• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
সিন্ডিকেটের কবলে পেঁয়াজের বাজার এবং অসহায় সাধারণ মানুষ

ফাইল ছবি

মতামত

সিন্ডিকেটের কবলে পেঁয়াজের বাজার এবং অসহায় সাধারণ মানুষ

  • প্রকাশিত ১৩ নভেম্বর ২০১৯

পেঁয়াজ গুরুত্বপূর্ণ একটি মশলাজাতীয় ভোগ্যপণ্য, যা দৈনন্দিন রান্নায় ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ভারত ও চীনে। বাংলাদেশেও পেঁয়াজ চাষ হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ভারত, চীন, পাকিস্তান কিংবা মিয়ানমার থেকেই আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশে পেঁয়াজের চাহিদা মেটাতে হয়। তবে ভারত থেকে যখন পেঁয়াজ আমদানি কম হয় কিংবা দাম বৃদ্ধির গুজব ছড়ায়, তখনই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজার। অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেশব্যাপী ভোক্তাদের দুর্ভোগে ফেলে হাজার কোটি টাকা মুনাফা ভোগ করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজের বাজারে কারসাজির মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০ কোটি টাকা করে গত চার মাসে ভোক্তাদের ৩ হাজার ১৭৯ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কনসাস কনজুমার্স সোসাইটি (সিসিএস)। জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘পেঁয়াজ সিন্ডিকেটের মূল্য নৈরাজ্য’ শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এ অভিযোগ করে। রান্নায় ব্যবহারের একটি উপকরণ থেকেই নিয়মিত মূল্যের বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া থেকেই বোঝা যায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি ভোক্তারা।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ১১ জনের সিন্ডিকেটের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পেঁয়াজের দাম বাড়াচ্ছে। একজনের সিন্ডিকেটটির অবস্থান টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরে। যারা মিয়ানমার থেকে মাত্র ৪২ টাকা কেজি হিসেবে পেঁয়াজ আমদানি করলেও দেশে ৯৫ টাকার কমে বিক্রি করছে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকেও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে অভিযান চালিয়ে আমদানি ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে ব্যাপক কারসাজি পেয়েছে। পাইকারি বাজার থেকে ক্রয়ের মাধ্যমে খুচরা বাজারে পেঁয়াজ ৭০ টাকার মধ্যে বিক্রয় করা সম্ভব হলেও পাইকারি ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে খুচরা দোকানিদের কাছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা করে কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রির কারণে দোকান থেকে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দামে পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হলেও এখনো দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কম নয়, যারা সীমিত আয়ের মাধ্যমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। দৈনন্দিন রান্নার মধ্যে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হওয়ার কারণে পেঁয়াজবিহীন রান্না সম্ভব নয়। পেঁয়াজের বাজারে চলমান অস্থিরতা তৈরির আগেও পেঁয়াজ খুচরা বাজারে মাত্র ২০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি করা বন্ধ করে দিয়েছে মর্মে খবর প্রচারের পরই পেঁয়াজের দাম ৪ থেকে ৫ গুণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে এখন স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ।

ব্যবসার মাধ্যমে আয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড না থাকলেও মানুষকে জিম্মি করে এবং সীমাহীন দুর্ভোগে ফেলে অর্থ উপার্জন করা সঠিক কাজ নয়। ক্রেতা সন্তুষ্টির মাধ্যমে যেকোনো মূল্যে পণ্য ক্রয় করলেও বিক্রেতারা যদি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করে অর্থ উপার্জন করে তা নিঃসন্দেহে অবৈধ কাজের অংশ। শুধু ভোগ্যপণ্য নয়, যেকোনো মাধ্যমেই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য লক্ষ করা যায় বাংলাদেশে। ধর্মীয় উৎসবের আগে নিয়মিতই যা মহামারী আকার ধারণ করে।

বাংলাদেশে পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয় এবং দেশেও পেঁয়াজ উৎপাদন করা হয়। চলমান অস্থিরতার শুরুতে ভারতে পেঁয়াজের সংকটের সংবাদ প্রকাশের পরই সারা দেশে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির গুজব ছড়িয়ে, আগে মজুত থাকা কম দামের পেঁয়াজের দামও বাড়িয়ে দিয়ে অধিক মুনাফা ভোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। অথচ ভারত ছাড়াও পাকিস্তান এবং মিয়ানমার থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করে বাংলাদেশ। মিয়ানমার ও পাকিস্তানের পেঁয়াজের সংকট না থাকলেও শুধু ভারতে পেয়াজ সংকটের সংবাদেই হু হু করে বাড়িয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম। বর্তমানে ভারত থেকে নয়, মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত পেঁয়াজের মাধ্যমেই দেশে পেঁয়াজের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তবে এরই মাঝে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। দেখেশুনে মনে হচ্ছে-শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আমাদের সরকারও অসহায় এই সিন্ডিকেটের কাছে।

কাজেই সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে আহ্বান, পেঁয়াজ নিয়ে চলমান সংকট দূর করতে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে রুখে দিয়ে পেঁয়াজের অস্থিতিশীল বাজার স্বাভাবিক করুন এবং জনসাধারণের ভোগান্তি দূর করে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনুন।

লেখক : জুবায়ের আহমেদ

শিক্ষার্থী, ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম

অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads