• শনিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২১, ৪ বৈশাখ ১৪২৮
দেশগড়ার কাজে ব্রতী হতে হবে

প্রতীকী ছবি

মতামত

দেশগড়ার কাজে ব্রতী হতে হবে

  • প্রকাশিত ০৮ এপ্রিল ২০২১

‘সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়;/জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবুও মাথা নোয়াবার নয়।’ শত সমস্যার মধ্যেও আজ আবার নতুন করে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। স্বপ্ন দেখছে দিন বদলের, সমৃদ্ধিতর এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্র তৈরি করাই এখন সময়ের বড় কাজ। দিন বদলের পালায় আমাদের সফলতা ও অগ্রযাত্রা কথা চিন্তা করি স্বাধীনতার পর প্রায় চারটি দশক গত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে নানা ক্ষেত্রে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনীর পরিচয় রেখেছি। পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী ক্ষমতায়ন, অ-লাভজনক উন্নয়ন উদ্যোগ বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ গ্রামীণ অনানুষ্ঠানিক খাতের বিকাশের ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক উদ্যোক্তারা যথেষ্ট সাফল্য দেখিয়েছে। এদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পুঁজির সমর্থন দিতে পারলে এরা অসাধ্য সাধন করবেন।

দেশের অন্যতম ব্যবসায়ী সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিজিসিআই) ‘ভিশন টু থাউজেন্ড টুয়েন্টি ওয়ান’ শীর্ষক উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় এ মর্মে মন্তব্য করেছে যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৪ সীমিত রেখে ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৭ শতাংশ অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে। জিডিপি ২০১৮-১৯ অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি হার ছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। তবে ২০২০-২১ সালের জাতীয় বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরামর্শক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘প্রাইস ওয়াটার হাউসে’র মতে, আগামী ২০৫০ সালের বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিবে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীনের মতো দেশগুলো। এছাড়া ৩০টি সম্ভাব্য নেতৃস্থানীয় দেশের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে, যারা ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হবে। এই তালিকায় বাংলাদেশের নাম ও আছে। কৃষি ক্ষেত্রে এসেছে ব্যাপক সাফল্য। বাংলাদেশ আজ কৃষিতে আত্মনির্ভরশীল। এটা ১৫ বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। কৃষি খাতে আধুনিক ধারার প্রবর্তন ঘটেছে। বিশেষ করে হাইব্রিড শস্যের চাষাবাদ, আধুনিক সেচ পদ্ধতি। কৃষিতে বহুমুখীকরণ বিশেষ করে শাকসবজি উৎপাদন বেড়েছে কল্পনাতীতভাবে। কৃষিজাত দ্রব্যের রপ্তানিতে ও বেশ এগিয়েছে। বর্তমান খাদ্যে উৎপাদনের পরিমাণ ৪ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের খাদ্য চাহিদার মাত্র ১০-১৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। স্বাধীনতার পর আরেকটি খাতে আমাদের অর্থনীতিতে কিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছে তা হলো প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ। গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে আড়াই থেকে তিন লাখ জনশক্তি চাকরি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছে। এ যাবৎ প্রায় ত্রিশ লাখ এদেশের নাগরিক পৃথিবীর নানা দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গিয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ৭-৮শ কোটি ডলার আয় হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে গেছে। সারা দেশে ৫০টিরও বেশি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২ কোটি শিক্ষার্থী এ কর্মসূচি দ্বারা উপকৃত হচ্ছে। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়নে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, যেমন- গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, ইসলামী ব্যাংক, প্রশিকা, আশা প্রভৃতি ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ দৃষ্টান্তমূলক নজির স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের আইটি খাত রপ্তানি বাণিজ্যে বিশেষ অবদান রাখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন টেলিমেডিসেন সেবা, অনলাইন ক্লাস, ই-কর্মাস, ই-সেবা সহ প্রতিটি সেক্টরে এগিয়ে চলছে।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে সভ্যতার রূপ, পাল্টে যাচ্ছে তার পারিপার্শ্বিক জীবনব্যবস্থা। নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও প্রস্তুতি চলছে নিজেকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে সম্মানজনক স্থানে প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু সম্প্রতি আমাদের জাতীয় জীবনে নানা কারণে বিশৃঙ্খলা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে স্বার্থান্বেষী মানুষ মাত্রই মেতে উঠেছে ক্ষমতাধর হওয়ার প্রতিযোগিতায়। কল্যাণমুখী রাজনীতি হয়ে পড়েছে কলুষিত। তার ফল হয়েছে ভয়াবহ। শিক্ষার ক্ষেত্রে, সমাজজীবনের অলিগলিতে উচ্ছৃঙ্খলতার ভয়াবহ রূপ দেখা যাচ্ছে। একদিকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-কলহ, অপরদিকে অর্থনৈতিক দুর্দশা, ফলে শিক্ষাজগতে নৈরাজ্য, সমাজসেবার নামে নিজের স্বার্থ হাসিল এবং স্বেচ্ছাচারিতা যুবসসমাজকে বিপথগামী করেছে। সমাজ জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। তারপরও আমরা স্বপ্ন দেখি এক সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। দেশের মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস আলোকিত পথে যাত্রার সূচনা করতে।

বর্তমান সরকার বিচার বিভাগ পৃথক্করণ, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস, দুদক প্রভৃতি পুনর্গঠন করেছে। সরকারের আরেকটি ইতিবাচক কাজ হলো ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন, বায়োমেট্রিক চাপ। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সশস্ত্র বাহিনী এ কাজটি সম্পন্ন করায় প্রশংসা অর্জন করে। এসব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অতীতের সকল গ্লানি, ব্যর্থতা, সংঘাতময় রাজনীতি ঐতিহ্য পেছনে ফেলে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্বাধীনতার অঙ্গীকার ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতা, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিশাপমুক্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার কতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ ও বিশ্বমন্দার মোকাবিলায় সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, দারিদ্র্য ঘোচাও বৈষম্য রোখো নীতি গ্রহণ, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, নারী ক্ষমতায়ন, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার, দেশগঠন ও দেশ পরিচালনায় তরুণদের অংশগ্রহণ, তাদের সৃজনশীলতা বিকাশের সর্বোচ্চ সুযোগ করে দেওয়া।

পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। নতুন পৃথিবী, নতুন স্বপ্ন। পৃথিবীর মানুষ এই স্বপ্নের বিভোর। আমরা বুঝতে পারছি না নতুন যুগের সূচনা হয়েছে, নতুন রেনেসাঁস। এই নতুন রেনেসাঁস ও নতুন জীবনদর্শনের তাৎপর্যই আলাদা। এই নতুন জীবনদর্শনের মূল কথা হচ্ছে জীবনকে পরিপূর্ণ করা। সেজন্যই এত আয়োজন, এত উদ্যোগ, এত শ্রম ও সাধনা, দিন বদলের চিন্তা-ভাবনা ও আগ্রহ। জীবনে দুঃখ আছে, গ্লানি আছে, পরাজয় আছে, ব্যর্থতা আছে, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। মানুষ তার উদ্যম, প্রচেষ্টা ও শ্রম দিয়ে এই ব্যর্থতাকে জয় করে করেছে এবং জয় করে চলবে। বর্তমান পৃথিবীর মানুষও এই অবিরাম অব্যাহত প্রয়াস, উদ্যম ও শ্রম সাধনাকে বেছে নিয়েছে। জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, নৈপুণ্যে, দক্ষতায়, শিল্প-সাহিত্যে, সংগীতে, ক্রীড়ায়, আবিষ্কারে, উদ্ভাবনে। সে তার শ্রম ও সাধনায় আলোকিত, বিকশিত, উদ্ভাসিত করেছে পৃথিবী।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে সোনার বাংলাকে ঘিরে যে স্বপ্ন আমরা দেখেছি, তা বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। সমাজের কাছে আমরা প্রতিটি মানুষ দায়বদ্ধ। ঋণ পরিশোধের দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে আমাদের। অন্নহীনে অন্ন এবং নিরক্ষরকে জ্ঞানের আলো দিয়ে আমাদের স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে হবে। সবরকম বিভেদ-বিচ্ছেদ ভুলে হানাহানি-সংঘাত ভুলে, সংকীর্ণ স্বার্থচিন্তা জলাঞ্জলি দিয়ে দেশ গড়ার কাজে ব্রতী হতে হবে, তবেই আমাদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের জীবনমান ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন এক জায়গায় থেমে নেই। দিন বদলের পালায় আমরা এগুচ্ছি সামনের দিকে। অসামান্য সম্ভাবনার দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। এ সম্ভাবনাকে এতদিন সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়নি। পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হলে এই দেশ কখনো পিছিয়ে থাকতে পারে না। অবশ্যই দিন বদল হবে। আর এজন্যে অনাগত দিনে একটি উন্নত ও আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এ সত্যের বিকল্প নেই।

লেখক :নেজাম উদ্দীন

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads