• বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২ বৈশাখ ১৪২৭
খনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

প্রতীকী ছবি

মতামত

খনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

  • প্রকাশিত ০৮ এপ্রিল ২০২১

খনিজসম্পদ বা প্রাকৃতিক সম্পদ একটি দেশের জাতীয় সম্পদ। দীর্ঘদিন ধরেই মানুষ খনি থেকে সম্পদ তুলছে। নদী, খাল, জলপ্রবাহ, জলপ্লাবিত এলাকার তলদেশে এসব খনিজসম্পদ পাওয়া যায়। আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত যারা এসব মূল্যবান সম্পদ আহরণের কাজ করে যাচ্ছেন, তারাই খনি শ্রমিক। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমার অন্তর্বর্তী মহাসাগরের অন্তরস্থ সব খনিজসম্পদই আমাদের জাতীয় সম্পদ। প্রতি বছর ৪ এপ্রিল বিশ্বে ‘আন্তর্জাতিক খনি নিরাপত্তা দিবস’ পালিত হয়। খনিজসম্পদ এবং খনি শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এ দিবসটি পালন করা হয়। মূলত সচেতনতা বাড়ানোর জন্যই দিবসটি পালন করা হয়। এদিন শ্রমিকদের কার্যকলাপ সম্পর্কে নতুন করে জানানো হয়। সচেতনতার জন্য প্ল্যাকার্ড লাগানো হয়। তবু যেন খনি শ্রমিকদের ঝুঁকি থেকেই যায়।

খনিজসম্পদ আহরণের জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকের। এদেশের মানুষ প্রশিক্ষণের জন্য এ পেশায় যোগ দিতে না পারলেও দেশের বাইরে গিয়ে কোম্পানি কর্তৃক প্রশিক্ষণ নিয়ে এ কাজে যোগদান করেন। তবে এ কাজে শ্রমিকদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। খনিগুলো ভূগর্ভস্থ অবস্থায় থাকে। সেজন্য খনি শ্রমিকদের মাটির অনেকটা গভীরে প্রবেশ করে সম্পদ আহরণ করতে হয়। খনিগুলোতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাগত দিক দিয়ে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা না হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যায়। খনিতে ঘটা দুর্ঘটনাগুলো হঠাৎ করেই হয়ে যায়। সাধারণত খনিতে হঠাৎ ধস এবং খনির মধ্যে বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে সেখানে কর্তব্যরতদের মৃত্যু হয়। এজন্য খনিতে কাজ করার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। খনি শ্রমিকদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অপূর্ণতায় দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির অপেক্ষা বেশি লোক মারা যায়। প্রতি বছর খনি থেকে সম্পদ তুলতে গিয়ে মৃত্যু হয় হাজার হাজার শ্রমিকের। দীর্ঘদিনেও খনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। এশিয়ায় এই মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে কয়লাখনিতে কাজ করা শ্রমিকের মৃত্যুসংখ্যা বেশি। হাজার বছর আগে থেকে খনির সম্পদ ব্যবহার করে মানুষ তার জীবনযাত্রাকে এগিয়ে নিয়েছে। অথচ খনি শ্রমিকের দুর্দশা এখনো কাটেনি। পৃথিবীর সব খনিতে নামার আগে তার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয় বলে স্বাক্ষর করে নামতে হয়। অর্থাৎ সার্বক্ষণিক ঝুঁকি নিয়েই খনিতে কাজ করতে হয়। নিরাপত্তার সঙ্গে বেশিরভাগ খনি শ্রমিকরা ন্যায্য পাওনাও পান না।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ১৯৮৫ সালে দিনাজপুর জেলার বড়পুকুরিয়ায়, ১৯৮৯ সালে রংপুর জেলার খালাশপীর এবং ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরের দীঘিপাড়ায় কয়লাখনি আবিষ্কার করে। বাংলাদেশের খনিতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ২০১৩ সালের ২৬ মার্চ বড়পুকুরিয়া খনিতে কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের কারণে কেকসি (৪৮) নামে এক চীনা প্রকৌশলীর মৃত্যু হয়েছিল। সর্বশেষ দুই মাস ধরে বন্ধ থাকা চীনের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে একটি কয়লাখনিতে শ্রমিকরা ভূগর্ভস্থ খনির সরঞ্জামাদি ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার সময় কার্বন মনোক্সাইড নির্গত হওয়ায় ১৮ খনি শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০১৩ সালে ওই খনিতে দুর্ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়। দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে চীনে খনি দুর্ঘটনা একটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খনিতে মৃত্যুর হার চীনে সবচেয়ে বেশি। এছাড়া ভারত, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইউক্রেন, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে খনিতে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। বড় বড় খনিজ পদার্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে হাইড্রোলিক মাইনিংয়ের মতো যন্ত্রের প্রয়োগ খনি উত্তোলনে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়ে খনি শ্রমিকের মৃত্যুহার কমালেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এখনো খনি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এতে শত শত খনি শ্রমিককে প্রাণ হারাতে হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি ও মধ্যপাড়া কঠিনশিলা খনিতে খনি শ্রমিকরা মাটির নিচে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এসব খনিতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সহায়ক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য যেমন খনিজসম্পদ প্রয়োজন তেমনি খনির মতো মূল্যবান সম্পদ আহরণের জন্য যারা কাজ করে যাচ্ছে, তাদের জীবনেরও পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া উচিত। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই হোক না কেন, খনিতে কর্তব্যরত সবাইকে বাধ্যতামূলক পোশাক পরা ও এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। খনিশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উন্নত বিস্ফোরক, বাষ্পচালিত পাম্প, খনন পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন করার পাশাপাশি খনি শ্রমিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: মেহেরাবুল ইসলাম সৌদি

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads