• রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা

ইসলামে শ্রমের মর্যাদা

সংগৃহীত ছবি

ধর্ম

ইসলামে শ্রমের মর্যাদা

  • সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন
  • প্রকাশিত ১৫ মার্চ ২০১৯

শ্রম আমাদের জীবনে এক অপরিহার্য বিষয়। মহান মাবুদের অফুরন্ত নেয়ামতকে মানুষের ব্যবহার উপযোগী করার পেছনে শ্রমের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। শ্রমিকের শ্রম না থাকলে কালের চাকা থেমে যেত, সভ্যতা থমকে দাঁড়াত, পৃথিবী তার বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলত। এ জন্য শ্রমিকদের বলা হয় সভ্যতার কারিগর। শ্রমিকদের ওপর একটি দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি বহুলাংশে নির্ভরশীল। অথচ এরা সবক্ষেত্রেই অবহেলিত ও নির্যাতিত!

রসুল (সা.) শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষকে অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। কারণ যারা সৃষ্টির কল্যাণের জন্য নিজেদের তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়, তারা আল্লাহর কাছেও মর্যাদার অধিকারী। রসুল (সা.) বলেন, ‘এর চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই, যা মানুষ স্বহস্তে উপার্জনের মাধ্যমে করে।’ হজরত আদম (আ.) কৃষক ছিলেন। হজরত নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। হজরত দাউদ (আ.) কর্মকার ছিলেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) দর্জি ছিলেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) রাজমিস্ত্রি ছিলেন। হজরত ইসমাঈল (আ.) রাজমিস্ত্রির জোগাড়ি ছিলেন। হজরত মুসা (আ.) ছাগলের রাখাল ছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) ছাগল চড়িয়েছেন।

ইসলাম শ্রমকে যেমন মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছে, তেমনি শ্রমিকের অধিকার আদায়ের ব্যাপারেও ইসলামে রয়েছে অপরিসীম গুরুত্ব। রসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের অধীন ব্যক্তিদের আপন সন্তানদের মতো স্নেহ-সমীহ কর। আর নিজেরা যা খাও তাদেরও তা-ই খাওয়াও।’ শ্রমিকের মজুরি যথাযথ আদায় না করার পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ভয়াবহ কেয়ামতের দিন আমার মমতাময়ী আশ্রয় থেকে সেই ব্যক্তি বঞ্চিত হবে যে কোনো শ্রমিককে নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়ার চুক্তিতে নিয়োগ করে, তারপর তার কাছ থেকে পূর্ণ শ্রম ও কাজ আদায় করে নেয়; কিন্তু তাকে (পূর্ণ) পারিশ্রমিক দেয় না।’

শ্রমজীবী মানুষকে রসুল (সা.) মালিক-পুঁজিপতিদের ভাই বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাই সমাজে সে ততটুকু পদমর্যাদা ও সম্মান পাবে, যা সমাজের অন্য সদস্যরা পেয়ে থাকে। পেশার কারণে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা যাবে না। শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি প্রত্যেক শ্রমিকের প্রয়োজন ও কর্মানুসারে নির্ধারিত হবে। আর শ্রমিককে কমপক্ষে এমন মজুরি দিতে হবে, যাতে সে এর দ্বারা তার ন্যায়ানুগ ও দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। শ্রমে নিযুক্ত প্রতিটি শ্রমিকেরই ন্যায্য মজুরি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এ অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। শ্রমিকের ন্যায্য প্রাপ্য মজুরি পরিশোধের বিষয়ে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’ (ইবনে মাজাহ)

প্রকৃত অর্থে, শ্রমিক তার ঘাম শুকানোর আগে শ্রমের বিনিময় পাবে— এটাই ইসলামের শিক্ষা। শ্রমের বিনিময় দিতে কোনো ধরনের গড়িমসি করা চলবে না। শ্রমের যথাযথ মূল্য না দেওয়া একটি জুলুম। জুলুম ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্য অপরাধ। নবী করিম (সা.) শ্রমিকদের প্রতি মালিকের কর্তব্য ও শ্রমজীবীদের যেসব অধিকার নির্ধারণ করেছেন, সেসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এই যে, তাকে শুধু পরিপূর্ণ মজুরি প্রদান করা যথেষ্ট নয়, বরং যতটা সম্ভব ত্বরিত মজুরি পরিশোধের কথাও বলা হয়েছে।

ইসলামী বিধান অনুযায়ী মালিক স্বকীয় শক্তিবলে শ্রমিকের ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপাতে পারবেন না। পাশাপাশি শ্রমিকের কাজে অবকাশ বা ছুটি তথা বিশ্রাম পাওয়ার অধিকার আছে। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের সাধ্যাতীত কোনো কাজ করার দায়িত্ব চাপিয়ে দেননি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে’ (সুরা ইনিশরাহ : ৫)। অন্যদিকে মজুরি না দেওয়া বা কাজ অনুপাতে মজুরি কম দেওয়াও ইসলামে নিষিদ্ধ। রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তিন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ কিয়ামতের দিন অসন্তুষ্ট হবেন। তাদের একজন হচ্ছে, যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিক নিযুক্ত করে তার দ্বারা পূর্ণ কাজ করিয়ে নেওয়ার পর তার ন্যায্য মজুরি দেয়নি’ (বুখারি, মিশকাত হা/২৯৮৪)।

একজন শ্রমিক ইচ্ছা করলে মালিকের সঙ্গে মূলধনেও শরিক হতে পারবে। রসুলুল্লাহ (সা.) শ্রমিককে মজুরি দান করার পরও তাকে লাভের অংশ দেওয়ার জন্য উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘কর্মচারীদের তাদের কাজের লভ্যাংশ দাও। কেননা আল্লাহর শ্রমিকদের বঞ্চিত করা যায় না’ (মুসনাদে আহমদ)। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে চলছে বিরোধ ও সংঘাত। মালিক শ্রেণি চায় কীভাবে শ্রমিকদের দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে কম পারিশ্রমিক দেওয়া যায়। পক্ষান্তরে শ্রমিকরা চায় ঠিকমতো কাজ না করেই পূর্ণ মজুরি আদায় করে নিতে। কিন্তু ইসলাম এ দুই শ্রেণির মধ্যকার সম্পর্কের উন্নয়নে সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। মালিকপক্ষকে বলা হয়েছে, শ্রমজীবী মানুষ তোমাদের ভাই, সুতরাং তোমরা তাদের সঙ্গে ভাইসুলভ আচরণ কর। আর শ্রমিকদের তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ঠিকমতো পালন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এতে উভয়ের মধ্যে সুমধুর সম্পর্ক বিরাজ করবে। এ জন্য শ্রমিকদের অধিকার স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সম্মিলিতভাবে ইসলামী শ্রমনীতি তথা নবীজির (সা.) আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। আর আদর্শ অনুসরণকারীরা কখনো শ্রমিকের প্রতি জুলুম করে না; তাদের ঠকায় না। মনে রাখা চাই, কৌশল আর কূটকৌশল এক নয়। মহান মাবুদ সর্বদর্শী ও সর্বজান্তা।

 

লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads