• শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ধর্ম

তুর্কি সুলতানদের রাসুল প্রেম

  • প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর ২০১৯

আয়েশা মালিহা

 

 

তুর্কি সুলতানরা যে আশেকে রাসুল (সা.) ছিলেন, ছিলেন নবী প্রেমিক, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তা জানা যায়। বর্তমান সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চল তথা পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনা শত শত বছর তুর্কি সালতানাতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেকালে প্রতিকূল যোগাযোগেও বিশ্বের বিশাল অঞ্চল তুর্কিরা শত শত বছর শাসন করে গেছেন। এর মধ্যে হেজাজসহ কায়রো, জেরুজালেম, দামেস্ক, বাগদাদ অন্যতম। মুসলিম বিশ্বের এসব গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো তুর্কিরা শাসন করে গেছেন। আজ তারা বিশাল সাম্রাজ্য হারিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের ছয়গুণের মতো বড় ১০ লাখ ১ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এ পবিত্র নগরীগুলো তাদের ত্যাগ, প্রেম ও ভালোবাসার নিদর্শন জাগরুক রয়েছে। বর্তমান রওজা পাক ও মূল মসজিদে নববি শরিফ ইস্তাম্বুলের তুর্কি সুলতানরা কর্তৃক নির্মিত। অর্থাৎ নবীজি (সা.)-এর আমল এবং পরবর্তী আমিরুল মুমেনিন হজরত ওসমান গণি (রা.) কর্তৃক সম্প্রসারিত এরিয়া তুর্কি সুলতান দ্বারা বর্তমান কাঠামো পুনঃনির্মিত।

অতঃপর এর উত্তরে আমিরুল মুমেনিন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফত পরিচালনার স্থান এবং তার কিছুটা উত্তরে আমিরুল মুমেনিন হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফত পরিচালনার স্থান উন্মুক্ত রেখে তুর্কি সুলতানরা মসজিদে নববি শরিফ উত্তর দিকে সম্প্রসারিত করেন। বাদশাহ আবদুল আজিজ তুর্কিদের নির্মিত রওজা পাক এবং পশ্চিম দিকে নবী পাক (সা.) ও হজরত ওসমান গণি (রা.)-এর মসজিদে নববির এরিয়াকে অক্ষত রেখে উত্তর দিকে সব কাঠামো ভেঙে পুনঃনির্মাণ করেন। বাদশাহ আবদুল আজিজ উত্তরের এ কাঠামো পুনঃনির্মাণ করলেও তুর্কিরা যে আগে করেছিল তা ইস্তাম্বুলে তোপকাপি জাদুঘরে রক্ষিত মডেল দেখলে অনায়াসে বুঝতে পারা যায়। পরবর্তী সময়ে আবদুল আজিজের চতুর্থ  ছেলে বাদশাহ ফাহাদ ১৯৮৫ সালে এ মসজিদে নববি শরিফ পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তরে বিশাল সম্প্রসারণ আধুনিক দৃষ্টিনন্দন কাজ শুরু করে ১৯৯৯ সালে সমাপ্ত করেন। বাদশাহ আবদুল্লাহ আবারো নতুন করে আরো সম্প্রসারণের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

একালে বিশ্বে তেল ও স্বর্ণের বড় রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। যেখানে মাত্র ৬০-৭০ বছর আগেও সৌদি আরব থেকে লোকজন আর্থিক সহায়তা পাওয়ার নিমিত্তে আমাদের দেশে আসত, সেখানে মাত্র ৬০-৭০ বছর ব্যবধানে বিশ্বের অনেক কিছু পাল্টে যায়। তেল বিক্রির অর্থের প্রাচুর্যে রাজতন্ত্রীয় দেশ সৌদি আরবের রাজপরিবারের শত শত সদস্য বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে জীবনযাপনে রত বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। অতএব, তেল বিক্রির মিলিয়ন বিলিয়ন পেরিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের আয় থাকায় পবিত্র মক্কায় মসজিদুল হারাম ও পবিত্র মদিনায় মসজিদে নববি শরিফ আধুনিকায়নে সম্প্রসারণ করা কোনো বিষয় নয়। কিন্তু তুর্কিরা চরম প্রতিকূল যোগাযোগে রাজস্ব আয় থেকে মদিনা মুনাওয়ারার রওজা পাক ও মসজিদে নববি শরিফ সুন্দর মজবুত করে নির্মাণে ন্যূনতম কার্পণ্য করছে বলা যাবে না। শুধু তাই নয় দামেস্ক থেকে পবিত্র মদিনা পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ বিশাল মরুপ্রবণ অঞ্চলের ওপর দিয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে সাহসের সঙ্গে বসিয়ে মদিনা মুনাওয়ারার সঙ্গে রেল যোগাযোগ চালু করেছিল। সঙ্গে সঙ্গে জেদ্দা থেকে মক্কা মোকাররমা এবং মক্কা মোকাররমা থেকে মদিনা মুনাওয়ারা রেল যোগাযোগের কাজ শুরুর পর্যায়ে ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং বাদশাহ আবদুল আজিজ কর্তৃক হেজাজ দখলে এসব কিছু তছনছ হয়ে যায়।

মদিনা মুনাওয়ারা ৫-৭ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। মসজিদে নববি শরিফের বর্তমান ফজরের আজানের মাইকের ধ্বনি হারামের সীমা পার হয়ে যায়। এ হারামের সীমার বাইরে যেকোনো অমুসলিমের জন্য উন্মুক্ত। তথায় তারা উন্নয়ন কাজ বা চাকরি-বাকরির জন্য অবস্থানরত। কিন্তু তুর্কিরা শত বছর আগে রেললাইন নির্মাণ করতে গিয়ে মদিনা মুনাওয়ারা থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো অমুসলিমের রেললাইন নির্মাণের সহায়তা গ্রহণ করেনি। তুর্কি এবং দামেস্ক, বাগদাদ, আরব মুসলিম লোকবল নিয়ে এ ৩০০ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করে। অর্থাৎ তুর্কি সুলতানরা নবী পাকের (সা.) প্রতি আশেক হয়ে সম্মান দেখিয়ে মদিনা মুনাওয়ারার কয়েক কিলোমিটার হেরমের দিকে চিন্তা না করে ৩০০ কিলোমিটার দূরত্বে চিন্তা করেছিল।

তুর্কি সুলতানরা রওজা পাক, মসজিদে নববি শরিফ, মক্কা মোকাররমার মসজিদুল হারাম পুনঃনির্মাণের পাশাপাশি জান্নাতুল বাকি ও জান্নাতুল মুওয়াল্লা উভয় পবিত্র কবরস্থানে আহলে বায়াত ও মহান সাহাবাদের রওজা শরিফের প্রতি শ্রদ্ধা ও মহব্বতের নিদর্শনস্বরূপ গম্বুজ নির্মাণ করেছিল। দেওবন্দির মতাদর্শ মতে, কোনো কবরের ওপর মাজার গম্বুজ নির্মাণ করা ধর্মমতে গ্রহণযোগ্য নয়! কিন্তু বাদশাহ আবদুল আজিজ ১৯২৪/২৫ খ্রিস্টাব্দে হেজাজ দখলের পর তার অনুসারী ফৌজরা এ উভয় পবিত্র কবরস্থানের তুর্কি সুলতান কর্তৃক নির্মিত গম্বুজগুলো ভেঙে ধূলিসাৎ করে দেয়।

দেওবন্দি মতাদর্শের বর্তমান বয়স্কজনের কাছে শোনা কথা, গম্বুজ নির্মাণ যেমন গ্রহণযোগ্য ছিল না তেমনি এসব গম্বুজ পুনরায় ভেঙে ফেলাও গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ না-ভাঙার মতামত নিয়ে লিখিত বা মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়েছিল। সে সময় হেজাজ অঞ্চল থেকে বহু আরবি ছাত্ররা উচ্চতর জ্ঞানার্জনের উদ্দেশে দেওবন্দসহ ভারতবর্ষে আসতেন।

তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুল জয় করার পর বহু দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করেন। ইস্তাম্বুলকে মসজিদের শহর বলা হয়। তোপকাপি প্যালেসের সম্মুখে নির্মিত সুলতান আহমদ মসজিদ প্রকাশ ব্লু মসজিদ এবং পাহাড়ের ওপর নির্মিত সোলায়মানি মসজিদ বিশ্বখ্যাত। তুর্কিরা তাদের দৃষ্টিনন্দন অতি আশ্চর্য স্থাপত্যশিল্পের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে কার্পণ্য করেনি এ দুটি মসজিদ নির্মাণের ক্ষেত্রে। এখানেও তারা পবিত্র রওজা পাক ও মসজিদে নববি শরিফের নির্মাণকৌশল কোরআনের আয়াতের ক্যালিওগ্রাফির অনুকরণ প্রতিফলন ঘটাতে কার্পণ্য করেননি। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত ব্লু মসজিদের মেহরাব, আজানখানা, পবিত্র কোরআনের ক্যালিওগ্রাফি পবিত্র মসজিদ নববির আদলে করা হয়েছে।

সাধারণত জাদুঘর বলতে একটি প্রকাণ্ড দালান বোঝায়। যে দালানে নানান প্রাচীন স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত থাকে। যেমনটা রয়েছে- ঢাকা, কলকাতা, দিল্লি, তেহরান, বাগদাদ, সানা, মিসর, লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো ইত্যাদি শহরগুলোতে। কিন্তু ইস্তাম্বুলের তোপকাপি জাদুঘর তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তুর্কি সুলতানদের প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এরিয়া ও একাধিক প্যালেস নিয়ে এ তোপকাপি জাদুঘর। বিশ্বের ১৩০ কোটির অধিক মুসলমানের কাছে এ জাদুঘর অতি পবিত্র স্থান। যেহেতু এখানকার প্যালেসগুলোর একটিতে নবী পাক (সা.)-এর তবরুকাত সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। এসবের মধ্যে নবী পাক (সা.)-এর দান্দান মুবারক, দাড়ি-চুল মুবারক, তলোয়ার, কাপড়-চোপড়, মোহরে নবুয়াত সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। আরো রয়েছে হজরত মুসা (আ.)-এর আশা (লাঠি), মা ফাতেমার (রা.) কাপড়, আমিরুল মুমেনিনদের ব্যবহারিক জিনিসপত্র, কয়েকজন সাহাবার ব্যবহারিক জিনিসপত্র, খালিদ ইবনে ওয়ালিদের তলোয়ার, কয়েকজন নবী-রাসুলের ব্যবহারিক জিনিসপত্র এ প্যালেসের বিভিন্ন কক্ষে সংরক্ষিত রয়েছে।

এসব কিছু বর্ণনায় জানা যায়, তুর্কিরা তাদের শত শত বছর রাজত্বকালে এসব কিছু যাচাই-বাছাই করে সংরক্ষণ করেছে। তোপকাপি জাদুঘরের অন্যান্য প্যালেসে তুর্কি সুলতানদের ভিন্ন কিছু সংরক্ষিত থাকলেও দর্শনার্থী মুসলমানদের প্রধান আকর্ষণ এ তবরুকাতের প্যালেস। তুর্কি সুলতান এসব কিছুর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে আজ থেকে ২০০ বছর আগে কোরআন তেলাওয়াত চালু করেন। আজ পর্যন্ত পালাক্রমে কারিরা সুমধুর কণ্ঠে রাতদিন এ কোরআন তেলাওয়াত জারি রেখেছেন। বিশ্বের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। তুর্কি সুলতানরা যে আশেকে রাসুল (সা.) ছিলেন এসব কিছু তারই বহিঃপ্রকাশ।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads