান মাসেই অন্যান্য আসমানি কিতাব ও সহিফা নাজিল করা হয়েছে। রমজান মাসের প্রথম অথবা তৃতীয় দিনে নাজিল হয়েছে হজরত ইব্রাহীম (আ.)-এর প্রতি তার সহিফা। হজরত দাউদ (আ.)-এর প্রতি জবুর কিতাব নাজিল হয় এ মাসেই ১২ কিংবা ১৮ তারিখে। হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতি তাওরাত কিতাব নাজিল হয় এ মাসের ৬ তারিখে এবং হজরত ঈসা (আ.)-এর প্রতি ইঞ্জিল কিতাব নাজিল হয় ১২ কিংবা ১৩ রমজান। মুসলমানরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় সিয়াম। খ্রিস্টানরা রোজা রাখলে তাকে বলে ফাস্টিং, হিন্দুরা বা বৌদ্ধরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় উপবাস। বিপ্লবীরা রোজা রাখলে তাকে বলা হয় অনশন। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে অর্থাৎ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষ সবকিছু নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোজা রাখাকে বলা হয় অটোফেজি। অঁঃড়ঢ়যধমু শব্দটি গ্রিক। ‘অঁঃড়’ অর্থ নিজে নিজে এবং ‘ঢ়যধমু’ অর্থ খাওয়া। সুতরাং অঁঃড়ঢ়যধমু মানে নিজে নিজেকে খাওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞান নিজের গোশত নিজেকে খেতে বলে না। মানব শরীরের কোষগুলো বাইরে থেকে কোনো খাবার না পেয়ে নিজেই যখন নিজের অসুস্থ কোষগুলো খেতে শুরু করে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে অঁঃড়ঢ়যধমু বলা হয়। পাঠকদের সুবিধার্থে আরেকটু সহজভাবে বলা যায়, আমাদের ঘরে যেমন ডাস্টবিন বা ময়লা আবর্জনা ফেলার কোনো ঝুড়ি থাকে, আবার অন্যদিকে আমাদের কম্পিউটারগুলোতে রিসাইকেল বিন থাকে। তেমনি আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের মধ্যেও একটি করে ডাস্টবিন বা ঝুড়ি থাকে। সারা বছর শরীরের কোষগুলো খুব সুস্থ থাকার কারণে ডাস্টবিন পরিষ্কার করার সময় পায় না। ফলে কোষগুলোতে অনেক ময়লা ও আবর্জনা জমে যায়। শরীরের কোষগুলো যদি নিয়মিত তাদের ডাস্টবিন পরিষ্কার করতে না পারে, তাহলে কোষগুলো একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগের উৎপন্ন করে। ডায়াবেটিস বা ক্যানসারের মতো অনেক বড় বড় রোগের জন্ম হয় এখান থেকে। মানুষ যখন খালি পেটে থাকে, তখন মানব শরীরের কোষগুলো অনেকটা বেকার হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা তো আর আমাদের মতো অলস হয়ে বসে থাকে না। তখন প্রতিটি কোষ তার ভেতরের ময়লা ও আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করে। আমাদের মতো কোষগুলোর আবর্জনা ফেলার জায়গা নেই বলে তারা নিজের আবর্জনা নিজেই খেয়ে ফেলে। আর একেই বলা হয় অঁঃড়ঢ়যধমু।

কিন্তু এই উপবাস যদি দীর্ঘসময় ধরে করা হয়, তাহলে মাংসপেশির শর্করা ভেঙে যায় যা স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। রসুল (সা.) আমাদের সেহরি খেতে এবং ইফতারে দেরি না করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। নিয়মিত রোজা রাখলে হূদরোগের ঝুঁকি ৫৮ শতাংশ কমে যায়। রোজা রাখার কারণে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমে সুগারের গবঃধনড়ষরংস-এর উন্নতি হয়। এটা ওজন বৃদ্ধি পাওয়া এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় অর্থাৎ হূদরোগের ঝুঁকি কমায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রোজা রাখো ও সুস্থ থাকো।’ হজরত মুসা (আ.) ৪০ দিন রোজা পালন করে আল্লাহর ওহী পেয়েছিলেন। ঈসাও (আ.) তা-ই। তাঁরা তাঁদের অনুসারীদের ওই ৪০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ দেন। পূর্ববর্তীদের রোজার নিয়ম ছিল- এশার পর ঘুমিয়ে পড়লে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার এবং কামাচার হারাম হয়ে যেত। ইসলামের শরিয়াহ সুবেহ সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিছু খাওয়া বা পান করা এবং যৌন তৃপ্তিকর কোনো কিছু করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সূর্যাস্তের পর থেকে সুবেহ সাদিকের আগপর্যন্ত যে কোনো আহার-বিহারে সংযম সাধনা নষ্ট হয় না। রোজাদারের জন্য মিথ্যা, পরনিন্দা, পরের অকল্যাণ চিন্তা ও মন্দকর্ম শুধু নিষিদ্ধই নয়, অনৈতিকভাবেও এর চর্চা বা পরিচর্চা করলে প্রকৃত রোজা হবে না। বর্তমানে এক মাস রোজার পরেও যদি কেউ সাওয়ালের রোজা, মহররমের রোজা, আরাফাতের দিনে রোজা, সপ্তাহে দুদিন বা মাসে তিনদিন রোজা রাখেন, তাহলে তাদের স্বাস্থ্যের উপকারিতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে, যা রসুল (সা.) করেছেন।

রোজার মাসে সিয়াম সাধনার পর তারাবির নামাজসহ অন্যান্য ইবাদত, বিশেষ করে জাকাত (সচ্ছল ব্যক্তিদের) ও ফিতরা প্রদান, লাইলাতুল কদর, ইতিকাফ পালনের মাধ্যমে মোমেন মুসলমান নিজেকে শুধু পরিশুদ্ধই করে না, দোয়া কবুলের সুযোগ গ্রহণ করে আখিরাতে নাজাতের পথ খুঁজে নেয়। সাওম, সিয়াম বা রোজার আসল উদ্দেশ্য মানুষের জাগতিক ও মনোদৈহিক উৎকর্ষ সাধন এবং রোজাদারদের মনে আধ্যাত্মিক চৈতন্য জাগ্রত হওয়া। রোজার অনুশীলন রোজাদারকে আত্মসংযমী, আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে ধৈর্য ও সহানুভূতির অনুভূতি জাগায়। ফলে রোজা রিপুগুলোকে কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে উঠতে সহায়তা করে। সর্বশেষ ও পরিপূর্ণ আসমানি কিতাব আল-কোরআনে রোজার আবেদন অনেক বেশি তাৎপর্য বহন করে। মুসলমানের জীবনে সাওম, সিয়াম বা রোজা শুধু উপবাস নয়; রোজায় উপবাস আছে, কিন্তু উপবাসে রোজা বা সাওম নেই। ফলে ইসলাম ধর্মে মুসলমানদের রমজান মাসের সিয়াম সাধনা বা রোজা পালন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হয়ে থাকে।

 

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads