• সোমবার, ১ মার্চ ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭

ধর্ম

মুসলমান হয়েও যারা নবীর উম্মত নয়

  • প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

নাঈম কাসেমী

 

 

 

আমাদের ওপর আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো আল্লাহ আমাদের মানুষ বানিয়েছেন। দ্বিতীয়ত আমাদেরকে আল্লাহ তায়ালা সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত বানিয়েছেন। যে নবীর উম্মত হওয়ার জন্য সকল নবীর আশা ছিল। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় নিয়ামত। তবে হতভাগা হলো ওই সমস্ত মানুষ যারা নিজের জীবনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়নি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে জীবনের সকল ক্ষেত্রেই বিধিবিধান বর্ণনা করে দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি (সা.) বলেছেন, এই কাজ করলে ‘আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়’, ‘আমার দলভুক্ত নয়’, ‘সে আমার না আমিও তার না’ ইত্যাদি। এই বাক্যগুলো হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধমকি হিসেবে বলেছেন। ভয় দেখানোর জন্য বলেছেন। সতর্ক করেছেন। যাতে করে কোনো মানুষ এমন গর্হিত কাজ করতে সাহস না করে। এর দ্বারা কাফের বলা উদ্দেশ্য নয়। তবে যদি এ সকল কাজ কোনো মানুষ হালাল বা জায়েজ ভেবে করে থাকে, তাহলে তার ঈমান থাকবে না। কাফের হয়ে যাবে।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদের সম্পর্কে এতো শক্ত কথা বলেছেন, যাদেরকে নিজের উম্মত বলে পরিচয় দিতে চাননি, সে মানুষগুলো ও কাজগুলো সম্পর্কে জানা একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিচে একটা তালিকা পেশ করা হলো। এক. যে ব্যক্তি কোনো জালেম শাসককে সমর্থন করে: দলাদলির কারণে, অন্ধত্বের কারণে যারা জালেম শাসকের মিথ্যাকে সত্য বলে প্রচার করে, তার মিথ্যাকে সত্যায়ন করে। এদের ব্যাপারে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমার পরে কিছু শাসক আসবে তারা মিথ্যা কথা বলবে, জুলুম করবে, এদের মধ্যে কিছু লোক আসবে যারা এসব শাসককে সহযোগিতা করবে। প্রজাদের তাদের মিথ্যা কথা বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করবে এবং জুলুম অত্যাচারের ক্ষেত্রে সহায়তা করবে। তারা আমার উম্মত নয়। তাদেরকে আমি চিনি না। কেয়ামতের ময়দানে তারা আমার হাউজে কাউসারের পানি পান করতে আসতে পারবে না।’

দুই. যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন কোরো না। কেননা ইহুদিদের অভিবাদন হলো আঙুল দ্বারা ইশারা করা আর খ্রিস্টানদের অভিবাদন হলো হাতের তালু দিয়ে ইশারা করা।’ (তিরমিজি শরিফ)।

তিন. যে সমস্ত পুরুষ মহিলা একে অপরের বেশ সাদৃশ্য অবলম্বন করে : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যেসব নারী পুরুষের সঙ্গে সাদৃশ্য অবলম্বন করে এবং যেসব পুরুষ নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করে তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসনাদে আহমদ)। অর্থাৎ চালচলনে বা পোশাক-আশাকের দিক দিয়ে যদি কোনো নারী বা পুরুষ একে অপরের সাদৃশ্য অবলম্বন করে তাহলে তারা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হবে না। তাই বিশেষভাবে নারীর জন্য পুরুষের পোশাক এবং পুরুষের জন্য নারীর পোশাক পরিধান করা মারাত্মক গুনাহের কাজ।

চার. যে ব্যক্তি ছিনতাই বা জোরপূর্বক অন্যের ধন সম্পদ আত্মসাত করে : হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাজি.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ ছিনতাই করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ শরিফ)।

পাঁচ. যে ব্যক্তি শুধু ইবাদত করার জন্য সংসারবিমুখ হয়ে যায়, অর্থাৎ বৈরাগী হয়ে যায় : বৈরাগ্যতার কোনো স্থান ইসলামে নেই। হাদিসে এসেছে- লা রোহবানিয়াতা ফিল ইসলাম। ইসলামে বৈরাগ্যতার কোনো অবকাশ নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর কসম। নিশ্চয়ই আল্লাহর ভয় তোমাদের চেয়ে আমার অন্তরে বেশি। তবু আমি নফল রোজা কখনো রাখি কখনো রাখি না। রাতের কিছু অংশ নফল ইবাদতে কাটাই আর কিছু অংশে ঘুমাই এবং বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ি। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত (বিবাহ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সে আমার অনুসারী নয়। (সহিহ বুখারি)। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন আল্লাহর খুব প্রশংসা বাক্য বর্ণনা করলেন। আর বললেন, আমি তো নামাজ আদায় করি আবার ঘুমাই, রোজা পালন করি নফল রোজা রাখি আবার কোনো সময় ত্যাগও করি। নারীদের বিয়ে করি; এসব আমার আদর্শভুক্ত। ফলে যে ব্যক্তি আমার এসব আদর্শ (জীবনযাপন পদ্ধতি) থেকে বিমুখ হবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (বুখারি শরিফ)।

ছয়. যে ব্যক্তি প্রতারণা করে : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন স্তূপ করে রাখা খাদ্যশস্যের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তূপের ভেতরে হাত প্রবেশ করালে আঙুলগুলো ভিজে গেল। স্তূপের মালিককে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী? মালিক জবাব দিল, হে আল্লাহর রাসুল! বৃষ্টির পানিতে তা ভিজে গিয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তবে তা উপরে রাখলে না কেন, যেন মানুষ তা দেখতে পায়? যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম শরিফ)

সাত. যারা ভাগ্য গণনার জন্য গনকের কাছে যায় : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভালো-মন্দ যাচাই করল, অথবা যার ভাগ্যের ভালো-মন্দ যাচাই করার জন্য পাখি ওড়ানো হলো, অথবা যে ব্যক্তি ভাগ্য গণনা করল, অথবা যার ভাগ্য গণনা করা হলো, অথবা যে ব্যক্তি জাদু করল অথবা যার জন্য জাদু করা হলো অথবা যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে এলো, অতঃপর সে (গণক) যা বলল তা বিশ্বাস করল- সে ব্যক্তি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যা নাজিল করা হয়েছে তা অস্বীকার করল। (মাজমাউজ জাওয়াইদ) অন্য হাদিসে হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি গণকের কাছে এলো, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।

আট. যে ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ হয় : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারো স্ত্রীকে তার স্বামীর বিরুদ্ধে অথবা দাসকে তার মনিবের বিরুদ্ধ প্ররোচিত করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ শরিফ)। তাই কারো জন্য উচিত নয় স্বামী-স্ত্রীর কোনো দোষ একে অপরের কাছে তাদের মাঝে ফাটল ধরানোর নিয়তে বলা।

নয়. প্রিয় কারো মৃত্যু হলে যে ব্যক্তি ধৈর্যহারা হয়ে বিলাপ করে, ভাঙচুর করে: ওই ব্যক্তি যে কোনো বিপদে-আপদে বিশেষ করে কোনো প্রিয়জনের মৃত্যুতে ধৈর্যহারা হয়ে যায়। ধৈর্যহারা হয়ে কাপড় ছিঁড়ে ফেলে, মুখ ছাপড়ায়, বুক ছাপড়ায় এবং নানারকম আাাপত্তিকর মন্তব্য মুখ দিয়ে করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ব্যক্তি নিজের গালে চপেটাঘাত করে, জামার কলার ধরে টান দেয় অথবা বোতাম ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহেলি যুগের লোকেরা বিপদ-আপদের সময় যেভাবে আজেবাজে মন্তব্য করতো, অনেকে মালাকুল মাউতকে গালাগালি করে। অনেকে তাকদিরকে দোষারোপ করে, অনেকে আল্লাহকে পর্যন্ত কটু কথা বলে ফেলে।’ অন্য হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ব্যক্তির মৃত্যুতে বা বিপদে জোরে জোরে কান্নাকাটি করল, মাথার চুল কামিয়ে ফেলল, কাপড় ছেঁড়াছিঁড়ি করল, ওই ব্যক্তি আমার উম্মত হতে পারে না। (নাসায়ি শরিফ)। এজন্য কোনো বিপদে পড়লে প্রথমেই আল্লাহর দিকে রুজু হয়ে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া মুমিনের কাজ। কোনো হায়হুতাশ, চিল্লাচিল্লি না করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত। কোরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সবর এবং নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ তাই মুমিনের জন্য উচিত হলো, কোনো বিপদে পড়লে নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা।

দশ. যে ব্যক্তি গোঁফ ছোট করে না : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশরাদ করেন, মুশরিকদের বিরোধিতা কর, দাড়ি লম্বা কর, আর গোঁফ ছোট কর। (বুখারি শরিফ)। অন্যত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি গোঁফ না ছাঁটে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। (নাসায়ি শরিফ)। তাই দাড়ি লম্বা করতে হবে এবং গোঁফ ছোট করে রাখতে হবে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, অনেক মুসলমানকে এটার উল্টো করতে দেখা যায়। দাড়ি কমপক্ষে একমুষ্টি লম্বা রাখতে হবে। এক মুষ্টির বেশি হয়ে গেলে ইচ্ছা করলে কাটতে পারবে। এক মুষ্টি হওয়ার আগে দাড়ি কাটা কবিরা গুনাহ। আর এটা এমন কবিরা গুনাহ যা সবসময় হতেই থাকে। ঘুমাতে থাকলেও কবিরা গুনাহ আমল নামায় লেখা হতে থাকে। তাই আমাদের সবার জন্য আবশ্যক হলো দাড়ি লম্বা করা আর গোঁফ ছোট করে রাখা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে উপরের সব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads