• বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯, ১৩ চৈত্র ১৪২৪
ads
কেমন করবেন নতুনরা

নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা

সংরক্ষিত ছবি

সংসদ

সংবাদ বিশ্লেষণ

কেমন করবেন নতুনরা

  • মামুন মুস্তাফা
  • প্রকাশিত ১২ জানুয়ারি ২০১৯

নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের একটি যোগসূত্র রয়েছে। যার মাধ্যমে ওই দলগুলোর মনের ইচ্ছা প্রকাশ পায়। দেশ ও জাতিকে তারা কীভাবে সেবা দিতে পারে এবং উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে পারে। সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের বিজয় নিঃসন্দেহে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত অঙ্গীকারমালা পূরণে চাপে রাখবে, তা বলা অযৌক্তিক হবে না। আর এ বিষয়টি আরো বেশি চাপে ফেলে দিতে পারে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাওয়া অনভিজ্ঞ একেবারেই আনকোরা কিছু নতুন মুখকে।

গত ৭ জানুয়ারি শপথ নেওয়া নতুন মন্ত্রীদের অনেকেই রয়েছেন যারা দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করছেন, আবার রয়েছেন ব্যবসায়ীও। কিন্তু তাদের অনেকে এবারই প্রথম সাংসদ হয়েছেন, হয়েছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা তৃতীয়বারের সরকারে ডাকসাইটে সব নেতাকে বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভায় বেশিরভাগ নতুন মুখ আনা হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হবেন কি না, সে বিষয়টি সম্প্রতি বিশ্লেষণ করেছেন বিবিসি বাংলার কাদির কল্লোল।

এই নতুন মুখের মন্ত্রিসভার সদস্যদের আগে প্রশাসন চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। এরা সরকারের নীতি বাস্তবায়নে কতটা দক্ষতা দেখাতে পারবেন, আমলানির্ভর হয়ে পড়বেন কি না অথবা প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাবে কি না— বিশ্লেষকদের অনেকে এমন প্রশ্ন তুলেছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সাংবাদিক রিয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এই চমকের মন্ত্রীদের জন্য অভিজ্ঞতার ঘাটতি একটা বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে হেভিওয়েটরা বাদ পড়ায় দলের ভেতরে ও বাইরের রাজনীতিও নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে বলে তিনি মনে করেন।

মূলত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে জনগণের মনোবাসনা পূরণে দেশ ও জাতির উন্নয়নের ক্যারিশমাটা নিহিত থাকে অভিজ্ঞ রাজনীতিকের মেধা ও মননে। ভিন্নভাবে উল্লেখ করলে, প্রাচীন জার্মানির পুনঃএকত্রীকরণের মহানায়ক বিসমার্কের পাঁচ আঙুলের করে পিং পং বল নিয়ে খেলা করার মতো। সুতরাং বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞতার চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্বলতা থাকলে সবল হয়ে উঠতে পারেন পেশাদার আমলারা। তখনই বাস্তবায়নগুলো শ্লথ হয়ে যাবে, দেখা দেবে মতদ্বৈততা। প্রশাসনিক জটিলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে রাজনীতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে। সব ধরনের কাজের গতি কমে যাবে।

যদিও আওয়ামী লীগ বলছে ভিন্ন কথা। তারা দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্সের কথা বলে আসছে। বলছে ইশতেহারের অঙ্গীকারমালা পূরণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদ্যম নিয়ে মন্ত্রিসভায় চমক আনা হয়েছে। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, তিনটি শক্ত প্রতিপক্ষ তাদের সামনে উপস্থিত। এক, দলের যেসব অভিজ্ঞ দীর্ঘদিনের রাজনীতিক মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন, তাদের অভিমান বা ক্ষোভ যেন অসহযোগিতায় রূপ না নেয়। দুই, কার্যত শক্তিশালী বিরোধী দলহীন সংসদ যেন একনায়কতন্ত্রে পরিণত না হয়। তা হলে এক সময়কার সাদ্দামের ইরাক কিংবা গাদ্দাফির লিবিয়ার মতো বিপজ্জনক খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াবে দেশ। তিন, একটা বড় বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য দল সংসদে অনুপস্থিত। শেষ পর্যন্ত তারা যদি শপথ না নেন, সংসদে না যান, তবে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কখনো যে সৃষ্টি হবে না, তা বলা মুশকিল। তাকেও মোকাবেলা করতে হবে বর্তমান সরকারকেই।

বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথোপকথনে মন্ত্রীদের অভিজ্ঞতার প্রশ্নে এমনটাই জানান একসময়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, নতুন মন্ত্রিসভায় পুরোদস্তর এবং প্রভাবশালী রাজনীতিকের অভাব রয়েছে। এটিও সরকারের কাজে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মন্ত্রিসভায় রাজনীতিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আলী ইমাম বলেন, ‘আমাদের দেশে অর্থনীতির মূল উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, আমাদের একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু মানুষের আয়ের বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপকভাবে। এই বৈষম্য কমানোর জন্য যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটা কিন্তু ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের কাছে মুখরোচক হবে না। তারা এদিকে যাবে না। রাজনীতিকরা যদি মূল কর্তৃত্বে থাকতেন, তাহলে আশাটা বেশি হতো।’

আওয়ামী লীগ টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে আবারো সরকার গঠন করেছে। ফলে মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ বেশি এনে জনগণকে চমক দেওয়ার পাশাপাশি বৈচিত্র্য বা নতুনত্ব দেখানোর একটা চেষ্টা ছিল। কিন্তু বিষয়টি ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারা’র মতো হবে না তো? যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মন্ত্রীরা নজরদারিতে থাকবেন। হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রীর নজরদারিতে তো অবশ্যই তারা থাকবেন। কিন্তু তারা জনগণের নজরদারিতেও থাকবেন। তবে বড় বাধা হচ্ছে— সাংসদ, মন্ত্রী কিংবা আমলা— তাদেরকে তো সহজে ছোঁয়া যাবে না। বিগত সরকারের আমলেই নানা আইনকানুনের মাধ্যমে তা সুরক্ষা করা হয়েছে। ফলে তাদের অনিয়মের প্রকৃত চিত্র প্রধানমন্ত্রীর সমানে কীভাবে উন্মোচিত হবে, সেটাই দেখার বিষয়।

এখন সরকার বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া পুরনোরাও একটা সময় নতুন ছিলেন। তবে কথা হচ্ছে, রাজনীতিকরা যেকোনো বিষয়ে দ্রুত শিখতে পারেন। উপরন্তু রাজনৈতিক দলের সরকার শক্ত অবস্থানে থেকেই নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে তাদের যুক্তি।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, নতুনরা নিজেরাই দক্ষতার সঙ্গে প্রশাসন চালাতে পারবেন বলে তারা বিশ্বাস করেন। তা ছাড়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাদের এখানে আমলারা যে খুব বেশি করতে পারেন, তা নয়। এটা ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করবে। উপরন্তু একটা কালেকটিভ জবাবদিহি তো আছেই।

আমরা বিগত সরকারের আমলেই দেখেছি, সিনিয়র মন্ত্রীরাও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থেকেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে এবার মন্ত্রিসভায় নতুনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের নির্ভরশীলতার প্রশ্ন সামনে আসছে। এমনকি এই মন্ত্রিসভা গঠনের পর আওয়ামী লীগেরই সব পর্যায়ের নেতারা অবাক হয়েছেন। প্রভাবশালী নেতারা সব বাদ পড়ে যাবেন, এটা তারাও ভাবেননি। তবু তারা তাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপরই যে আস্থা রেখেছেন, তা বিভিন্ন সময়ে তাদের কথাতেই বোঝা গিয়েছে। যেমন— সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, তাদের নেত্রী এবার চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তার অভিজ্ঞতার কারণে নতুনরাও গতিশীল হবে বলে তিনি মনে করেন।

তবে এ কথা সত্য, নতুনরা একবারেই সবকিছু করায়ত্ত করে নেবেন, তা ভাবা অমূলক। তাদের জানতে, বুঝতে ও শিখতে কিছুটা সময় লেগে যাবে। কিন্তু ওই সময়টিতে তাদের মেধা ও বিচক্ষণতাকে কাজে লাগাতে হবে। বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়ে যে যত কৌশলী হতে পারবেন, সে তত দ্রুত সফল হবেন- তা আমরা বলতে পারি। আর সেটি সম্ভব না হলে সুশাসনই সবার আগে বাধাগ্রস্ত হবে।

ভাবতে হবে একটি নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, একই সঙ্গে নাগরিকের মৌলিক অধিকারসহ সুশাসন, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠারও ক্ষেত্র। আর সেটি সম্ভব না হলে বাহ্যিক উন্নয়ন পরিলক্ষিত হতে পারে, কিন্তু সর্বজনীন কল্যাণ বাধাগ্রস্ত হবে। তখনই রাষ্ট্র তার প্রকৃত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যাত্রারথ থেকে বিচ্যুত হয়। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের ওপর যে আস্থা রেখেছেন, তা তারা কীভাবে পূরণ করতে পারেন, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষায় দেশ ও জাতি।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads