• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫
ads
ঈদ উৎসবের আনন্দ হোক সবার

ছবি : সংগৃহীত

ধর্ম

ঈদ উৎসবের আনন্দ হোক সবার

  • সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন
  • প্রকাশিত ৩১ মে ২০১৯

ঈদ মানে খুশি, আনন্দ। দীর্ঘ এক মাসের সংযম সাধনার রোজা পালনের পর সারা বিশ্বের মুসলমানরা ঈদের দিন আনন্দে মেতে ওঠে। এদিন সকালে ঈদের নামাজ আদায় করে মুসলিমরা। এরপর শুরু হয় ঈদের কোলাকুলি এবং হাত মেলানো। তারপর মিষ্টিমুখ। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নতুন কাপড় পরে প্রজাপতির মতো এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে। অবশ্য গরিব অসহায়দের চিত্রটা ভিন্ন! 

ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বড় দৈহিক ইবাদত জামাতের সাথে দুই রাকাত ঈদের নামাজ এবং আর্থিক ইবাদত ফিতরা আদায় করা। নতুন কাপড় পরিধান করা, উপহার বিনিময়, মজাদার খাবার পরিবেশন ইত্যাদি এর আনুষঙ্গিক উপাদান। বলতে হয়, মুসলমানদের ঈদ উৎসবের মধ্যে ইবাদত, দান-খয়রাত, সামাজিকতা, আনন্দ-উৎসব ইত্যাদির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। বিশেষ করে রমজানের ঈদের সঙ্গে সাদাকাতুল ফিতরার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ঈদের নামাজ পড়ার আগে প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমান তার পরিবারের সব সদস্যের পক্ষে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গরিবদের প্রদান করেন, এর নাম ফিতরা। ফিতরার হকদার নিম্নবিত্তের মানুষ। ঈদের আনন্দে নিম্নবিত্তদের শরিক করার জন্যে ফিতরা আদায় করা হয়। এভাবে ধর্মীয় ইবাদতের সাথে ইহলৌকিক কাজের চমৎকার সমন্বয় সাধিত হয়েছে। একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক জীবনে এর ভূমিকা অপরিসীম। মহানবী (সা.)-এর যুগে খেজুর, কিশমিশ, জব, পনির ইত্যাদি দিয়ে সাদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো। ফিতরা দিয়ে গরিবরা ঈদ উদযাপন করে।

ফিতরা ছাড়াও এ দিনে ধনীদের উচিত গরিবদের মাঝে তাদের সম্পদের কিছুটা বিলিয়ে দেওয়া। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের এমনিতেই নাভিশ্বাস অবস্থা। আর গরিবদের কথা চিন্তারও বাইরে। রোজার মাসে তারা প্রয়োজনীয় খাবারই পায় না, আর ঈদ তো তাদের জন্য সোনার হরিণ! ধনীরা কেন জানি ভুলতে বসে— মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পৃথিবীর ধনী-দরিদ্র সব মানুষকে এক মাটি দিয়েই তৈরি করেছেন। তাই দরিদ্রদেরও উৎসব করার, আনন্দ করার অধিকার রয়েছে। অথচ ভাবতে অবাক লাগে, এক মাটি দিয়ে গড়া মানুষ এ পৃথিবীতে সমান অধিকার থেকে বঞ্চিত! এক পাশে খুশিতে আত্মহারা একদল মানুষ। কী নেই তাদের! ধনদৌলত, টাকা-পয়সা! তাই যতটুকু রোজা রাখতে ব্যস্ত না; তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে ঈদ কীভাবে এনজয় করবে সেই চিন্তায়। অন্যদিকে, গরিব অসহায় মানুষ অভুক্ত থেকে রোজা পালন করে। আর ঈদের দিন পোশাক তো দূরের কথা, তাদের অনেকের ঘরে চুলা পর্যন্ত জ্বলে না। বাধ্য হয়ে তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেদিনও কাজের সন্ধানে বের হয়। আর এসব মুটে-মজুর, ভিক্ষুকের সন্তান ঈদের দিনে চেয়ে দেখে বিত্তবানের ছেলে-মেয়ের সকাল দুপুর সন্ধ্যার ঝলমলে পোশাক। এটাই যেন তাদের কাছে ঈদের বিনোদন হয়ে পড়ে!

আমাদের মহানবী (সা.)-এর জীবনে ঈদ নিয়ে একটি ঘটনা রয়েছে, যা প্রায় সবারই জানা। এক ঈদের দিন মদিনার সবার মনে আনন্দ। তারা সবাই হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পেছনে নামাজ পড়ার জন্য যাচ্ছেন। সবাই নতুন জামা-কাপড় পরে আনন্দ প্রকাশ করতে করতে পথ চলছে। আর ছোট ছেলেরা এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে হৈ-হুল্লোড় করছে। এমন সময় পথের পাশে দাঁড়িয়ে একটি ছেলে কাঁদছিল, গায়ে তার ছেঁড়া জামা। নবীজি (সা.) তা দেখতে পেলেন এবং তৎক্ষণাৎ তার কাছে ছুটে গেলেন। ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি কান্নার কারণ জানতে চাইলেন। ছেলেটি বলল, তার বাবা-মা কেউ নেই। সে এতিম। তাই সে আজ ঈদের আনন্দ করতে পারছে না। নবীজি (সা.) ছেলেটির কথা শুনে কেঁদে ফেললেন। তিনি ছেলেটিকে বাসায় নিয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে ঈদগাহে নিয়ে গেলেন। ছেলেটির বাঁধনহারা আনন্দে নবীজি (সা.) পরম তৃপ্তি পেলেন। নবীজি (সা.)-এর এই শিক্ষা আমরা গ্রহণ না করে বরং ঈদের দিনে সীমাহীন আনন্দের জোয়ারে ভুলে যাই। তাই আমাদের সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ঈদের দিনে একটু ভালো খাওয়ার আশায় তারা ধনীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। কখনো কিছু পায়, আবার কখনো লাথি চড় খেয়ে ফিরে আসে।

আজ যদি নবীজি (সা.) বেঁচে থাকতেন, বর্তমান শিশুদের অবস্থা দেখতেন তাহলে কী হতো জানি না। এভাবে আমরা যদি প্রিয় নবী (সা.)-এর পথকে অনুসরণ করতাম তাহলে আমাদের দেশের প্রত্যেক গরিব, দুঃখী, অভাবী মানুষ নির্বিঘ্নে, শান্তিতে, পরম আনন্দে ঈদ উপলব্ধি করতে পারত নিশ্চয়ই। ঈদের দিন বিত্তবানরা যদি অন্তত একটি করে অভাবী ছেলে-মেয়েকে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ করে দেন, তাহলে সত্যিই আর কেউ ঈদ থেকে বঞ্চিত হতে পারবে না। তাদের তো প্রয়োজন মাত্র ১৫০-২০০ টাকার মধ্যে একটি নতুন জামা। যেখানে বিত্তবানদের ছেলে-মেয়েরা ৪-৫টি জামা কিনে থাকে, আর এসব জামার প্রতিটির মূল্য কয়েক হাজার টাকা!

বলতে চাচ্ছি, চার পাশে আমরা কী দেখছি? ত্যাগ ছেড়ে, আত্মশুদ্ধির পথ ছেড়ে বস্তুমোহে, বিলাসী জীবনে গা ভাসিয়ে দেওয়ার মহোৎসব কেন চলবে রোজা-ঈদ মৌসুমে। শক্তিমান-বিত্তবানদের দাপটে-উপহাসে গরিব মানুষগুলোর চোখে-মুখে কেন হাসি থাকবে না? তবে কি ধর্মের শিক্ষা ভুলে এদের আনন্দ-খুশি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে? লাখ দেড় লাখ টাকা দামের হাজারো লেহেঙ্গা এই ঈদে ধনীরা প্রতিদিনই হজম করে নিচ্ছে, ঈদকে বিলাস জীবনের অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে ধরে নিয়ে বাহারি পণ্য ক্রয়ের উৎসবে ধনীরা মেতে থাকছে মাসজুড়ে। অথচ তার আশপাশের শত শত গরিব অভাবী মানুষ নিজ স্ত্রীর জন্য মাত্র ৩০০ টাকা দামের একটি শাড়ি, নিজের জন্য একটি সাধারণ লুঙ্গি, বাচ্চাদের জন্য কম দামের প্যান্ট-শার্ট কেনার সামর্থ্য রাখে না।

প্রসঙ্গত, ঈদ এলেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা ফুটপাতে দোকান সাজিয়ে বসে। তাতে থাকে কম দামের জামা-কাপড়, শাড়ি-চুড়ি। হাল ফ্যাশনের জামার গরিবী সংস্করণ। অথচ এসব কেনারও টাকা থাকে না গার্মেন্ট শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, তরকারি ফেরিওয়ালা, মাছওয়ালা, গৃহকর্মী এবং স্বল্পআয়ের বা অনিয়মিত আয়ের লোকদের। বলা যায়, লাখ টাকার বাজেট নিয়ে ঈদের আনন্দের সবটুকুই ধনীরা লুফে নেয়। অন্যদিকে গরিব মানুষেরা এই ঈদে জনপ্রতি একটি নিম্নমানের পোশাকও কিনতে পারে না। দারিদ্র্যের সীমাহীন কশাঘাতে ওরা জর্জরিত। ওরা বিপন্ন। ওরা অধিকারহারা। তবু এই অভাবী দুস্থ মানুষের দিকে ধনীদের সহানুভূতির দৃষ্টি পড়ে না। নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা, ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকার নামই কি রোজার সংযম, ঈদের চেতনা ও শিক্ষা? না, কখনো তা হতে পারে না। অথচ এই ধনীরা যে কোনো একটি গরিব পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করলে তারা উঠে দাঁড়াতে পারে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজে পেট পুরে খায়, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধায় কাতর থাকে সে তো আমার উম্মতের দলভুক্ত নয়।’ হাদিসটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে— একজন সচ্ছল ব্যক্তিকে তার প্রতিবেশীর প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিবেশী সে মুসলিম বা অন্য ধর্মাবলম্বী যেই হোক না কেন। বলা হয়েছে প্রতিবেশীর কথা। প্রতিবেশী সে যে ধর্মের, গোত্রেরই অন্তর্ভুক্ত হোক তার দুর্দশায়-দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন নবীজি (সা.)। ইসলামের শিক্ষা যখন এই, তাহলে যে বিত্তবান মানুষটি লাখ টাকা দামের লেহেঙ্গা কিনে কৃত্রিমভাবে ঈদের আনন্দের ষোলোকলা পূর্ণ করছে, তার পাশের দরিদ্র পরিবার অভাবে-কষ্টে ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারছে না— ওই পরিবারটির দিকে চোখ মেলে তাকানো বা সহানুভূতি-সহমর্মিতা দেখানো খুব জরুরি নয় কি? দেশ ও সমাজের সবাইকে হাশি-খুশিতে রাখাই তো বিত্তবান, সমাজপতি ও সরকারের নৈতিক-ধর্মীয় দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে বলতে হচ্ছে, খলিফাতুর রসুল হজরত ওমর (রা.) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘শুধু কোনো মানুষ নয়, আমার শাসনের আওতাভুক্ত ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মরে তাহলে আমি ওমরকে আল্লাহর কাছে দায়িত্বে গাফিলতির জন্য জবাবদিহি করতে হবে। এর জন্য আমি ওমরই দায়ী থাকব।’ এই হচ্ছে ইসলামী জীবন দর্শন।

নিজেকে মুসলমান দাবি করলে অবশ্যই ইসলামী জীবন দর্শন মেনে চলা উচিত। বিশেষ করে গরিব অসহায়দের প্রতি সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তশালীদের সাহায্য ও সহানুভূতির হাত সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। কারণ নিঃস্বার্থভাবে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য ও সেবা করাই যে মানবধর্ম। এ মহৎ ও পুণ্যময় কাজই সর্বোত্তম ইবাদত। অসহায় মানুষের দুর্দিনে সাহায্য, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মনমানসিকতা যাদের নেই, তাদের ইবাদত-বন্দেগি আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। সুতরাং নামাজ, রোজার সঙ্গে কল্যাণের তথা মানবিকতা ও নৈতিকতার গুণাবলি অর্জন করাও জরুরি। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, সব কিতাব এবং নবীদের প্রতি ঈমান আনয়ন করলে এবং আল্লাহ-প্রেমে আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন, পর্যটক, সাহায্যপ্রার্থীদের এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করলে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করলে ও জাকাত প্রদান করলে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ করলে, অর্থসংকটে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করলে। এরাই তারা, যারা সত্যপরায়ণ এবং তারাই মুত্তাকি।’ (সুরা আল বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

হাদিস শরিফে আছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়ায় মানুষকে খাদ্য দান করেছে, সেদিন (রোজ কিয়ামতের দিন) তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, তাকে সেদিন পানি পান করিয়ে তার পিপাসা দূর করা হবে। যে মানুষকে বস্ত্র দান করেছে, তাকে সেদিন বস্ত্র পরিধান করিয়ে তার লজ্জা নিবারণ করা হবে।’ তাই ঈদকে কেন্দ্র করে সমাজের বিত্তশালী ও সামাজিক স্বেচ্ছাসেবামূলক সংস্থাগুলো ইচ্ছা করলে নিজ নিজ এলাকার অসহায় গরিব-দুঃখীদের মধ্যে অর্থ, খাদ্য ও পোশাক বিতরণ করতে পারেন। আর এমনটি করা হলে ইবাদতের পাশাপশি সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দয়ামায়া, অকৃত্রিম ভালোবাসা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি বজায় রাখা সম্ভব।

 

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads