• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
শিশু মুর্তজার মৃত্যুদণ্ড এবং ভূলুণ্ঠিত মানবতা

সংগৃহীত ছবি

মতামত

শিশু মুর্তজার মৃত্যুদণ্ড এবং ভূলুণ্ঠিত মানবতা

  • প্রকাশিত ২৬ জুন ২০১৯

অবশেষে মুর্তজার মৃত্যুদণ্ড বাতিল করল সৌদি সরকার। দশ বছর বয়সের ফুটফুটে শিশু মুর্তজা কুরেইরিস। ২০১০ সালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ‘আরব বসন্ত’ শুরু হলে তার ঢেউ এসে সৌদি রাজতন্ত্রকেও আঘাত করে। ২০১১ সালে এমনই এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল দশ বছর বয়সী শিশু মুর্তজা। প্রায় ত্রিশজন শিশুর একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিল সে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে আমরা দেখেছি, ফুটফুটে শিশুটি সাইকেলে বসে একটি অহিংস প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সৌদি সরকার তাকে গ্রেপ্তার করেছে বহু আগেই। এখন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সব আয়োজনও সম্পন্ন করেছে। শুধু শিশু মুর্তজাই নয়, তার মতো অসংখ্য শিশুকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সৌদি আরব। বিশ্বজুড়ে শিশু মুর্তজার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার কারণে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌদির এমন কাজের কঠোর সমালোচনা হচ্ছে। এটা সুস্পষ্টভাবে মানবতার লঙ্ঘন এবং শিশু অধিকার রক্ষার পরিপন্থী। জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদে বলা আছে, ১৮ বছর বয়সের নিচে কাউকে আটক করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া যাবে না। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করা দেশগুলোর অন্যতম হলো সৌদি আরব। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানাচ্ছে, মুর্তজাকে ‘বিচারিক হত্যা’র বলি বানানোর অপেক্ষায় রয়েছে সৌদি আরব। আটক থাকার পরও দীর্ঘদিন কোনো আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি তাকে। এমনকি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে আমরা জানতে পারছি, জোর-জবরদস্তি করে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। এটা কি মানবতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন নয়? 

বর্তমান সময়ে সৌদি আরবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হলো সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণের অজুহাত দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে, তার সামনের সারিতে থেকে তাদের সহায়তা করছে সৌদি আরব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানবতা এবং মানবাধিকার নিয়ে সবচেয়ে বেশি বুলি কপচিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের মিত্র সৌদি আরব যখন একের পর এক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলে, তখন তারা নিশ্চুপ বসে থাকে। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের দমনের নাম করে সেখানে সৌদি জোট হামলা চালিয়ে আসছে বহুদিন ধরে। ইয়েমেনে এখন স্মরণকালের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট চলছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের ওপর চলছে বোমাবর্ষণ। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মসজিদসহ সব স্থাপনা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সামান্য একটু খাবার এবং পানির জন্য ছটফট করে মৃত্যুবরণ করছে অসংখ্য ফুটফুটে মানবসন্তান। শিশুদের রক্তমাখা বহু মুখ আমরা দেখেছি সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়। আর এই অভিযানে অস্ত্র এবং সবরকম সামরিক সাহায্য প্রদান করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মানবতার লঙ্ঘন কি এখানেও হচ্ছে না? 

বিশ্বের প্রাচীন সভ্যতাগুলোর ইতিহাস পড়তে গিয়ে আমরা দেখেছি, প্রায় সব সভ্যতারই উৎপত্তি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে। সভ্যতার এই লীলাভূমিতে এখন চলছে বর্বরতার মহোৎসব। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশেও শান্তির লেশমাত্র নেই। কয়েক বছর আগে সিরিয়া ও ইরাকে আইএস নামের এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। তাদের দমনে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনী তছনছ করে ফেলেছে সিরিয়ার অধিকাংশ শহর, বন্দর এবং গ্রাম। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দমন কতটুকু হয়েছে সেটা সবাই জানে। সাদ্দাম হোসেনের সময়ে অস্ত্র মজুত আছে এই খোঁড়া অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করে মিত্রবাহিনী। নিহত হয় লাখ লাখ মানুষ।  

বিশ্বের বুকে যতদিন ধরে যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানি ও জাতিগত সংঘাত শুরু হয়েছে, ততদিন থেকেই শরণার্থী সমস্যার উদ্ভব। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম সমস্যার একটি। কিন্তু বর্তমান সময়ে শরণার্থী সংকট আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বহুদিনের। এই এলাকা থেকে দলে দলে মানুষ ইউরোপের দেশগুলোতে ছুটে যাচ্ছে সামান্য একটু আশ্রয় পাওয়ার আশায়। কিন্তু সমস্যা সেখানেও। ইউরোপের দেশগুলোতে কঠোর অভিবাসী আইন থাকার কারণে সেখানেও আশ্রয় মিলছে না সহজে। ২০১৫ সালে পাঁচ বছর বয়সী আয়লান কুর্দি বাবা-মায়ের সঙ্গে পালিয়ে গ্রিসে আশ্রয় নিতে গিয়ে নৌকাডুবির শিকার হয়েছিল। তার নিথর মরদেহ ভেসে উঠেছিল তুরস্কের বদ্রুম উপকূলে। বিশ্ববাসী তার নিথর দেহ দেখে অসহ্য এক যন্ত্রণা উপলব্ধি করেছিল। এভাবে কত আয়লান যে পৃথিবীর বুক থেকে অকালে ঝরে গেছে তা কে বলতে পারে!  

বিশ্বজুড়ে চলছে সবল কর্তৃক দুর্বলের ওপর সীমাহীন অত্যাচার এবং অধিকার হরণের মহোৎসব। যেখানে যারাই সংখ্যালঘু বলে বিবেচিত হচ্ছে, তারাই শিকার হচ্ছে নির্মম নির্যাতনের। ভারতে সংখ্যালঘুদের কোনো নিরাপত্তা নেই। বিশ্বের বহু সভ্য দেশে আজো বিরাজ করছে সাদা-কালোর প্রভেদ। আমরা মুখে মুখে প্রতিনিয়ত সাম্যের কথা বলি। কিন্তু আমাদের আচরণে সাম্যের পরিবর্তে বৈষম্যই প্রকাশ পায়। এই বিশ্বের বুকে কোথাও আজ শান্তির অস্তিত্ব নেই। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মহা আড়ম্বরের সঙ্গে জাতিসংঘ নামক একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। প্রথমদিকে তাদের কর্মতৎপরতা দেখে বিশ্বের মানুষ ভেবেছিল, জাতিসংঘের মাধ্যমে হয়তো বিশ্বের বুকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। হয়তো সেটা সম্ভব হতো, যদি জাতিসংঘ নামক প্রতিষ্ঠানটি কয়েকটি বৃহৎ শক্তির পকেট সংগঠনে পরিণত না হতো। তাই তো আমরা দেখেছি, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরও বিশ্বে বহু বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। বৃহৎ শক্তিগুলো পারমাণবিক বোমা নামক ভয়ংকর মারণাস্ত্র বানিয়ে বিশ্ববাসীকে যুদ্ধের শঙ্কার মধ্যে রেখেছে। মাঝেমধ্যে ভাবি, এমন বিশ্বই কি আমরা চোখ মেলে দেখতে চেয়েছিলাম? এ অবস্থার কি কোনোই পরিবর্তন হবে না?  

আরাফাত শাহীন

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়  

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads