• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ধর্ম

নবী প্রেম হওয়া চাই অকৃত্রিম

  • প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর ২০১৯

এস এম আতিয়া

 

 

মহানবী (সা.)-কে সাহাবায়ে কেরাম নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। রাসুল (সা.)-এর প্রতি তাদের সেই ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম, অকল্পনীয়। বিপদাপদে, সুখ-দুঃখে সর্বাবস্থায় রাসুল (সা.)-এর সঙ্গ দিতেন তারা। তাঁর প্রতিটি কার্যকলাপকে তারা আদর্শরূপে একবাক্যে গ্রহণ করতেন। তাঁর যেকোনো ধরনের দুঃখ-কষ্ট তাদের সহ্য হতো না। অথচ অধুনা মুসলিম বিশ্বে সে ধরনের নবী প্রেম কোথায়!

একদা রাসুল (সা.) এবং আবু বকর (রা.) একসঙ্গে গভীর রাতে ঘর থেকে বেরুলেন। আবু বকর (রা.) পূর্ণ এক রাত-এক দিন বাহনজন্তুর ওপর চড়ে থাকলেন। আবু বকর (রা.) বলেন, দুপুর বেলা রোদে চলতে আমাদের কষ্ট হচ্ছিল, তাই খানিকটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আশপাশে তাকালাম। খুঁজতে লাগলাম একটুখানি ছায়া। কিন্তু কোথাও মিলল না তেমন জায়গা। হঠাৎ দূরে ছোট্ট একটি পাহাড় দেখে দ্রুত গেলাম সেদিকে। দেখলাম তাতে ছায়ার কিছু অংশ এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। সে ছায়াটুকুতে প্রিয় নবী (সা.)-এর অবস্থানের জন্য সেখানে একটি পশুর চামড়া বিছালাম। এরপর বললাম, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! শুয়ে পড়ুন এখানে।’ রাসুল (সা.) শুয়ে পড়লেন।

কিছুক্ষণ পর এদিক-ওদিক লক্ষ করলাম। হঠাৎ একজন রাখাল নজরে পড়ল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে বালক! তুমি কার মেষপাল চড়াও?’ সে বলল, ‘কোরাইশের এক ব্যক্তির।’ সে এমন ব্যক্তির নাম বলল, যে আমার পূর্বপরিচিত। বললাম, ‘তোমার মেষপালে দুধ আছে?’ বলল, ‘আছে’। বললাম, ‘তুমি আমার জন্য একটুখানি দুধ দোহন করবে?’ হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল সে। এরপর তাকে একটি ছাগল বাঁধতে আদেশ দিলাম। তারপর আমি তার স্তন থেকে ধুলো মুছতে বললাম। সে যথাযথভাবে সব আদেশ পালন করল। দুধের পেয়ালা এগিয়ে দিলাম। বালকটি বেশ খানিক দুধ দোহন করে দিল। আমি পেয়ালায় জল ঢেলে তার তলা ঠান্ডা করে নিলাম। এরপর রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে দেখি, তিনি জেগে আছেন। বললাম, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! নিন, দুধ খান।’ তিনি তৃপ্তি ভরে খেলেন। সেটা দেখে আমিও তৃপ্তিবোধ করলাম। রাসুল (সা.) আবার রওনা করলেন। আমিও ধীরগতিতে এগোতে লাগলাম।

এদিকে কোরাইশরা তখনো আমাদের অনুসন্ধানে ব্যস্ত। তাদের মধ্য থেকে একজন ঘোড়সওয়ার সুরাকা ইবনে মালিক আমাদের দেখে ফেলল। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এখন কী হবে আমাদের? একজন সন্ধানকারী আমাদের সন্ধান পেয়ে গেছে।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘ভয় পেয়ো না। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ সুরাকা আমাদের দিকে অনেকটা এগিয়ে এলো। এতটা কাছে, আমাদের আর তার মাঝে একটি বা দুটি বর্শার ব্যবধান। আমি আবার বললাম, ‘হে আল্লার রাসুল! এই যে সন্ধানকারীরা আমাদের সন্ধান পেয়ে গেছে।’ তখন আমার অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। রাসুল (সা.) বললেন, ‘কাঁদছো কেন?’ বললাম, ‘আল্লাহর শপথ! আমি নিজের জন্য নয়, শুধু আপনার জন্য কাঁদছি।’

পরিস্থিতি সামাল দিতে রাসুল (সা.) হাত তুললেন আল্লাহর দরবারে। বললেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে চাও, সুরাকাকে প্রতিহত করো।’ তৎক্ষণাৎ তার ঘোড়ার পা মাটি গ্রাস করে নিল। সুরাকা ঘোড়ার পিঠ থেকে দ্রুত নেমে পড়ল। সুরাকা বলল, ‘মোহাম্মদ! আমি বুঝে গেছি, আপনি আমার জন্য বদদোয়া করেছেন। দয়া করে আপনি আমার জন্য প্রার্থনা করুন, যেন এমন দুর্দশা থেকে রাব্বুল আলামিন আমায় রক্ষা করেন। আল্লাহর শপথ! আমি কারো কাছেই আপনাদের খবর প্রকাশ করব না। এগুলো আমার তীর-ধনুক। এখান থেকে ইচ্ছেমতো নিয়ে নিন। কিছু দূর এগোতেই আমার উট এবং মেষপাল পাবেন। তা থেকে যে কটা দরকার, নিয়ে নেবেন। তবু আমার এ বিপদ থেকে মুক্তির জন্য একটুখানি প্রার্থনা করুন।’

প্রিয় নবী (সা.) বললেন, ‘এসবের কোনো কিছুরই প্রয়োজন নেই।’ রাসুল (সা.) সুরাকার জন্য দোয়া করলেন। সে আগের অবস্থায় ফিরে এলো। সুরাকা সঙ্গে সঙ্গে তার দলবলের কাছে ফিরে গেল। এরপর রাসুল (সা.) চলতে লাগলেন। আমিও তাঁর সঙ্গে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম। অবশেষে মদিনায় এসে পড়লাম। মদিনাবাসী দিকদিগন্ত থেকে ছুটে এলো।

সবাই রাস্তায় এসে প্রিয় নবী (সা.)-কে অভ্যর্থনা জানাল। ছোট্ট ছোট্ট শিশু-কিশোর সুরে সুরে, তালে তালে বলতে লাগল, ‘আল্লাহু আকবার, রাসুলুল্লাহ এসেছেন,  মোহাম্মদ এসেছেন, প্রিয় নবী এসেছেন।’ তাঁর আতিথ্য নিয়ে মদিনাবাসীর মাঝে প্রতিযোগিতা লেগে গেল। প্রিয় নবী (সা.) বললেন, ‘আজ রাত আবদুল মুত্তালিবের মামাবাড়ি বনু নাজ্জারের ঘরে কাটাতে চাই। পরদিন মহান রাব্বুল আলামিন যেদিকে নির্দেশ দিলেন, সেদিকে রাসুল (সা.) চলে গেলেন। (বুখারি : ৩৬১৫)।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads