• মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
প্রেমের হেরা গুহা ও ধ্যানের গোপন কথা

ফাইল ছবি

ধর্ম

প্রেমের হেরা গুহা ও ধ্যানের গোপন কথা

  • সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন
  • প্রকাশিত ২৩ আগস্ট ২০১৯

মক্কার হেরা পর্বত হচ্ছে মহানবী (সা.) প্রচারিত ইসলামের প্রথম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই হেরার যে গুহায় তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ লাভের দৃশ্যমান সূচনা— তার নাম গারে হেরা। অলৌকিক ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা এই লৌকিক শিক্ষায়তনে আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে তিনি (সা.) সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এখানে আমরা তাঁকে (সা.) দেখতে পাই সর্বশক্তিমান প্রশিক্ষকের একনিষ্ঠ প্রশিক্ষণার্থী ও অনুসন্ধানী গবেষক হিসেবে। তাঁর (সা.) প্রশিক্ষক স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। জানা যায়, আল্লাহর অদৃশ্য ইশারায় তিনি (সা.) প্রতিবছর এখানে মাসখানেক গভীর ধ্যান ও গবেষণায় নিয়োজিত থাকতেন।

মক্কার উত্তর দিকে মসজিদুল হারাম থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত হেরা পর্বত। ভূমি থেকে ২০০ মিটার উঁচু এটি একটি খাড়া পাহাড়। আধাঘণ্টা সময়ে নিচ থেকে হেঁটে চূড়ায় পৌঁছা যায়। পাহাড়ের ঠিক যে স্থানে গুহা অবস্থিত, নিচ থেকে সোজাসুজি সে স্থানে ওঠা যায় না; সে স্থানে উঠতে হয় ভিন্নদিক থেকে। চূড়া থেকে কিছুটা নিম্নমুখী ৫০ মিটার দূরত্বে এই গুহার অবস্থান। পাহাড়ে ওঠানামা ও গুহায় আরোহণের জন্য কোনো সিঁড়ির ব্যবস্থা নেই। পাহাড়ের গায়ে চড়েই গুহায় যাতায়াত করতে হয়।

গুহার উচ্চতা ৫ থেকে ৬ ফুট, দৈর্ঘ্য ১২ ফুট এবং প্রস্থ পৌনে দুই গজ। এর নিচ দিক অগভীর। এতে একসঙ্গে পাঁচজন লোক বসতে পারে। নিঝুম গবেষণা, একনিষ্ঠ ধ্যান ও নির্জনতা অবলম্বনের যথার্থ পরিবেশ বিরাজমান ছিল এ গারে হেরায়। তাঁর (সা.) বয়স চল্লিশে পৌঁছার অনেক আগে থেকেই তিনি (সা.) এখানে নির্দিষ্ট মেয়াদে সময় কাটাতে থাকেন। বয়ঃপ্রাপ্তি বা বিয়ের পর থেকে প্রতিবছরই তিনি (সা.) রমজানের একমাস এখানে নির্জনবাস করতেন। জাহিলি যুগে এ ধরনের নির্জনবাস কোরায়েশরাও করতেন।

গুহায় অবস্থানকালে মহানবী (সা.) তাঁর আহূত এবং তাঁর (সা.) কাছে আগত অসহায় লোকদের খাবার খাওয়াতেন। তখন সঙ্গে থাকতেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা.); যিনি তাঁর (সা.) গুহার নিকটবর্তী কোথাও অবস্থান করতেন বা প্রয়োজনে বাড়ি ফিরে আসতেন। তাঁর (সা.) ৪০ বছর বয়সে ওহি নাজিলকাল পর্যন্ত তাঁর এ কর্মসাধনা একাধারে অব্যাহত ছিল। জানা যায়, প্রথম ওহি লাভ করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাড়িতে চলে আসেন। এরপর ফের তিনি (সা.) গারে হেরায় গমন করে এক মাসের নির্ধারিত অবশিষ্ট মেয়াদ পূর্ণ করেন (সিরাত ইবনে ইসহাক, পৃ. ৩৯)। এরপর আর তিনি (সা.) গারে হেরায় যাননি।

একথা সত্য যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রকৃত শিক্ষক আল্লাহ। কিন্তু শরিয়তে যিনি তাঁকে (সা.) প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহর শিক্ষা গারে হেরায় প্রদান করেছেন, তিনি জিবরাঈল (আ.)। এ কারণে জিবরাঈল (আ.)-কে তাঁর (সা.) শিক্ষক হিসেবে অভিহিত করা হয়। কোরআনে এসেছে, ‘তাঁকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী প্রজ্ঞাময় (ফেরেশতা)। সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল, তখন সে ঊর্ধ্ব দিগন্তে। এরপর সে তার নিকটবর্তী হলো, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা এরও কম। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার তা প্রত্যাদেশ করলেন। যা সে দেখেছে, তার অন্তঃকরণ তা অস্বীকার করেনি’ (সুরা নাজম : ৫-১১)।

ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আল্লাহর বান্দা ও রাসুল মোহাম্মদ (সা.) মানুষের কাছে যে ইলম নিয়ে এসেছেন, তা তাঁকে (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন এক শক্তিমান ফেরেশতা। তিনি জিবরাঈল (আ.)। তাঁদের উভয়ের অতিশয় নিকটবর্তী হওয়ার যে ব্যাপার এ আয়াতগুলোতে ব্যক্ত করা হয়েছে, তা অবশ্যই তাঁর প্রথম প্রত্যাদেশ লাভ করার সময় হেরা পর্বতে ঘটেছে, মিরাজকালে নয় (ইবনে কাসির : তাফসির : ৭খ. পৃ. : ৪৪৪)। মোহাম্মদ (সা.)-এর গারে হেরায় নির্জনবাস বিষয়ে কোরায়েশরা তাঁর সঙ্গে দুশমনি করেনি। কারণ তাঁর (সা.) পিতামহ আবদুল মুত্তালিবই সর্বপ্রথম এখানে নির্জনবাস করেছেন এবং তিনি এ প্রথার সূচনা করেছেন। বর্বরতার তিমির পরিবেশে কেউ পাপমুক্তি ও পরিশুদ্ধি অর্জন করতে চাইলে তার সংশোধনাগার ছিল এ গারে হেরা (ইবনে হাজার : ফাতহুল বারি : ১৯/৪৪৯)।

এবার আসি কিছুটা ভিন্ন কথায়। বলা যায়, ইসলামের শিক্ষাটাই মোরাকাবা বা ধ্যানভিত্তিক। কারণ আপনাকে যে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর মোরাকাবা করতেই হবে। মোরাকাবা দ্বারা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা যায়। আর পরিশুদ্ধ আত্মার মাধ্যমেই আল্লাহর দিদার এবং নামাজে মেরাজ লাভ সম্ভব। প্রকৃত অর্থে, যার আত্মা পরিশুদ্ধ হয় তার পক্ষে অনেক কিছুই জানা সম্ভব— হতে পারে সেটা স্বপ্নের মাধ্যমে, নতুবা এলহামের মাধ্যমে। আবার একথাও সত্য যে, যাদের অন্তর পবিত্র তারা খুব সহজেই ভালো-মন্দ উপলব্ধি করতে পারে। আর এ উপলব্ধিটা পরিশুদ্ধ অন্তর থেকেই আসে।

বিজ্ঞানও ইদানীং তুলে ধরছে ধ্যানে মানুষের মেধাশক্তি কীভাবে বৃদ্ধি পায়। অথচ এই ধ্যানের শিক্ষাটা মহানবীই (সা.) আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর আগে আমাদের শিখিয়ে গেছেন। যে শিক্ষার সত্যতা, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিজ্ঞানীরা এ যুগে এসেও অস্বীকার করতে পারছেন না। যে কারণে তারা অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন— হজরত মোহাম্মদ (সা.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। সেইসঙ্গে মহানবী (সা.)-এর আইনকেও তারা সম্মান করেন।

মোরাকাবা অর্থ ধ্যান, গভীর চিন্তা এবং জগতের সব ধর্মের নিগূঢ় ব্যবস্থাপত্র। আরো সহজে বলা যায়, সুফি বা সাধু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত বিশেষ এক তন্ময়তা বা সম্মোহিত অবস্থা। মহানবী (সা.) ১৫ বছর একাধারে হেরা গুহায় ধ্যান বা মোরাকাবা করেছেন। নবীজি (সা.) হেরাগুহায় ধ্যান করে আপন হূদয়কে আলোকিত করেছেন এবং সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হয়ে আল্লাহর দিদার লাভ করেছেন। রাসুল (সা.)-এর ফরমান, ‘আমার প্রভুকে আমি অতি উত্তম সুরতে দেখেছি’ (তাফসীরে রুহুল বয়ান)।

মোরাকাবার শিক্ষার বিষয়টি শরীয়তের চর্চার মধ্যে দেখা যায় না। এ শিক্ষা কেবল খাঁটি পীর বা আউলিয়ায়ে কেরামের মজলিসে প্রচলিত আছে। কারণ তরিকতে মোরাকাবা ছাড়া সাধনার স্তর অতিক্রম করার যে কোনো বিকল্প নেই। মোরাকাবা করলে হূদয়ের কালিমা বিদূরিত হয়ে হূদয় আলোকিত হয়। প্রসঙ্গত, একজন সাধক মোরাকাবার মাধ্যমে প্রতিদিন পাঁচ ধরনের ফয়েজ কলবে ধারণ করেন। প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তে আলাদাভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপন মোর্শেদের সিনা হয়ে এ ফয়েজ ওয়ারেদ হয়। যথা— ১. ফজরের ওয়াক্তে কুয়াতে এলাহীর ফয়েজ। এ ফায়েজ দ্বারা কলবের ৭০ হাজার পর্দার ভেতরের সব গুনাহর পাহাড় সাফ হয়। সাফ দিলে জিকিরের ফয়েজ পড়ে কলবে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জিকির জারি হয়। ২. জোহরের ওয়াক্তে হজরত রাসুল (সা.)-এর মহব্বতের ফয়েজ আসে। এতে নবীজির (সা.) মহব্বতে দিলে ভরপুর হয়। ৩. আছর ও মাগরিবের ওয়াক্তে তওবা কবুলিয়াতের ফয়েজ আসে। এ দিয়ে সব ধরনের গুনাহ মাফ হয়ে দিল পরিষ্কার হয়। ৪. এশার ওয়াক্তে আসে গাইরিয়াতের ফয়েজ। এর দ্বারা নফসের খারাপ কামনাসহ যাবতীয় অসত্য ও অসুন্দর ধ্বংস হয় এবং দিল সাফ হয়। ৫. আর রাতের শেষ তৃতীয়াংশে রহমতের ওয়াক্তের ফয়েজ মিলে। এর ফলে দিল আল্লাহর রহমতে ভরপুর হয়।

এভাবে বিভিন্ন ওয়াক্তের মোরাকাবায় দিলের মধ্যে ফয়েজ পড়ে দিল সাফ হয়। মোরাকাবার জন্য অতি উত্তম সময় হচ্ছে রাতের শেষ প্রহর, কারণ এ সময় যে রহমতের সময়। এ সময় প্রকৃতি থাকে নীরব, পরিবার-পরিজনও থাকেন ঘুমিয়ে। তাই সাধকরা এমন সময়টাই মোরাকাবার জন্য বেছে নেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ, এ সময় মহান মাবুদ বান্দার ডাকে অধিক সাড়া দেন। তিনি বান্দাকে অনুপ্রাণিত করতে থাকেন, তাঁঁক ডাকতে বলেন, তাঁর ইবাদত করে তাঁর নৈকট্যলাভের আহ্বান করেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, হে বান্দা! আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করব। আমার কাছে তোমার কী চাওয়া আছে—চাও, আমি তা দান করব। আমার কাছে তোমার জীবনের গুনাহর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা কর, আমি তোমার গুনাহ মাফ করে দেব’ (বুখারি : ৬৯৮৬)।

মোরাকাবা হলো নফল ইবাদত। আর নফল ইবাদত হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের উত্তম পন্থা। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহপাক এরশাদ করেন, ‘যখন আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি, এমতাবস্থায় আমি তার কর্ণ হই, যদ্দ্বারা সে শ্রবণ করে; আমি তার চক্ষু হই, যদ্দ্বারা সে দর্শন করে; আমি তার হাত হই, যদ্দ্বারা সে ধারণ করে; আমি তার পদযুগল হই, যদ্দ্বারা সে হেঁটে বেড়ায়। এমন অবস্থায় সে আমার কাছে যা কিছু চায় আমি সঙ্গে সঙ্গে তা দান করি’ (বুখারি : ৬০৫৮)। তার মানে, মোরাকাবা সাধকের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মোরাকাবার মাধ্যমে যার হূদয়ের কালিমা বিদূরিত হয়, তিনি নামাজে আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করেন। তাই প্রতি ওয়াক্ত নামাজ ও ইবাদত শেষে অন্তত পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও নিয়মিত মোরাকাবা করা উচিত। এতে সাধক ধীরে ধীরে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম হবেন।

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বর্ণনা করেন- আল্লাহ বলেছেন, ‘বান্দা যখন আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তখন তার দিকে একহাত পরিমাণ অগ্রসর হই। আর সে যখন আমার দিকে একহাত পরিমাণ অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দুই হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। আর বান্দা যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই’ (বুখারি : ৭০২৮)।

মোরাকাবা করার প্রথম শর্ত হলো দু’চোখ বন্ধ করে নেওয়া। অতঃপর তরিকতের ওজিফা মোতাবেক ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া। জাহেরি দু’চোখ বন্ধ করে নামাজের সুরাতে বসে নিজের খেয়াল কলবে ডুবিয়ে মোরাকাবা করতে হয়। মোরাকাবা করলে কলবের চোখ খুলে যায়। মনে রাখা চাই, ইবাদতে জাহেরি চোখ বন্ধ করলেই কেবল বাতেনি চোখ খোলে। তবে মোরাকাবা চর্চার শুরুতে চাই খাঁটি মোর্শেদের সাহচর্য। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। এরশাদ হয়েছে, ‘ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হয়ে যাও’ (সুরা তওবা : ১১৯)।

মানুষের দিল হচ্ছে মহাভেদ ও বাতেনের দরিয়া। একজন ডুবুরি যেমন গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে তলদেশ থেকে মণি-মাণিক্য তুলে আনেন, তেমনি মানুষও তার দিলের মধ্যে ডুবে জগতের সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন আবিষ্কার করতে পারেন। একথা সত্য যে, মারেফত ছাড়া বাতেনি পথের অনুসন্ধানী হওয়া যায় না। আর কোনো বিষয়ে অনুসন্ধানী হলে যেমন বিশাল অর্জন সম্ভব হয়, ঠিক তেমনি আল্লাহর পথের অনুসন্ধানী হলেও আল্লাহওয়ালা বা মুমেন হওয়া যায়। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য অনেকগুলো সাধনা রয়েছে, এসবের মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মোরাকাবা। মনে রাখবেন, মোরাকাবার মাধ্যমেই স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার ভেদ ও রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব।

মোরাকাবা বা ধ্যানের গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাতের আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। তারা দাঁড়িয়ে, বসে বা শায়িত অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ করে; তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হয় এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব নিরর্থক সৃষ্টি করনি’ (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৯০-১৯১)।

উক্ত আয়াতে থাকা ‘তাফাক্কুর’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে গভীর ধ্যান; ইংরেজিতে যাকে বলা হয় মেডিটেশন বা কনটেমপেশন। জীব-জগৎ ও মুক্তির পথ অনুসন্ধান লাভের জন্য এই গভীর মনোনিবেশ, এই আত্মনিমগ্নতার নির্দেশ আল্লাহপাক কোরআনের একাধিক জায়গায় দিয়েছেন। এমনকি মহানবী (সা.)-কে আল্লাহপাক বলেছেন, ‘অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদতে রত হও। আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ট হও’ (সুরা ইনশিরাহ : ৭-৮)।

ধ্যানের গুরুত্ব সম্পর্কে হজরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত এক হাদিসে উল্লেখ আছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘সৃষ্টি সম্পর্কে এক ঘণ্টার ধ্যান ৭০ বছর নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম (মেশকাত শরিফ)। হজরত ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, এক ঘণ্টার ধ্যান (তাফাক্কুর) সারা বছরের নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম (তাফসিরে হাক্কি : ১৩/৩২৪)।

[প্রিয় পাঠক, তাই বলে অন্যসব ইবাদত বাদ দিয়ে বসে থাকা যাবে না। কারণ, আপনার বা আমার ধ্যান কতটা সঠিক বা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে তা নিশ্চিত হওয়ার মতো যোগ্যতা আপনার বা আমার কতটা আছে? তাছাড়া নিজের চিন্তা ও বিচারের ভুলে একজীবনে একবার ঠকে গেলে সেই সময় আর ফিরে পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে বলে রাখছি— দরবেশ হওয়া আর দরবেশের রূপধারণ এক নয়। হাজার জনের মিথ্যা সাক্ষ্যে আমি দরবেশ হতে পারব না সত্য; তবে সর্বশক্তিমানের দয়া ও কামেল মুর্শিদের নির্দেশনার পাশাপাশি নিজের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সফল হওয়া সম্ভব। আল্লাহ সর্বদর্শী ও সর্বজ্ঞানী, তিনি যেন ক্ষমার পাশাপাশি আমাদের দয়া করেন।]

নবীজি (সা.)-এর ধ্যানচর্চা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ড. তারিক রামাদান তার ঞযব গবংংবহমবৎ : ঞযব গবধহরহম ড়ভ গড়যধসসধফ বইতে বলেছেন: ‘ঐব ফরফ হড়ঃ ফবসধহফ যরং পড়সঢ়ধহরড়হং যব ড়িৎংযরঢ় ভধংঃরহম ধহফ সবফরঃধঃরড়হ ঃযধঃ যব বীধপঃবফ ড়ভ যরসংবষভ.’ অর্থাৎ তিনি যেভাবে ইবাদত করতেন, রোজা রাখতেন এবং মেডিটেশন (ধ্যান) করতেন, তা তিনি তাঁর অনুসারীদের ওপর কঠোরভাবে চাপিয়ে দিতে চাননি। কারণ তিনি উম্মতদের বিষয়ে নরম ছিলেন।

যুগে যুগে মোরাকাবা বা ধ্যানের ধরন বা প্রক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। তবে ধ্যান হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে অস্থির কলব বা মনকে স্থির ও প্রশান্ত করানোর পর মনকে দিয়ে বড় কিছু করানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ধ্যান মনকে নফস বা প্রবৃত্তির শৃঙ্খলমুক্ত হতে সাহায্য করে এবং তাকওয়াবান হতে সহায়তা করে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, মানুষের শতকরা ৭৫ ভাগ রোগ হচ্ছে মনোদৈহিক বা সাইকোসোমাটিক। এসব রোগে মনের জট খুলতে পারলেই নিরাময় লাভ সম্ভব। এক্ষেত্রে বুখারি শরিফের একটি হাদিস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— মহানবী (সা.) বলেন, ‘শরীরের ভেতর একটি কলব বা মন আছে, তা ভালো থাকলে দেহ ভালো থাকে আর যখন তা খারাপ বা অসুস্থ হয়ে যায়, তখন সারা শরীর খারাপ বা অসুস্থ হয়ে যায় (বুখারি, মুসলিম)। অন্যত্র নবী করিম (সা.) বলেন, ‘একাগ্রচিত্ততা ছাড়া নামাজ আল্লাহ গ্রহণ করেন না’ (বায়হাকি শরিফ)। উক্ত হাদিসে একাগ্রচিত্ততার মাধ্যমেও গভীর মনোযোগ আর ধ্যানের বিষয়টিই উঠে এসেছে।

হজরত আলী (রা.) কতটা গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে নামাজ আদায় করতেন তা একটি ঘটনায় প্রমাণিত হয়। একসময় হজরত আলী (রা.)-এর পায়ে একটি তীর বিঁধলে তিনি প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। এ অবস্থায় কয়েকজন সাহাবি সেই তীর খুলতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তীরে হাত দিলেই আলী (রা.) ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন। করণীয় বিষয়ে জানতে তাঁরা রাসুল (সা.)-এর কাছে গেলে তিনি (সা.) বলেন, ‘আলী যখন নামাজে সেজদায় থাকবে তখন তীরটা খুলে নিও। কারণ নামাজে সে এত নিমগ্ন থাকবে যে, সে ব্যথা কিছুই টের পাবে না।’ পরে বাস্তবে তা-ই হলো। আলী (রা.) নামাজে দাঁড়ানোর পর সাহাবিরা তীর খুলে ফেললেন কিন্তু হজরত আলী (রা.) টেরই পেলেন না।

উপরিউক্ত আলোচনার পেক্ষিতে বলা যায়, মোরাকাবা বা ধ্যান হচ্ছে স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সাক্ষাৎ। তবে এক্ষেত্রে কিছু বিষয় অবশ্যই মনে রাখা চাই—

১. নির্জন স্থান : সমস্ত বাতি/লাইট বন্ধ করা এবং কক্ষ বা মোরাকাবায় বসার জন্য নির্ধারিত স্থানটি পবিত্র রাখা। যেমন, হুজুর (সা.) গারে হেরা বা হেরা গুহায় সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধ্যানমগ্ন ছিলেন।

২. বন্ধনমুক্ত করা : সার্বিক বন্ধনমুক্ত করা। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘হে মুসা! আমি তোমার রব, অতএব তুমি তোমার পাদুকা খুলে ফেলো। কেননা তুমি পবিত্র উপত্যকা তুয়ায় রয়েছ’ (সুরা  তোয়্বা-হা, আয়াত : ১১)।

৩. সংযোগ স্থাপন : অর্থাৎ রাবেতা-এ শায়খ। আদব, সাহস, বুদ্ধি ও মহব্বতের সঙ্গে বসা। চোখ-মুখ বন্ধ করে খেয়াল দিতে হবে কলবে।

হাজি এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) তাঁর ‘জিয়াউল কুলুব’ কিতাবে লেখেন, ‘মোরাকাবা বা ধ্যানের সময় যেসব নূর ডানে, বাঁয়ে, কখনো সামনে, মাথার দিকে পরিদৃষ্ট হয় তা শুভ অর্থাৎ ভালো নূর। বিশেষ কোনো রঙের নূর যদি ডান কাঁধ বরাবর সামনে পরিদৃষ্ট হয় তবে তা হবে ফেরেশতাগণের নূর। সাদা রঙের নূর হলে তা হবে কেরামান কাতেবিনের নূর। সবুজ পোশাক পরিহিত সুন্দর কোনো মানুষ বা অন্য কোনো ভালো চেহারায় যদি ওই নূর প্রকাশ পায়, তবে বুঝতে হবে তারা ফেরেশতা। ধ্যানকারীর হেফাজতের জন্য তাদের আগমন।

হে দয়াময়, আমাদের ক্ষমা ও দয়া করো।

 

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads