• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

ধর্ম

ঈমানের মৌলিক স্তম্ভগুলোর পরিচয়

  • প্রকাশিত ২৫ অক্টোবর ২০১৯

এস রোকাইয়া শশী

 

 

ঈমান এমন উত্তরাধিকারী সম্পদ নয় যে কারো বাপ-দাদারা ঈমানদার মুসলিম হলে সন্তান-সন্ততি ও বংশধররাও মুসলিমই থাকবে, চাই সে যতই ঈমানবিরোধী চিন্তা-বিশ্বাস ও কথায়-কর্মে জড়িত থাকুক। ঈমান অনেকগুলো আকিদা-বিশ্বাসের সমষ্টি। ঈমান ঠিক না করে জীবনভর নেক আমল করলেও আখেরাতে কোনো লাভ হবে না। জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে ছদ্মবেশে এসে রসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ঈমান কাকে বলে? জবাবে রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ঈমানের হাকিকত বা স্বরূপ হলো, তুমি বদ্ধমূলভাবে বিশ্বাস স্থাপন করবে আল্লাহতায়ালার প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, আসমানি কিতাবগুলোর প্রতি, আল্লাহর নবী-রসুলদের প্রতি, কেয়ামত দিবসের প্রতি এবং তকদিরের ভালো-মন্দ সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হওয়ার প্রতি।’ (বোখারি : ৫০)। উল্লিখিত হাদিসটি ‘ঈমানে মুফাসসাল’-এর ভিত্তি। ঈমানে মুফাসসালে ঘোষণা করা হয়, আমি ঈমান আনলাম— ১. আল্লাহতায়ালার প্রতি, ২. তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, ৩. তাঁর কিতাবগুলোর প্রতি, ৪. তাঁর নবী-রসুলদের প্রতি, ৫. কেয়ামত দিবসের প্রতি, ৬. ভালো-মন্দ তকদিরের প্রতি এবং ৭. মৃত্যুর পর কেয়ামতের দিন আবার জীবিত হওয়ার প্রতি।

 

১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস :

ঈমানের প্রথম এবং প্রধান স্তম্ভ হলো মহান আল্লাহর ওপর ঈমান তথা বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহর ওপর ঈমান আনার অর্থ এ কথা বিশ্বাস করা, আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় ও অতুলনীয়। তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাঁর কোনো কিছুর অভাব নেই। তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। একমাত্র তিনিই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা, বিধানদাতা। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। তিনিই একমাত্র ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। তিনি ছাড়া অন্য সবকিছুই ক্ষয়শীল ও ধ্বংসশীল, কিন্তু তাঁর ক্ষয়ও নেই, ধ্বংসও নেই। সবকিছুর ওপরই তাঁর ক্ষমতা চলে। কিন্তু তাঁর ওপর কারও ক্ষমতা চলে না।

 

২. ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস :

ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপনের অর্থ হলো, ফেরেশতাদের অস্তিত্ব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা। আল্লাহ তাদের যা আদেশ করেন তারা সঙ্গে সঙ্গে তা পালন করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বরং ফেরেশতারা তো আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তারা আগ বেড়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে।’ (সুরা আম্বিয়া : ২৬-২৭)।

 

৩. কিতাবগুলোর প্রতি বিশ্বাস :

আল্লাহতায়ালা মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য নবী-রসুলদের ওপর বিভিন্ন আসমানি কিতার নাজিল করেছেন। সেই কিতাবগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাও ঈমানের মৌলিক স্তম্ভ। আল্লাহতায়ালা এ কিতাবগুলোর মধ্যে যেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করেছেন সেগুলোর প্রতি বিস্তারিতভাবে ঈমান আনা। এ ধরনের কিতাবগুলো হচ্ছে— কোরআন, তাওরাত, জাবুর, ইঞ্জিল। আমাদের ঈমান আনার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, আল্লাহ যে কিতাব নাজিল করেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি।’ (সুরা শুরা : ১৫)।

 

৪. রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস :

আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে অনেক নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। সেই রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করাও ঈমানের মৌলিক স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত। দৃঢ়ভাবে এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক জাতির জন্য একজনকে রসুল হিসেবে পাঠিয়েছেন। যিনি তাদের এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর ইবাদতকে অস্বীকার করার দাওয়াত দেন। সব রাসুল সত্যবাদী, সত্যায়নকারী, পুণ্যবান, সঠিক পথের দিশারি, তাকওয়াবান ও বিশ্বস্ত। আল্লাহ তাঁদের যা কিছু দিয়ে পাঠিয়েছেন তারা তা পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। কোনো অংশ গোপন বা পরিবর্তন করেননি। নিজে থেকে কোনো সংযোজন বা বিয়োজন করেননি। আল্লাহ বলেন, রসুলদের দায়িত্ব তো শুধু সুস্পষ্ট বাণী পৌঁছে দেওয়া। (সুরা নাহল : ৩৫)। আরো ঈমান রাখতে হবে, সর্বশেষ রসুল হচ্ছেন আমাদের নবী  মোহাম্মদ (সা.)। তাঁর পর আর কোনো নবী নেই। আল্লাহ বলেন, ‘মোহাম্মদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির বাবা নন; বরং তিনি আল্লাহর রসুল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা আহজাব : ৪০)।

 

৫. পরকালে বিশ্বাস :

পরকাল বা শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাসও ঈমানের মৌলিক স্তম্ভের অন্তর্ভুক্ত। এ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে—

ক. পুনরুত্থানে বিশ্বাস : মৃত ব্যক্তিদের কবর থেকে আবার জীবিত করা হবে। সব মানুষ আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে। তাদের পোশাক ও জুতা এক জায়গায় একত্র করা হবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের এরপর মৃত্যুবরণ করতে হবে। তারপর নিশ্চয়ই তোমাদের কেয়ামতের দিন আবার উঠানো হবে।’ (সুরা মোমিনুন : ১৫-১৬)।

খ. হিসাব-নিকাশ ও মিজানে বিশ্বাস : সৃষ্টিজীব দুনিয়াতে যেসব কর্ম করেছে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সেসব কর্মের হিসাব নেবেন। যার বদ আমলের চেয়ে নেক আমলের পাল্লা ভারী হবে তিনি জান্নাতি হবেন। যার নেক আমলের চেয়ে বদ আমলের পাল্লা ভারি হবে সে জাহান্নামি হবে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যার ডান হাতে তার আমলনামা দেয়া হবে, অচিরেই তার হিসাব-নিকাশ সহজ করা হবে। বস্তুত সে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে যাবে। কিন্তু যার আমলনামা তার পিঠের পেছনের দিক থেকে দেওয়া হবে, সে অচিরেই মৃত্যুকে ডাকবে এবং সে উত্তপ্ত জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা ইনশিকাক : ৭-১২)।

গ. জান্নাত ও জাহান্নামে বিশ্বাস : জান্নাত হলো চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির স্থান। আল্লাহ মোমিনদের জন্য তা তৈরি করে রেখেছেন। আর জাহান্নাম চিরস্থায়ী দুঃখ-কষ্টের স্থান। আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের অবাধ্যদের জন্য আল্লাহ তা তৈরি করে রেখেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা ও জান্নাতের জন্য দ্রুত অগ্রসর হও। যার প্রশস্ততা হলো আসমান ও জমিন সমতুল্য, যা মোত্তাকিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৩)।

 

৬. তকদিরের প্রতি বিশ্বাস :

তকদিরে বিশ্বাস করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তকদির হচ্ছে আল্লাহর বিশ্বজনীন নিয়মনীতি। এ নিয়মনীতি ও ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার অধীনে বিশ্বজগৎ পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন— এ চেতনা লালন করা এবং তার বিধি ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট থাকার মধ্যেই শান্তি ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে। কোনো কল্যাণকর কিছু ঘটলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। আর অকল্যাণকর কিছু ঘটলে তওবা-এস্তেগফার এবং ধৈর্যধারণ করতে হবে। সেই সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য পাওয়ার ইচ্ছা প্রবল করতে হবে এবং তদনুযায়ী আমল বা চেষ্টা-তদবির করে যেতে হবে।

 

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads