• শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
গণমাধ্যমের সংকট ও উত্তরণ এবং কিছু কথা

প্রতীকী ছবি

মতামত

গণমাধ্যমের সংকট ও উত্তরণ এবং কিছু কথা

  • মাছুম বিল্লাহ
  • প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর ২০১৯

একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এ বছরে এক মাসেই ৩২ জন সংবাদকর্মীকে ছাঁটাই করেছে। অর্থনৈতিক সংকটের কথা জানিয়ে তাদেরকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল এবং তারা তা করতে বাধ্য হয়েছেন। বেতন না পাওয়া এবং চাকরি হারানোর শঙ্কা, উপযুক্ত বেতন না পাওয়া এখন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার আলোচ্য বিষয়। আমি একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই। একটি অনুষ্ঠানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কিছু কর্মী আমাকে ঘিরে ধরেছেন, ভিজিটিং কার্ড চেয়েছেন, দিয়েছি। একটু পরেই একজন বলছেন, ‘স্যার আপনাকে আমরা ভালোভাবে ক্যাচ করেছি, আজ রাতে অমুক অমুক টাইমে আপনাকে ভালো করে দেখানো হবে। আমাদের একটু চা-পানি খাওয়ার পয়সা দেন।’ আমি যেহেতু শিক্ষার মানুষ তাই ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার সঙ্গে সেভাবে পরিচিত নই। দু-তিনবার চেয়েছে, তাদেরকে কোনোরকম এড়িয়ে গেলাম। বুঝলাম ইলেকট্রনিক কর্মীদের অবস্থা ভালো নেই।

পত্রিকায় দেখলাম একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল তাদের বার্তা বিভাগই বন্ধ করে দিয়েছে। গত দুই দশকে গণমাধ্যমে পরিবর্তন যা হয়েছে, তার বড় দিক হচ্ছে বেসরকারি টেলিভিশন-রেডিওর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। দেশে এখন ৩০টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চালু আছে,  আরো ১৫টি সম্প্রচারে আসার অপেক্ষায় আছে। ২৬টি বেসরকারি রেডিও চালু রয়েছে। এছাড়া প্রতি জেলায় রয়েছে কমিউনিটি রেডিও। এত বেসরকারি রেডিও টেলিভিশনের ছড়াছড়ি কেন? রেডিও ও টেলিভিশনের লাইসেন্স পাওয়ার প্রধান শর্তই হচ্ছে রাজনৈতিক পরিচয়। এটি নিয়ে আর কোনো কথা বলার ফাঁক নেই। উত্তর আমরা পেয়েই গেছি—কেন এত প্রাইভেট চ্যানেল, প্রাইভেট রেডিও, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। রাষ্ট্র পরিচালিত টিভি চ্যানেল কেউ ভুলে হয়তো খুলে ফেলে কিন্তু দেখার জন্য ওই চ্যানেল কেউ খোলে কি না সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ সবারই জানা। তবে তাদের তো আর চিন্তা নেই। টিভি কেউ খুললেও তাদের চাকরি আছে, না খুললেও আছে। কিন্তু বেসরকারি চ্যানেলের বিষয় তো আলাদা। কিছু বেসরকারি চ্যানেল প্রথমদিকে  মানসম্মত অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার চেষ্টা করত, কিন্তু গন্ডায় গন্ডায় চ্যানেল হওয়ায় এত ভালো ভালো অনুষ্ঠান আর কোথায় পাবে?

বাংলাভিশনের বার্তা বিভাগের প্রধান মোস্তফা ফিরোজ মিডিয়ার ক্রাইসিস সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং সরকারি চাপের কারণে এ মাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। ফলে মানুষ একেবারে আস্থা হারিয়ে ফেলছে। সরকারের চাপ দেখা যায় না। কিন্তু সেটা দৈত্য কিংবা ভূতের মতো এ মাধ্যমের সবকিছুতেই খড়্গহস্ত চালাচ্ছে। সেজন্য বেসরকারি টেলিভিশনের নিউজ, টকশো বা অন্য অনুষ্ঠান-সব একই রকম। কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের আলাদা বৈশিষ্ট্য বের করা মুশকিল। তাই মানুষ তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে অনত্র। ভারতীয় টেলিভিশন কিংবা ফেসবুক বা ইউটিউবে।’ অন্য একজন বলেছেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয়ে লাইসেন্স পাওয়ার পর সেই ব্যক্তি তার অন্য ব্যবসার ঢাল হিসেবে মিডিয়াটি চালু রেখেছে। মিডিয়ায় কোনো ধরনের বিনিয়োগ না করে কোনোভাবে টিকিয়ে রেখেছেন।’ একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক বলেছেন, ‘নানামুখী চাপের কাছে এখন অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতা করে চলতে হচ্ছে। ফলে সংবাদপত্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমেছে। সংবাদপত্রে এখনো সরকারি বিজ্ঞাপনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’ এছাড়া এখন সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দিয়ে কোনো কোনো পত্রিকায় বড় বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বন্ধ করার অভিযোগও রয়েছে।

ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভিড়ের মধ্যেও সংবাদপত্র কিছু আস্থা নিয়ে টিকে ছিল। এখন সামাজিক মাধ্যমের কারণেও সংবাদপত্র শিল্প বড় সংকটের মুখে পড়েছে। কোনো ঘটনা ঘটলে মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ এখন ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে তা পেয়ে যাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে পরদিন গিয়ে সেই সংবাদ দেখার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিও সংবাদমাধ্যম সংকটের আর একটি কারণ। তবে এটি আমাদের মনে রাখা উচিত যে, শুধু সংবাদ দেখার জন্য কিন্তু মানুষ পত্রিকা পড়ে না। সেখানে তারা ওই সংবাদের পেশাগত বিশ্লেষণ দেখতে চায় যা অমাদের মিডিয়া দর্শক-পাঠকের চাহিদামাফিক করতে পারছে না। আমাদের দেশে অনলাইনের সঠিক কোনো সংখ্যা নেই। প্রথমবারের মতো এগুলো নিবন্ধনের জন্য সরকার আবেদন নিয়েছে তাতে আড়াই হাজারেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এখন পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। ফলে তারা ভালো বিজ্ঞাপন পেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু বেশির ভাগই সেভাবে আস্থা অর্জন করতে পারেনি এবং সেটিও গণমাধ্যমের আর একটি সংকট।

টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা, অনলাইন, নিউজপেপার-সবারই আয়ের মূল উৎস বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপন নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। তাদের ছোট এ বাজারে অনেক অনেক মিডিয়া ভাগ বসাচ্ছে। এছাড়া বিজ্ঞাপন এখন ভারতেও চলে যাচ্ছে। মিডিয়ার এক সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের বাজার রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ বিজ্ঞাপন, ভারতীয় চ্যানেল, ইউটিউব, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে চলে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিও সংবাদমাধ্যম তথা মিডিয়াকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে। সভ্যতার অগ্রগতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে মিডিয়াকে বাঁচতে হবে, মিডিয়াকে বাঁচাতে হবে। একটি দেশের সব ধরনের মানুষের কথা, মতামত প্রতিফলিত করে সংবাদমাধ্যম। কোনো দেশের কোনো সরকারই প্রকৃতঅর্থে চায় না যে, মিডিয়া তার নিজের গতিতে চলুক। নিজের গতিতে চললে সরকারের সব ধরনের সমস্যা জনগণের সামনে চলে আসবে তাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হবে। এটি কে চায়? কেউই চায় না। তাই কোনো যুগেই মিডিয়া পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না। মিডিয়া এর মধ্যেই কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা একটু ভিন্ন যা মিডিয়ার সাথে সরাসারি জড়িত দু-একজনের কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে। আমরা পাঠক, দর্শক, লেখক ও সাধারণ জনগণ তো সরকারকে বলতেও পারব না, আর বাধ্যও করতে পারব না মিডিয়াকে স্বাধীনতা দিতে। মিডিয়ার স্বাধীনতা মিডিয়াকেই অর্জন করতে হবে। আর সেটি সবার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। যারা প্রকৃতঅর্থে দর্শক-পাঠকের কথা, জগনগণের কথা ভাববে, তারাই সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে টিকে যাবে।

কিছু কিছু বেসরকারি চ্যানেল দর্শকদের মানসম্মত অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করে। কিছু কিছু সংবাদপত্র পাঠকের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করে কিন্তু প্রকৃত পেশাদরিত্ব এখনো সেই অর্থে গড়ে ওঠেনি। যেমন কিছু টিভি চ্যানেল কোনো বিষয় নিয়ে ‘টক শো’ আয়োজন করলে দেখা যায়, সেখানে একই মুখ বারবার আসে কিংবা এমন লোকদের আনা হয় তাদের শুধু ফেসভ্যালু আছে অথবা একেবারেই কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব; যারা ওই বিষয়টিকে হয় ভালোভাবে ব্যাখ্য করতে পারছেন না কিংবা করলেও নিজের রাজনৈতিক কালার দিয়ে রাঙিয়ে তোলেন, ফলে দর্শকরা যে উদ্দেশ্যে টিভির সামনে বসেছেন তার ধারেকাছেও তারা যান না। আর রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যখন নিয়ে আসা হয় তখন সৌজন্যবোধ তো থাকেই না, অযথা তর্কাতর্কি শুরু হয়ে যায়। তাহলে দর্শক কেন দেখবে এসব?

সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও দেখা যায় কে লিখেছেন সেটিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়, কী লেখা হয়েছে সেটিকে খুব কম পত্রিকাই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। পত্রিকা মনে করে অমুক ব্যক্তির লেখা দেখলেই বোধহয় পাঠক পড়বে, আসলে ব্যাপারটি তা নয়। পাঠকের রুচির দিকে তাকিয়ে মতামত যাচাই করার কোনো পদ্ধতি, মেকানিজম বা ইচ্ছে কোনো পত্রিকার আছে কি না আমার জানা নেই। তবে প্রফেশনালিজমের জন্য এটি করা উচিত। শুধু সরকারকে দোষ দিলে হবে না। কারণ সরকার কখনোই চাইবে না সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে উদারহস্তে মুক্ত করে দিতে। কোনকালেই কেউ দেয়নি।

যদি রাজনৈতিকভাবে বলি তাহলে বলতে হয়, কোনো দেশের মিডিয়া হচ্ছে সরকারের বিরোধী দল। কোনো দেশের সরকারই (যেখানে গণতন্ত্র নামের তন্ত্র আছে) বিরোধী দলকে কখনোই সঠিকভাবে দাঁড়াতে দেয় না, কারণ বিরোধী দল দাঁড়ালেই তাদের বসতে হবে। কিন্তু তাই বলে কি রাজনীতি থাকবে না? মিডিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ, রাজনৈতিক বিশ্বাস-নির্বিশেষে মিডিয়াকে সবার আস্থা অর্জন করতে হবে। এটি নিয়ে তাদের গবেষণা না থাকলেও অন্তত স্টাডি করা উচিত। কোনো মিডিয়াই সেটি করে না। শুধু রাজনৈতিক পরিচয়কেই বড় করে দেখে। ফলে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

সিনেমাও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আমাদের সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, এফডিসিতে অন্ধকার নেমে এসেছে অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সিনেমার রমরমা ব্যবস্যা! ভারতের সিনেমা দেখলে প্রায় সিনেমাতেই দেখা যায়, পুলিশের দুর্নীতির চিত্র যা জনগণ পছন্দ করে। ভারতের সরকার কি চায় পুলিশের দুর্নীতি এভাবে দেখানো হোক? নিশ্চয়ই চায় না। কিন্তু দর্শকপ্রিয়তা পেয়ে গেছে বলে সিনেমা চলছে, সরকারও সেভাবে কিছু বলতে পারছে না। আমাদের দেশে কোনো সিনেমাতে কি কেউ এই ধরনের দুর্নীতির চিত্র দেখানোর চেষ্টা করেছেন? তারা হয় নারীদের দেহ দেখানো নিয়ে ব্যস্ত নতুবা ভারতীয় কোন সিনেমার নকল কাহিনী অথবা ফকিরের ছেলে আর রাজার মেয়ের মধ্যে প্রেম, আবার বস্তির মেয়ে আর গুলশানের ছেলের মধ্যে প্রেম নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এর বাইরে আমাদের কয়টি সিনেমা আছে? এগুলো দর্শক কেন দেখবে? এজন্য শুধু সরকারকে দোষ দিলে হবে না। কাজের কাজটি এই জনগণকেই করতে হবে। যুগে যুগে তাই হয়ে এসেছে। জনগণই তার সরকারকে পথ দেখিয়েছি। গণতন্ত্র, সংবিধান, নির্বাচন আপনাতেই আসেনি। তার জন্যে দেশে দেশে ঘটেছে অনেক রক্তপাত, অনেক শিল্পবিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, সিপাহি বিপ্লব, ম্যাগনাকার্টা ইত্যাদির অবদান কম নয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই নিজেদেরকেই ঠিক করতে হবে। সুতরাং গণমাধ্যমে বর্তমান সংকট উত্তরণের পথ গণমাধ্যমকর্মীদেরই রচনা করতে হবে।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads