• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
শুদ্ধি অভিযানের কবলে যুবলীগ

সংগৃহীত ছবি

মতামত

শুদ্ধি অভিযানের কবলে যুবলীগ

  • মহিউদ্দিন খান মোহন
  • প্রকাশিত ১৯ অক্টোবর ২০১৯

বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সংগঠন থেকে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বগৃহে যে শুদ্ধি অভিযানের সূচনা করেছেন, তাতে দেশবাসী আশান্বিত হয়ে উঠেছে। বিদ্যমান সন্ত্রাস, দুর্নীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক অপরাধের প্রাবল্যে হাঁপিয়ে ওঠা সাধারণ মানুষ এমনই একটি কঠোর পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছিল কিছুদিন ধরেই। ‘এভাবে চলতে পারে না’- এ কথাটি বিশিষ্ট নাগরিকরা নানা সময়ে বলে আসছিলেন। পেশাদার দুর্বৃত্তদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কতিপয় নেতাকর্মীর কাজকর্ম দলের পাশাপাশি প্রশ্নবিদ্ধ করছিল খোদ সরকারকেই। সরকার বা সরকারি দলের আশকারায় যে এদের এত বাড়-বাড়ন্ত, জনমনে এ ধারণা সংগত কারণেই ছিল। এদের বিরুদ্ধে একটি কঠোর পদক্ষেপের প্রত্যাশাও করছিল তারা। কেউ কেউ এমন ধারণাও করেছিল যে, দলীয় পরিচয় বহনকারী এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে হয়তো কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হবে না। সবার সে ধারণাকে ভেঙে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাজটি শুরু করে দিয়েছেন। তবে এই শুদ্ধি অভিযানে সরকারের ভেতরে যে এক ধরনের অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে, এটা অস্বীকার করা যাবে না। কেননা, যারা অভিযানের জালে আটকা পড়েছে, তারা সবাই বর্তমান সরকারি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত। ফলে সরকারের অভ্যন্তরে বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

দুর্নীতি-অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযান সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে পরিমাণ সমর্থন পেয়েছে অতীতে এমনটি দেখা যায়নি। অবশ্য সরকারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এ বিষয়ে দলীয়ভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। যদিও কয়েকজন বিএনপি নেতা বিভিন্ন টকশোতে এ জন্য সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে সাধারণ মানুষ মনে করে, বিএনপি যদি সরকারের দুর্নীতি-সন্ত্রাসবিরোধী এ অভিযানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাত, তাহলে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতো। আমাদের দেশে সরকারের ভালো কাজকে বিরোধী দলের সমর্থন-সহযোগিতার নজির আগেও ছিল না, এখনো নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বড়ই কৃপণ। অবশ্য এ পরিস্থিতিতে বিএনপি যে বেশ আনন্দিত তা তাদের অভিব্যক্তি থেকেই অনুমান করা যায়। তারা মনে করে, এর ফলে গত দশ-এগার বছরে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা সংঘটিত দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দলের নাম ভাঙিয়ে অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগগুলো জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়েছে। এতে জনমনে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হবে এবং তার সুফল বিএনপি ভোগ করতে পারবে। অধিকাংশ শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত বিএনপির জন্য এটা স্বস্তিদায়ক ব্যাপারই বটে। এর বিপরীত দিকও আছে। নিজ দলের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে সরকার দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূলে আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে, এমন ধারণাও জনমনে সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যে বলতে শুরু করেছেন, তাদের নেত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন। দুর্নীতি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে তিনি পৌঁছে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

অন্যদিকে শুদ্ধি অভিযানের ফলে সরকার যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে তা অস্বীকার করা যাবে না। কারণ এখন পর্যন্ত যারা আটক বা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারা সবাই সরকার দলসংশ্লিষ্ট। একমাত্র মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের লোকমান হোসেন ভূঁইয়াই আছেন আওয়ামী লীগের বাইরে। এদিকে গত ১৫ অক্টোবর দৈনিক যুগান্তর এক প্রতিবেদনে লিখেছে, শিগগিরই দুর্নীতি দমন কমিশন তালিকাভুক্ত হাই প্রোফাইল দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করবে। প্রথম তালিকার অনেকেই ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে আছে, কেউ দেশত্যাগ করে চলে গেছে। এদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল, অর্থ পাচারসহ নানা রকম অভিযোগ রয়েছে। সরকার এসব চিহ্নিত দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে একটি বার্তা দিতে চাচ্ছে— অপরাধীদের রেহাই নেই। সরকারপ্রধান তার সিদ্ধান্তে এখনো পর্যন্ত অটল রয়েছেন এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। অভিযুক্ত ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিদের দল থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আগেই। যারাই গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদেরকেই সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি দলে সাংগঠনিক শুদ্ধি অভিযানও শুরু করতে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে ক্লিন ইমেজের নেতাদের জায়গা করে দিতে চান তিনি। আর এ লক্ষ্যে আগামী মাসে যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কাউন্সিল করে নতুন নেতা নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যুবলীগের চেয়ারম্যান পদ হারাতে যাচ্ছেন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নেতা ওমর ফারুক চৌধুরী, এমন খবর উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। আর তা স্পষ্ট হয়েছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংগঠনটির প্রেসিডিয়াম বৈঠকে। গত ১১ অক্টোবর তাকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে সভাটি। অনেকেই মনে করেন, ঢাকা মহানগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার গ্রেপ্তারের পর সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশের মধ্য দিয়েই ওমর ফারুক চৌধুরী তার পরিণাম নিশ্চিত করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উদ্দেশ করে বলা তার কথাগুলো যে সরকার ও সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধেই যায়, সেটা হয়তো উত্তেজিত ওমর ফারুকের খেয়াল ছিল না। পরবর্তীতে এটা প্রকাশিত হয় যে, যুবলীগের যারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত তাদের প্রায় সবাই ওমর ফারুক চৌধুরীর মদতপুষ্ট। ইতোমধ্যে দুদক তার ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। অন্যদিকে তার ক্যাশিয়ার হিসেবে পরিচিত যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানকে গত ১১ অক্টোবর সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে যুবলীগে ওমর ফারুক জামানার অবসানের সূচনা হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।

পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে যুবলীগের কতিপয় নেতার কর্মকাণ্ডে সংগঠনটির ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। সাধারণ মানুষের কাছে যুবলীগ এখন মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম। আর তাই প্রধানমন্ত্রী সংগঠনটির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়েছেন। এ পদক্ষেপের অংশ হিসেবে পরিচ্ছন্ন ইমেজের যুবকর্মীদের নেতৃত্বে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যুবলীগের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির বেশিরভাগ নেতাই এখন আর যুবক নেই। স্বয়ং চেয়ারম্যন ৭১ বছরের প্রৌঢ়। সাধারণ সম্পাদক ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ। গত ১৪ অক্টোবর যুগান্তর এক প্রতিবেদনে লিখেছে, যুবলীগের ৩৫১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবার বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই। সংগঠনটিতে সর্বোচ্চ পাঁচজনও যুবক পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। এ ছাড়া যারা নানা কর্মকাণ্ডের কারণে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ তারা আর যুবলীগের কমিটিতে ঠাঁই পাচ্ছে না এটা প্রায় নিশ্চিত। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পোষণ করছেন অত্যন্ত কঠোর মনোভাব। ফলে যুবলীগের আসন্ন কেন্দ্রীয় কংগ্রেসে বর্তমান নেতাদের অনেকেরই ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে বলে সচেতন মহলের ধারণা।

দলকে কলুষমুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। দলের নেতাকর্মীরা হতোদ্যম হয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও তিনি তার অবস্থানে অনড় আছেন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিশিষ্টজনরা বলে আসছিলেন যে, সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতি-সন্ত্রাসের মূলোৎপাটনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোতে শুদ্ধি অভিযান জরুরি। কেননা রাজনীতির দ্বার অবারিত পেয়ে সময় ও সুযোগের ব্যবহার করে অনেক প্রশ্নবিদ্ধ মানুষ ও দুষ্কৃতিকারী দলগুলোতে ঢুকে পড়ে। এর সবচেয়ে প্রকৃষ্ট প্রমাণ সম্প্রতি র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার মোহাম্মদপুরের ত্রাস হিসেবে খ্যাত হাবিবুর রহমান মিজান; যে পাগলা মিজান নামে সমধিক পরিচিত। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, এই মিজান আগে ফ্রিডম পার্টির কর্মী ছিল, এমনকি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার বাসভবনে হামলায়ও সে অংশ নিয়েছিল। বিস্ময়ের সীমা থাকে না, যখন তাকেই দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর সৈনিকে পরিণত হতে। একটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে, বিভিন্ন অভিযোগে আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী আটক হচ্ছে, একটি মহল থেকে তাদের কুষ্ঠিনামা প্রচার করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, অমুকে আগে ওই পার্টি করত, অমুকের বাপ ওই দলের নেতা ছিল ইত্যাদি। এই প্রচারণা যে দায় এড়িয়ে যাবার হাস্যকর প্রয়াস তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে লোকটি এখন আওয়ামী লীগের নেতা, সে আগে কী ছিল সেটা তার বর্তমান অপরাধের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে না। এ ধরনের প্রচারণা ওই বিতর্কিত ব্যক্তিদের দলে ঠাঁই দেওয়া নেতাদেরই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।

আমাদের দেশের ঐতিহ্য হলো ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সব সময় ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে থাকেন। যতদিন দল ক্ষমতায় থাকে, তাদেরকে সাধু-সন্ন্যাসী হিসেবেই মেনে নিতে হয় জনসাধারণকে। ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বের হয়ে আসতে থাকে নানা কাহিনী। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের উঠতে-বসতে সালাম ঠুকত, তারাই কোমরে দড়ি দিয়ে নিয়ে যায় হাজতখানায়। যে নেতাকে মনে হতো ভাঁজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না, ক্ষমতা হারানোর পর দেখা গেছে তাদের হাঁড়ির খবর ভালো নয়। ভাজা মাছ শুধু উল্টে খেতে জানেন তা নয়, মাছের আঁশ-কাঁটা শুদ্ধ গলাধঃকরণে তারা অত্যন্ত পটু! শুধু এবারই ব্যতিক্রম চিত্র দেখা যাচ্ছে। সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে দলের বিচার করছে না। অবশ্য এ অভিযানের বিস্তৃতি ও আয়ু নিয়ে কেউ কেউ যে সংশয় প্রকাশ করছেন না তা নয়। তারা অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন যে, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দুর্নীতি-চোরাচালান-রিলিফ আত্মসাৎকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন সময়ের ক্ষমতাধর একটি চক্র নানা কৌশলে সে অভিযানকে বিশিদিন চলতে দেয়নি। এবার তারই কন্যা শেখ হাসিনা আরেকটি সাহসী অভিযান শুরু করেছেন। দেশবাসী আশা করে অতীত ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করে তিনি তার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকবেন। এতে তার দলের মুষ্টিমেয় লোক হয়তো তার প্রতি বিরূপ হবে, তবে ব্যাপক জনসাধারণের সমর্থন তিনি পাবেন। আর সেটাই একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে শেখ হাসিনার কাছে অগ্রাধিকার পাবার কথা।

 

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads