• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

ছবি : বাংলাদের খবর

ধর্ম

চলচ্চিত্রে ইসলামের বিজয়গাঁথা 

  • মনযূরুল হক
  • প্রকাশিত ২০ এপ্রিল ২০১৮

জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনাই আনন্দ-বেদনা হয়ে চলচ্চিত্রে বিমূর্ত রূপে ধরা দেয়। এই রূপ বা চিত্র ধারণে মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে হাইসামের ‘কামারা’ (Qamara) আবিষ্কারের কথা ইতিহাস আজো স্বীকার করে। চলচ্চিত্রে অনৈতিকতা যত বেড়েছে, ধর্মবেত্তাগণ তার চেয়েও তীব্রগতিতে চলচ্চিত্র বর্জন করেছেন এবং একসময় ইসলাম-অনুসারীদের কাছে তা ‘নিষিদ্ধ’ ও ‘বয়কটযোগ্য’ আখ্যা পেয়েছে। কিন্তু কালের স্রোতের মতোই চলচ্চিত্র চলমান থেকে গেছে এবং মানুষকে আন্দোলিত করেছে। সমৃদ্ধ করেছে এবং নীতি, তথ্য ও তত্ত্বের বহু উপাদান জোগান দিয়ে ঋদ্ধ করেছে মননবিশ্ব। ইসলাম যেহেতু মানুষের নিত্যদিনের অনুষঙ্গের মতোই সর্বোচ্চ চর্চিত একটি ধর্ম, সুতরাং জীবনের চিত্রায়ণ চলচ্চিত্রে থাকলে ইসলামকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় আদতেই নেই। সুতরাং সূচনালগ্ন পেরিয়ে চলচ্চিত্রের ১৫০ বছরের যাত্রায় ইসলাম এসেছে বার বার। সুবিশাল সংখ্যায় এবং বৃহৎ অঙ্কের বাজেট নিয়ে খাঁটি ইসলামকেন্দ্রিক পজেটিভ চলচ্চিত্র নির্মাণও হয়েছে এরই মধ্যে। ইসলামের ইতিহাসের নায়কদের কীর্তিগাথা ও অবদানের জয়গাঁথা নিয়েই অধিকাংশ মুভি নির্মিত হয়েছে বটে, তবে ব্যতিক্রমও আছে। ইন্টারন্যাশনাল মুভি ডেটাবেজ (আইএমডিবি) ঘাঁটলে যে অজস্র মুভির তালিকা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা থেকে সেরা মুভি নির্ণয় করা সত্যিই দুরূহ। ক্যাটাগরিভিত্তিক কয়েকটি মুভি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো যেসব চলচ্চিত্রে ইসলামের নানা সঙ্গ-অনুষঙ্গের কথা উঠে এসেছে।

 

কোরআনের কাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্র : এই তালিকায় দুটি মুভির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-কিংডম অব সলোমান (২০১০) ও সেন্ট মেরি (২০০০)। দুটি চলচ্চিত্রই ইরানি পরিচালক ‘শাহরিয়ার বাহরানি’ নির্মিত।  যদিও ‘এক্সোডাস : গডস অ্যান্ড কিংস, নোয়াহ, ডেভিড, জোসেফ, জ্যাকব, টেন কমান্ডমেন্টস ইত্যাদিসহ নবীদের জীবনীনির্ভর অনেক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগই বাইবেলের সূত্র নির্ভর, যার সঙ্গে কোরআনিক সূত্রের কিছু কিছু দ্বিমত রয়েছে।

 

রসুলের (সা.) জীবনচরিত নির্ভর চলচ্চিত্র : ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন কাহিনী নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই ইসলামিক মুভির গণমুখী যাত্রা শুরু। ১৯২৬ সালে তুর্কি বীর কামাল আতাতুর্কের সরকারের অর্থায়নে নির্মিত মুভিতে মুহাম্মদ (সা.)-কে উপস্থাপন করা হয়। অভিনেতা ইউসুফ ওয়াহবী মিসরে প্রদর্শনের চেষ্টা করলে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের তোপের মুখে পড়ে। এর বহু বছর পরে ১৯৭৬ সালে আমেরিকায় মুক্তি পায় এ-যাবতকালের সবচেয়ে সফল ইসলাম রিলেটেড মুভি ‘দ্য মেসেজ’। মোস্তফা আক্কাদ পরিচালিত এই ছবির প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হলে বিশ্বে প্রবল আলোড়ন তৈরি হয়। এই ছবির স্ক্রিপ্টে কাজ করেছেন মিসরের বিখ্যাত লেখক তাওফিক আল হাকিম ও জাওদাত আল সাহহারের মতো ব্যক্তিত্ব। একই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ইরানি পরিচালক মাজিদ মাজিদির পরিচালিত ‘মুহাম্মদ : মেসেঞ্জার অব গড’ মুক্তি পেয়ে খ্যাতির চূড়ায় উঠে যায়।

 

ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র : মধ্যযুগ পরবর্তীকালের মুসলিম সেনাপতিদের ইতিহাস নিয়েও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদের ওপর তুরস্ক নির্মাণ করেছে ‘কনকোয়েস্ট দ্য ফাতিহ’ বা ‘ফেতিহ ১৪৫৩’। এই তালিকার একটি বিখ্যাত মুভি হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালির বিরুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী লিবিয়ার আদিবাসী বেদুঈন নেতা ওমর আল মুখতারের জীবনীনির্ভর ছবি ‘লায়ন অব দ্য ডেজার্ট’ (১৯৮০)। মশহুর চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনার কর্মকাণ্ডের ওপর জার্মান নির্মিত একটি মুভি হলো ‘দ্য ফিজিশিয়ান’ (২০১৩)। নোবেলজয়ী লেখক নাগিব মাহফুজের রচনায় এবং ইউসুফ চাহাইন পরিচালিত ‘সালাদিন দ্য ভিক্টোরিয়াস’ (১৯৬৩) এবং একই প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘কিংডম অব হেভেন’ (২০০৫) এই তালিকার সেরা আরো দুটি চলচ্চিত্র। এছাড়া মাজিদ মাজিদির পরিচালিত ‘চিলড্রেন অব হেভেন’ (১৯৯৭), ইবনে বতুতার ভ্রমণনির্ভর ‘জার্নি টু মেক্কা’ (২০০৯), আফগান কিশোরের গল্প ‘কাইট রানার’ (২০০৭) ইত্যাদি বেশ শক্তিশালী চলচ্চিত্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আরো বহু আন্তর্জাতিকমানের চমৎকার শর্ট ফিল্মেও ইসলামের বিভিন্ন দিক-দর্শন তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। যেমন-রোড টু প্যারাডাইস (২০১৬), জাজমেন্ট (২০১৬) ইত্যাদি।

 

অ্যানিমেটেড ফিল্ম : বর্তমানে অ্যানিমেশনের চাহিদা ব্যাপক। এই ক্যাটাগরির একটি সেরামানের চলচ্চিত্র হলো-‘বিলাল : আ নিউ ব্রিড অব হিরো’। ২০১৬ সালে সর্ববৃহৎ ফিল্ম ফেস্টিভাল কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘বেস্ট ইনস্পায়ারিং মুভি’ অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীকে নিয়েও ‘সালাদিন’ (২০০৪) শিরোনামে ২৬ মিনিট দীর্ঘ অ্যানিমেটেড টিভি সিরিজ প্রচারিত হয়েছে মালয়েশিয়াতে। একই বছর আমেরিকান পরিচালক রিচার্ড রিচ পরিচালনা করেন ‘মুহাম্মদ : দ্য লাস্ট প্রফেট’। প্রখ্যাত ইসলামী স্কলার সাইদ নুরসির (১৮৭০-১৯৬০) পরিচালনায় তুরস্ক নির্মাণ করেছে ‘বারলা’ (২০১১) নামে একটি অসাধারণ অ্যানিমেটেড-বায়োগ্রাফিক্যাল মুভি। এ ছাড়া মিসরে নির্মিত গুণী পরিচালক ‘দারবিশ পাসিন’ তৈরি করেছেন ‘দ্য বয় অ্যান্ড দ্য কিং’ (১৯৯২) নামে চমৎকার শিশুতোষ অ্যানিমেশন মুভি।

 

টিভি সিরিজ : টিভি সিরিজ হিসেবে কাতারের এমবিসি টেলিভিশন প্রচারিত ‘ওমর’ (২০১২) সিরিজকে সবচেয়ে উপরে স্থান দিতে হবে। আধুনিক সময়ে খ্যাতিমান ইসলামিক স্কলার ইউসুফ আলকারজাভি ও সালমান আওদা এই টিভি সিরিজকে অনুমোদন করেছেন। একই পরিচালকের ‘সালাহুদ্দীন আইয়ুবি’ (২০০১) নামেও মিসরে ৩০ পর্বের একটি টিভি সিরিজ প্রচারিত হয়েছে। এরপরই দ্বিতীয় স্থানে আছে ইরানি পরিচালক দাউদ মিরবাগেরি রচিত ও পরিচালিত ‘মুখতারনামা’ (২০০৯)। মুহাম্মদ শায়েখ নাজিব পরিচালিত ‘কামার বানী হাশিম’ (২০১০) বা ‘মুহাম্মদ দ্য ফাইনাল লিগ্যাসি’ নামের ৩০ পর্বের তুর্কি ফিল্মটিও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এ ছাড়াও ইরানি টিভি সিরিজ ‘ইউসুফ পায়াম্বার’ (২০০৮) টিভি সিরিজও বিভিন্ন মুসলিম দেশে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

 

ডকুমেন্টারি ফিল্ম : ইরাকি বংশোদ্ভূত আনিসা মেহদি নির্মিত ন্যাশনাল জিওগ্রাফি তথ্যচিত্র ‘ইনসাইড মেক্কা’ (২০০৩) এই তালিকায় সেরা। নারীদের মসজিদে নামাজকে কেন্দ্র করে কানাডিয়ান নারী জারকা নাওয়াজ (১৯৫৯) নির্মিত তথ্যচিত্র ‘মি অ্যান্ড মস্ক’ (২০০৫) বেশ সাড়া জাগিয়েছে। ২০০০ সালে নির্মিত ‘ইসলাম : অ্যাম্পায়ার অব ফেইথ’ হলো আরেকটি প্রামাণ্য ধারাবাহিক তথ্যচিত্র, যাতে নবী মুহাম্মদ (সা.) থেকে শুরু করে উসমানীয় সাম্রাজ্য পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাস দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া বিবিসি প্রচারিত তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘লাইফ অব মুহাম্মদ’ (সা.) নবী-জীবনের বিভিন্ন বিতর্ক-আরোপিত অধ্যায় নিয়ে নির্মাণ করেছেন তরুণ সাংবাদিক রাগেহ ওমর, যার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন জনপ্রিয় লেখক জিয়াউদ্দিন সরদার।

 

লেখক : রিসার্চ ফেলো, মাহির’স কুরআনিক রিসার্চ সেন্টার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads