• শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
ads
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাল দশা

সংগৃহীত ছবি

মতামত

ভিকারুননিসার নির্বাচন

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাল দশা

  • মাছুম বিল্লাহ
  • প্রকাশিত ০৪ নভেম্বর ২০১৯

১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির নির্বাচন এলে পুরো ঢাকা শহর পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে যায়। হঠাৎ অবাক কিংবা কনফিউজড হতে হয় এই ভেবে যে, দেশে এই মুহূর্তে আবার কিসের নির্বাচন! যখন পোস্টারের দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে পড়া হয় তখন দেখা যায় ভিকারুননিসার গভর্নিং বডিতে থাকার জন্য নির্বাচন। তার জন্যই এত পোস্টার! এত লিফলেট! এত পোস্টার ও লিফলেট ছাপাতে তো বেশ অর্থের প্রয়োজন হয়। তারপরেও এত লোক গভর্নিং বডিতে আসতে চান কেন? তারা কি খুবই বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তি? দেশের শিক্ষার উন্নয়নে সবাই প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে চান? প্রথমে তাই মনে হবে যে, শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করার জন্যই তারা নির্বাচনের পেছনে এত অর্থ ব্যয় করেন। বিষয়টি আসলে তা নয়।

এখানে অর্থ-প্রতিপত্তির খেলা! ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির নির্বাচনে আগের গভর্নিং বডির বিরুদ্ধে ভর্তিবাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ থাকায় সাতজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচন। ৬ অক্টোবরই প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডি নির্বাচনের প্রিজাইডিং অফিসার ও ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফারজানা জামান এটি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রবিধানমালার ১১এ(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আগের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে নানা অভিযোগ থাকায় তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। ক’দিন আগে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে নাটকীয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির এক সদস্য তার নিয়োগের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের একজনকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয় যে, ঢাকার লালমাটিয়া মহিলা কলেজ ও ঢাকা সেন্ট্রাল ওমেন্স কলেজের মতো একই প্রক্রিয়ায় ভিকারুননিসার অধ্যক্ষকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অতএব বিষয়টি বৈধ। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছিল বিধায় ভর্তি-বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানটি যাতে ভালোভাবে পরিচালিত হয়, সেজন্য একজন দক্ষ ব্যক্তিকে বৈধ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার সবুজবাগ সরকারি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনরত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফওজিয়া রেজওয়ানাকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। প্রতিষ্ঠানটির আগের গভর্নিং বডির সদস্যদের বিরুদ্ধে ঘুষ খেয়ে অযোগ্য প্রার্থীকে অধ্যক্ষ পদে বসানোর চেষ্টা, টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত সাড়ে চারশ শিক্ষার্থী ভর্তি, অবৈধভাবে ১৪ জন প্রভাষক নিয়োগ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে খারাপ আচরণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই।

আগের কমিটির সব প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, তারা আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানাই। ভর্তিবাণিজ্য ও নিয়োগবাণিজ্যে জড়িত আগের কমিটির অভিযুক্তদের প্রার্থিতা বাতিল করায় প্রতিষ্ঠানটির সুনাম আরো বৃদ্ধি পাবে। মূল ক্যাম্পাসে গভর্নিং বডি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হবে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর গভর্নিং বডির নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১, ২ ও ৩ অক্টোবর  অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হয়। এ সময়ের মধ্যেই প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম জমা নেওয়া হয়েছে। ৯ অক্টোবর মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল। গত ৩ মে ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর থেকে ২৫ দিন প্রতিষ্ঠানটির কোনো গভর্নিং বডি ছিল না। পরে ২ মে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। গভর্নিং বডির নির্বাচনের লক্ষ্যে গত ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে অ্যাডহক কমিটি। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রিজাইডিং অফিসারও নিয়োগ দেন ঢাকা জেলা প্রশাসক।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি সম্পর্কে শিক্ষা উপমন্ত্রী বেশ কয়েকবার মন্তব্য করেছেন এভাবে, ‘ম্যানেজিং কমিটির অশিক্ষিতরা শিক্ষকদের ওপর বেশি কর্তৃত্ব ফলান।’ তিনি বিষয়টি অনুধাবনই করেননি, বরং আরো বলেছেন, শিক্ষকদের সম্মান দেওয়ার মতো শিক্ষিত লোক ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। ম্যানেজিং কমিটির অশিক্ষিতরা শুধু শিক্ষকদের ওপর কর্তৃত্বই ফলান না, তাদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও করেন। কান ধরে ওঠবস করানো, গায়ে মলমূত্র ঢেলে দেওয়ার মতো অমানবিক আচরণ তাদের ওপর করা হয়।’ এগুলো বাস্তব ঘটনা, বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা সদস্য হওয়া মানে এগুলো করতে পারার লাইলেন্স পাওয়া। দুদিন আগে তিনি আরো বলেন, অর্ধশিক্ষিত ম্যানেজিং কমিটি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করলে সেখানে জ্ঞানচর্চা বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। মন্ত্রী মহোদয় চমৎকার কথা বলেছেন।

রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই ব্যবস্থাপনা কমিটির পদগুলো দখল করে রাখেন; কারণ সেখানে অর্থনৈতিক ফায়দা রয়েছে। এই কমিটি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে আসছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। এই খেলা চলছে দেশের সর্বত্র। এই অর্থ হাজার বা দু-এক লাখ টাকা নয়, দশ থেকে পনেরো লাখ; এমনকি বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ ব্যবস্থাপনা কমিটিতে থাকার কথা ছিল এলাকার প্রকৃত গণ্যমান্য, শিক্ষিত ও বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিরা। তাদের অংশগ্রহণ শিক্ষা কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করবে, উন্নত করবে। কমিউনিটির সরাসরি অংশগ্রহণে শিক্ষা কার্যক্রম হবে আরো বেগবান, বাস্তবধর্মী ও অংশগ্রহণমূলক। তাদের সহযোগিতায় এক নতুন শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাদের এলাকার প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উন্নয়নের জন্য তারা থাকবেন নিবেদিতপ্রাণ। এসব উদ্দেশ্যেই স্থানীয় জনসাধারণের সম্পৃক্ততা থাকতে হয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। কিন্তু হয়েছে পুরো উল্টো (দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া)। তাই বহুদিন ধরে সরকার চেষ্টা করছে এখানে কিছু একটা করা; যেসব কারণে শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে, তার কয়েকটি কারণের মধ্যে এটি  হচ্ছে মুখ্য একটি কারণ।

ভিকারুননিসা নূনের মতো ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচন, ভর্তিবাণিজ্য, বদলিবাণিজ্য, শিক্ষক নিয়োগবাণিজ্য বন্ধ করা প্রয়োজন। আমরা জানি, রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল ও কলেজ শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিচালিত একটি বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে ভর্তি প্রক্রিয়া এবং শিক্ষক নিয়োগ সবই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়; কারণ এখানে ভিকারুননিসার মতো  গভর্নিং বডি নেই, নির্বাচন নেই। এখানকার গভর্নিং বডি আলাদা। কোনো নির্বাচন নেই। শিক্ষা সচিব এই গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজও বিশেষ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানকার ভর্তি প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ, শিক্ষক নিয়োগও স্বচ্ছ। কারণ ভিকারুননিসার মতো গভর্নিং বডি নেই। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে রাজউক ও রেসিডেনসিয়ালের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে প্রতিষ্ঠানটির ভর্তি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে পারে। অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবার আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। নির্বাচন নামক অর্থের খেলা বন্ধ করতে পারে। এটি না করলে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয়করণও করা যেতে পারে। জাতীয়করণ করতে কোনো জটিলতা নেই; কারণ সরকারকে এখানে কোনো অর্থ খরচ করতে হবে না; বরং এখান থেকে উদ্বৃত্ত রাজস্ব আসবে। তবে প্রচলিত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো টিউশন ফি না ধরে স্ট্যান্ডার্ড টিউশন ফি ধার্য করে  শিক্ষার্থী ভর্তি ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা নিয়ে আসা যায়। ২৫ অক্টোবর গভর্নিং বডির নির্বাচনে ভুয়া ভোটার, ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকাসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের বিষয় তুলে ধরতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন কয়েকজন প্রার্থী। ২৬ অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। এতে প্রায় বিশজন প্রার্থী উপস্থিত থেকে অনিয়মের বিষয় তুলে ধরেছেন। নির্বাচন বাতিলের দাবিতে তারা মামলা করারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২ হাজার ১০০ অভিভাবক ডাবল ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকলে মূল পড়াশোনার কী হবে?

বিদ্যালয়ের অদক্ষ, অশিক্ষিত, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও সভাপতির দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচার জন্য তাই শিক্ষাকে জাতীয়করণের কথা উঠছে বার বার। শিক্ষকরা চান রাষ্ট্রপরিচালিত বডি তাদের দেখভাল করুক। তাহলে তারা নিরাপদে থাকবেন, তারা সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকবেন। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষাদান না হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে শিক্ষক সংকট, আরেকটি হচ্ছে রাজনৈতিক ম্যানেজিং কমিটি ও অদক্ষ শিক্ষক। শিক্ষা খাতকে অরাজক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে তথা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের জন্য ২০০৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরসিএ। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে ন্যস্ত করা হয় এনটিআরসিএ’র কাছে। কিন্তু চাকরিপ্রার্থীরা এনটিআরসিএ’র গাফিলতি ও অদক্ষ নিয়োগ পরিকল্পনার ফাঁদে পড়ে দিশেহারা এবং আশাহত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেন অযথাই এসব ঝামেলা বাধিয়ে রাখা হচ্ছে। এগুলো থেকে শুধু ভিকারুননিসাই নয়, দেশের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিষয়ক কলাম লেখক

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads