• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫
ads
রমজান ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি

সংগৃহীত ছবি

মতামত

রমজান ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি

  • বিশ্বজিত রায়
  • প্রকাশিত ০৮ মে ২০১৯

রমজান মূলত মুসলমানদের পবিত্র হওয়ার শিক্ষা দেয়। পাপকাজ পরিহার করে ভালো পথে পরিচালিত হওয়ার তাগিদ দেয় রমজান। সংযম শুদ্ধাচারে উপনীত হওয়ার পবিত্রতম মাস মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় সবাই মনেপ্রাণে সংযমী হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ব্যত্যয় ঘটে থাকে। পাপমুক্ত হওয়ার শুচিশুদ্ধ মাস রমজানই যেন অনেককে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এ দেশে একধরনের অসাধু ব্যবসায়ী চক্র আছে, যারা রমজানের সংযমী বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বাড়িয়ে গ্রহণ করে অসংযমী সুযোগ। বলতে গেলে প্রায় প্রতি বছরই এ সময়টার অপেক্ষায় থাকে একশ্রেণির ঠক প্রতারক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এদের অন্যায্য মূল্য কারসাজির কবলে পড়েন সাধারণ ভোক্তা। তাই রমজান আসার আগ মুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ার দুর্ভাবনা তাড়া করে সর্বস্তরের মানুষকে।

গত ১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, ‘চাহিদার তুলনায় নিত্যপণ্যের মজুত অনেক বেশি। তাই এবারের রমজানে পণ্যের দাম বাড়বে না। সার্বিকভাবে আমরা পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। রমজানকে পুঁজি করে নিত্যপণ্যের দাম যাতে না বাড়ে, সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা আছে।’ কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে মিথ্যা প্রমাণ করতে একদিনের বেশি দুদিন সময় নেয়নি বাজার সিন্ডিকেট চক্র। খবরে বলা হয়েছে, ‘রমজান আসার আগেই রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘোষণার পরদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারে ডাল, ছোলা, চিনি ও পেঁয়াজের দাম বাড়ানো হয়েছে। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে ডালের দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ, ছোলার দাম প্রায় ১৪ শতাংশ, চিনির দাম ৪ শতাংশ ও পেঁয়াজের দাম ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। রোজার অনুষঙ্গ এ চার পণ্যের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে আড়তদাররা আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করছেন। তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রোজা সামনে রেখে আড়তদাররা পণ্যগুলো মজুত করায় কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়েছে এবং এ কারণে দাম বাড়ছে। এক্ষেত্রে শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দাবি বাজার বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ ভোক্তাদের।’ (সূত্র : যুগান্তর, ২০.০৪.২০১৯)

গত ২৭ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, এবার রমজানে পণ্যের দাম বাড়ানো হবে না। তখন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন, দেশে সব পণ্যেরই পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। নিত্যপণ্যের দামসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবসায়ীদের পূর্ব-আশ্বাস এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বড়খেলাপ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে নানা অজুহাত তুলে ধরছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এ অবস্থায় সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। রোজাদার সচ্ছল-অসচ্ছল মানুষের কথা চিন্তা করে যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। অল্পতে অধিক মুনাফা লাভের আশায় এই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্র স্বল্প আয়ের মানুষকে প্রায় প্রতি বছরই ঠেলে দেয় দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির অসহনীয় চাপের মুখে। সংযমের মাসে মানুষ ঠকানোর এ অপপ্রক্রিয়া বেশ শক্ত হাতেই পরিচালনা করে দেশের একটি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী অপশক্তি। রমজানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই অপতৎপরতা বাংলাদেশে যেভাবে দক্ষ হাতে পরিচালিত হয়, বিশ্বের কোনো মুসলিম দেশেই এমন অপচেষ্টা পরিচালিত হয় বলে মনে হয় না। এর জন্য অসাধু ব্যবসায়ী চক্র যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বড় দায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর গিয়ে বর্তায়। ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে পণ্যের দাম না বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েও কোন সাহসে ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ, রসুনের দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা লাভের চেষ্টা করে! পবিত্র রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে রমজানের পবিত্রতা বিনষ্টকারী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রের মূল হোতাদের খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে সাধারণ মানুষকে মূল্য বৃদ্ধির জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হবে।

রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দরদামের ঊর্ধ্বমুখিতা প্রায় সব মানুষের মাঝেই নাভিশ্বাসের জন্ম দেয়। বিশেষ করে অল্প আয়ের মানুষগুলো মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হয়। এ নিয়ে সরকারের সদিচ্ছার অভাব ও ব্যবসায়ীদের মূল্যবৃদ্ধির অপতৎপরতা সম্পর্কে সংবাদপত্রে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেছেন, ‘দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে পণ্যের দাম হ্রাস পাওয়ার কথা কিন্তু উল্টো বাড়ছে। এটি বাজারের কারসাজির পাশাপাশি মনিটরিংয়ের সদিচ্ছার অভাব হতে পারে।’ এছাড়া কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে রমজানের এক মাস আগ থেকেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে রমজানে সামান্য কমিয়ে বলা হয় রোজায় দাম নিয়ন্ত্রণে আছে। দাম নিয়ন্ত্রণ থাকবে আন্তর্জাতিক বাজার ও উৎপাদনের হারের সঙ্গে। বাজার মনিটরিং না থাকার কারণে এ সমস্যা রয়েছে।’ অন্যদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ব্যবসা এখন ব্যবসায়ীরাই করছে না; বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল এখানে হাত দিচ্ছে। চাঁদাবাজির পাশাপাশি সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করছে তারা। বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পণ্য সরবরাহ ও চাঁদাবাজি রোধ করলে সাধারণ জনগণ এর সুফল পাবে। নির্দিষ্ট মৌসুমে পণ্য মজুত আছে কি নেই, কতটুকু আছে- সেটার আসল চিত্র সরকারি সংস্থার কাছে থাকতে হবে। এ ছাড়া কী পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে, এগুলোর তথ্যও থাকতে হবে। তা হলে এ ধরনের সমস্যা থেকে সমাধান পাওয়া যাবে।’ (সূত্র : আমাদের সময়, ২১.০৪.১৯)

সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভে পবিত্র রমজানের পুরো মাসজুড়ে ইবাদত-বন্দেগিতে মত্ত থাকে গোটা মুসলিম সম্প্রদায়। পবিত্র এই মাসটিতে সবাই অন্তত মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। রোজা রাখা ও মোনাজাতের মাধ্যমে অতীত অপকর্ম থেকে মুক্তির পথ খোঁজেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ। এ ছাড়া আগামীর পথচলায় পাপকার্য থেকে নিজেদের সংযত রাখতে স্রষ্টার দোয়া কামনা করেন। কিন্তু অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্র রমজানে পাপমুক্ত হওয়ার বদলে নিজেদের পাপের পথেই সর্বদা পরিচালিত করছে। তারা আত্মসংযমী না হয়ে বরং অধিক অর্থ কামানোর মোহে আত্মভোলা হয়ে পড়ছে এবং পরকালে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার ক্ষেত্রটাকে আরো প্রশস্ত করছে। এ থেকে বেরিয়ে এসে অন্তত রমজানের পবিত্রতা রক্ষাসহ বরকতময় মাসটিতে নিজেদের একটু ভালো কাজে নিয়োজিত করার চেষ্টা চালানোর অনুরোধ জানাচ্ছি।

লেখক : সাংবাদিক

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads