• শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ধর্ম

আসহাবে কাহাফের সেই গুহা

  • সৈয়দ ফয়জুল আল আমীন
  • প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর ২০১৯

বর্তমান জর্দান অঞ্চল খ্রিস্টীয় ২৫০ সালের দিকে দাকিয়ানুস নামের এক রোমান মূর্তিপূজক শাসকের শাসনাধীন ছিল। অঞ্চলটির সব জনগণকে সে রোমান দেবতাদের পূজা করতে বাধ্য করেছিল। কেউ তার বিরোধিতা করলে, তাকে সে হত্যা করা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের মর্মন্তুদ শাস্তি প্রদান করত। বিশেষ করে হজরত ঈসা (আ.)-এর শিক্ষার প্রতি অনুরক্ত মানুষদের ক্ষেত্রে তার মনোভাব ছিল চরম হিংসাত্মক। হজরত ঈসা (আ.)-এর অনুসারী কাউকে পেলেই সে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করত।

এর মধ্যেই সেখানে বসবাসকারী অভিজাত রোমান পরিবারের কিছু যুবক হজরত ঈসা (আ.)-এর ওপর ঈমান আনে। দাকিয়ানুস বিষয়টি জেনে যায়। কিন্তু তারা অভিজাত রোমান হওয়ায় তাদের সরাসরি হত্যা করতে সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন সে তাদের ডেকে তাদের বিশ্বাস ত্যাগ করতে আদেশ দেয়। তারা তাদের বিশ্বাস ত্যাগ করতে না চাইলে সে তাদের হত্যা করার ঘোষণা দিয়ে বলে, হয় তাদেরকে তাদের বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে— না হয় তাদেরকে মৃত্যু বেছে নিতে হবে।

তাদেরকে সে এ বিষয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। তখন নিজেদের ঈমান ও জীবনকে বাঁচাতে সেই যুবকরা পালিয়ে এক পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে। একটি কুকুরও তাদের সঙ্গে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে। গুহায় আশ্রয় নেওয়ার পর তারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয় এবং তিন শতাধিক বছর আল্লাহ তাদের ঘুমের মধ্যেই রাখেন।

কোরআনে আল্লাহ তাদের সে সময়কার অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা ঘুমন্ত। আমি তাদের পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুর ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ১৮)

পরবর্তী সময়ে তারা ঘুম থেকে উঠে খাবার আনার জন্য গোপনে বাইরে একজনকে পাঠায়। বাইরে আসার পর সে আবিষ্কার করে, তার চারপাশের সবকিছু পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সে জানতে পারে, আগের মূর্তিপূজক শাসক বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেছে এবং বর্তমানে থিওডোসিস নামে খ্রিস্টান একজন শাসক অঞ্চলটি শাসন করছে। লোকেরা তাদের কথা জানতে পেরে তাদের কাছ থেকে দোয়া নেওয়ার জন্য দলে দলে আসতে থাকে। পরে তারা মৃত্যুবরণ করলে তাদের এই গুহার মধ্যেই দাফন করা হয়। জর্দানের রাজধানী আম্মানের কাছে আবু আলান্দা নামক স্থানে এই গুহাটি আজও অবস্থিত। বর্তমানে গুহাটি পরিদর্শনে আসে বহু মানুষ।

বাইবেল ও কোরআন উভয় ধর্মগ্রন্থেই এদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বাইবেলে তাদের ‘এফসুসের ঘুমন্ত ব্যক্তিরা’ (Sleepers of Ephesus) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অপরদিকে কোরআনে তাদের নিয়ে সম্পূর্ণ একটি সুরা অর্থাৎ সুরা কাহাফ অবতীর্ণ করা হয়েছে।

গুহাটির প্রবেশ পথের বামে একটি প্রাচীন জলপাই গাছ রয়েছে। আগে গুহাটির উপরে একটি গির্জা ছিল। বর্তমানে এখানে একটি মসজিদ অবস্থিত। গুহার ভেতরে ঘুমন্ত ব্যক্তিদের পাথরে বাঁধাই করা কবর রয়েছে। এছাড়া তাদের সঙ্গে আশ্রয় নেওয়া কুকুরটির অবশিষ্ট হাড়গুলো গুহাটির এক কোণে সংরক্ষিত আছে। গুহাতে মোট কয়জন ব্যক্তি আশ্রয় নিয়েছিলেন, এ সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যায় না। অবশ্য কোরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তারা বলবে, তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে, তারা পাঁচ জন। তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর। আরো বলবে, তারা ছিল সাত জন। তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বলুন, আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভালো জানেন। তাদের খবর অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া আপনি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবেন না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করবেন না।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ২২)

জর্দানের এই গুহাটি ছাড়াও বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী তুরস্কের এফিসাসে অবস্থিত একটি গুহাকে আসহাবে কাহাফের গুহা হিসেবে দাবি করা হয়। তথাপি জর্দানের এই গুহাটিই আসহাবে কাহাফের গুহা বলে অধিক পরিচিতি লাভ করেছে।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads