• শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
ads
চট্টগ্রামের যৌতুক প্রথার বিলুপ্তি চাই

প্রতীকী ছবি

মতামত

চট্টগ্রামের যৌতুক প্রথার বিলুপ্তি চাই

  • প্রকাশিত ২৮ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গা থেকে চট্টগ্রামের বিয়ের পদ্ধতি হচ্ছে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ চট্টগ্রামের বিয়ে মানেই যৌতুক। যৌতুক ছাড়া চট্টগ্রামে বিয়ে হয় না। জনসম্মুখে বরপক্ষ যৌতুক নিচ্ছে কনেপক্ষ থেকে। চট্টগ্রামের মানুষ যৌতুককে বৈধতা দিয়েছে বহুকাল আগেই। এখানে যৌতুক নেওয়াটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যার ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মায়ের কাছে মেয়েসন্তান যেন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রামের মানুষ বিয়ের সময় টাকা নেওয়াকে যৌতুক মনে করে; কিন্তু টাকা বাদে যদি বরপক্ষকে অন্যকিছু দেওয়া হয় তবে তা নাকি যৌতুক নয়। সেটা হলো ইংরেজি ভাষায় গিফ্্ট। এবার একটু আমাদের শিক্ষিত বরদের কথা বলি, তারা যখন বিয়ে করতে আসে তখন তারা খুবই ভদ্র হয়ে যায়। এমন একটা ভাব যেন সে কিছু জানে না যৌতুক সম্পর্কে। তখন তাদের মুখে একটাই কথা (আমার বাবা-মা যা বলবে তা-ই হবে)। আরে মা-বাবা তো মুরব্বি; তারা তো যৌতুককে ঐতিহ্য হিসেবে দেখছেন। কিন্তু আপনি তো শিক্ষিত, আপনি কেন তাদেরকে বোঝাতে পারছেন না? নাকি আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন না? নাকি আড়ালে থেকে যৌতুকের পক্ষে আছেন। চট্টগ্রামে কিছু বিয়ে যৌতুক ছাড়া হয়; কিন্তু সেরকম বিয়ে হয় হাজারের মধ্যে মাত্র কয়েকটি।

চট্টগ্রামের যৌতুক বিভিন্ন আকার ধারণ করছে। বিয়ের সময় কনেপক্ষকে বরপক্ষের ৫০০/৮০০/১০০০ মানুষকে খাওয়াতে হয়। খাওয়ার ম্যানুতে থাকে চিংড়ি/গরুর মাংস/খাসির মাংস/ রূপচাঁদা মাছ/ডিম/পোলাও-ভাত/মুরগি/ চিকেন-টিক্কা/ পায়েস/মিনারেল ওয়াটার/ কোক ও বিভিন্ন ধরনের সবজিসহ আরো অনেক কিছু। এসব আইটেম থেকে কিছু কম হলে শুরু হয়ে যাবে কনেপক্ষের সঙ্গে বিতর্ক। আর কিছু মুরব্বি তো আছেনই কনেপক্ষের ভুল খোঁজার দায়িত্বে। তবে বিয়ের আগে যদি আকদ হয় তখন কিন্তু প্রায় ২০০/৩০০ জন মানুষের খাবারের আয়োজন করতে হয়। বিয়ের পর শুরু হয় বিভিন্ন পর্বের দাওয়াত। নতুন জামাই বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যাবে, তবে একা যেতে পারবে না বা ১০-১৫ জনকেও নিয়ে যেতে পারবে না। নতুন জামাইকে ৮০/১০০/১৫০ জনের বিশাল বহর নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে, না হয় মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। এখানে কিন্তু খাবারের আইটেম রাখতে হবে বিয়ের আইটেমের চেয়ে বেশি। এবার নতুন জামাইয়ের পর্ব শেষ হলে, কিছুদিন পর শুরু হবে শ্বশুর ও শাশুড়ি পর্ব। কারণ নতুন জামাইয়ের সঙ্গে শাশুড়ি আসতে পারবেন না, কারণ এটা তথাকথিত বুড়া/বুড়ির নিষেধ। শাশুড়িও তাদের বিশাল বহর নিয়ে এসে খেয়ে যাবেন এবং কিছু খাবার সঙ্গে নিয়ে যাবেন। এখানেই কিন্তু শেষ নয়। এরপর শুরু হবে চট্টগ্রামের ভাষায় ‘বছরি জিনিস’ দেওয়ার পালা। অর্থাৎ আমের মৌসুম এলে দিতে হয় ৫০-৬০ কেজি আম, আনারস, কাঁঠালসহ আরো বাহারি রকমের ফল।

রমজানের সময় দিতে হয় ইফতারিসহ আরো অনেক আইটেম। ঈদের সময় ছেলের পরিবার, বোনের স্বামীসহ সবাইকে শপিং করে দিতে হয়। তবে ঈদের সময় ছেলেপক্ষের সবাই আসবে এটা স্বাভাবিক বিষয় এবং এর ফলে দুই পরিবারের মাঝে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। কোরবানির সময় দিতে হবে গরু, গরু রান্না করার জন্য তেল-মসল্লা, পেঁয়াজ ইত্যাদি। মহররম এলে দিতে হবে ১৫/১৬টি মুরগি ও ৮/১০ কেজি গরুর মাংস রান্না করে। শীতকাল এলে দিতে হবে কয়েকশ’ শীতের পিঠা, তালপিঠা ইত্যাদি। এছাড়া বার্ষিক জিনিসের মধ্যে আরো অনেক আইটেম রয়েছে, যা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য খুবই কষ্টকর।

যদি কোনো মেয়ের পরিবার এসব না দেয় তবে তাকে তার পরিবার নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা শুনতে হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামে বিয়ের আগেই বরপক্ষের বাড়িতে ফার্নিচার পৌঁছে দিতে হয়। ফার্নিচারের মধ্যে থাকে দামি বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের জিনিস। ফ্রিজ, টিভি, গ্যাসের চুলা এগুলোও বাধ্যতামূলক দিতে হয়। এছাড়া কনেপক্ষের অতিথিদের দেওয়া সব উপহারের জিনিসও বরপক্ষকে দিয়ে দিতে হয়। একটি মেয়ে তার পরিবারের মা-বাবার কাছে কলিজার টুকরা। সেই কলিজাকে অন্য পরিবারে পাঠিয়ে দেয় নিয়মের ভিত্তিতে। আর বরপক্ষ সেই কলিজার মেয়েকে নিয়েও শান্তি হয় না, তাদের শুধু চাই আর চাই। কবে বন্ধ হবে এসব?

যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। সমাজ থেকে যদি এই প্রথা দূর করা না যায় তাহলে ধ্বংস অনিবার্য। দুটি পরিবারের পারিবারিক সম্প্রীতি নষ্ট করে এই যৌতুক প্রথা। যৌতুকের বলি হয়ে আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ছে নারীরা। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ১০২ নারীকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এই তথ্যকে একটি আংশিক চিত্র বলে মনে করা হয়; কারণ অনেক তথ্যই খবরের কাগজে প্রকাশ পায় না।

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ৬ হাজার ৭২৮টি যৌতুকের মামলা হয়েছে। বাংলাদেশে আইনত যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু তবু বাংলাদেশের সমাজে যৌতুক খুবই স্বীকৃত একটি বিষয়। মেয়ের কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে, গায়ের রং চাপা হলে অথবা পাত্র বড় চাকুরে হলে তার পরিমাণ আরো বেড়ে যায়। সুতরাং বলব, চট্টগ্রামের অধিবাসী যৌতুকের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলুন। যেখানে যৌতুক সেখানে প্রতিবাদ। আমরা এক এক করে সচেতন হলে তবেই আমরা চট্টগ্রামকে যৌতুকমুক্ত করতে পারব। এই বিশ্বাস নিজেদের মধ্যেই লালন করতে হবে। পরিবর্তিত যুগের সঙ্গে সঙ্গে অতীতের ভঙ্গুর সব বিশ্বাস আজ অচলায়তন। সেসব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আধুনিক শিক্ষিত সমাজকেই সোচ্চার হতে হবে। বিষয়টি সবাইকে ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।

ফাহমিদা আক্তার

লেখক : সমাজকর্মী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads