• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

স্বপ্নজয়ের রথে প্রযুক্তির বরপুত্র

  • তপু রায়হান
  • প্রকাশিত ১১ এপ্রিল ২০১৮

এলন ভির মাস্ক। ১৯৭১ সালের ২৮ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া একটি শিশু। তার বাবা এরল মাস্ক ছিলেন সাউথ আফ্রিকান, কিন্তু মা ছিলেন কানাডিয়ান। তবে ইঞ্জিনিয়ার বাবা এবং ডায়েটিশিয়ান মায়ের পরিবারে খুব বেশি সচ্ছলতা ছিল না। এমনকি ছয় বছর আগেও স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে নিজের নৈমিত্তিক ব্যয় চালানোর জন্য তাকে হাত পাততে হয়েছে বন্ধুদের কাছে। অথচ সেই এলন ভির মাস্কই এখন ২৫০ কোটি ডলারের মালিক। তার স্বপ্ন আগামী ১০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর শীর্ষ ধনী হওয়া।

এই স্বপ্ন যে অমূলক নয় সেটা বিশ্বকে দেখিয়েছেন একুশ শতকের প্রযুক্তির বরপুত্র খ্যাত এলন ভির মাস্ক। এলন মাস্ক যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। জিপ২, পে-প্যাল, টেসলা মোটরস, স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজি (স্পেসএক্স) এবং সোলার সিটির প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে- পে-প্যাল, সোলারসিটি, স্পেসএক্স, টেসলার মতো চারটি ভিন্ন এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রজেক্টকে সফল করা, একজন মানুষের পক্ষে কীভাবে সম্ভব?

কিন্তু যিনি বলতে পারেন, ‘যে সমস্যা তোমাকে নাকানি চুবানি না খাওয়ায়, তা কোনো সমস্যাই নয়। তোমার যদি কোনো কাজ জরুরি মনে হয়, তাহলে সেই কাজে বিফল হবে জেনেও জানপ্রাণ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত’- তিনি সফল হতেই পারেন। পারেন নিজের স্বপ্নকেও অতিক্রম করতে।

শৈশবটা অনেক শিশুর মতোই হুল্লোড়ে কাটেনি মাস্কের। ভাই কিম্বাল এবং বোন টস্কা আর বইয়ের সঙ্গেই শৈশবের সময় কেটেছে তার। দিনে ১০ ঘণ্টার ওপরে বই পড়তেন। পড়ার ধাত এতই বেশি ছিল যে লাইব্রেরির সব বই শেষ করে পুরো এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাই পড়ে ফেললেন।

মাত্র নয় বছর বয়সে প্রথম কম্পিউটার হাতে পান তিনি। এরপরই ছোট্ট মাস্ক ‘ব্লাস্ট’ নামে একটা ভিডিও গেম বানিয়ে ফেললেন। ১৯৮৩ সালে গেমটি ৫০০ ডলারে কিনে নিয়েছিল একটি কম্পিউটার ম্যাগাজিন যখন মাস্কের বয়স মাত্র ১২।

তবে ১৯ বছর বয়সে মায়ের নাগরিকত্বের সুযোগে মাস্ক আফ্রিকা ছেড়ে পাড়ি জমান কানাডায়। তবে এর কিছুদিন পরেই মার্কিন মুলুকে পাড়ি জমান সেই স্বপ্নচারী তরুণটি। ভর্তি হন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই তিনি পদার্থবিজ্ঞানে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হার্টন স্কুল থেকে অর্থনীতিতেও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে অবশেষে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স এবং ম্যাটারিয়াল সায়েন্সের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক দু’দিন পরেই তার ভাই কিম্বাল মাস্ককে সঙ্গে নিয়ে প্রথম আইটি কোম্পানি জিপ২ করপোরেশন চালু করার লক্ষ্যে স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে যান মাস্ক।

জিপ২ একটি ওয়েবনির্ভর সফটওয়ার কোম্পানি, যার কাজ ছিল ইন্টারনেটে একটি বিজনেস ডিরেক্টরি ও ম্যাপ তৈরি করা। সেই সময়ে ব্যবসায়ীরা ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে পয়সা খরচ করাকে বোকামি মনে করত, কিন্তু ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে জিপ২ ও ফুলেফেঁপে উঠল। বিশ্বখ্যাত কোম্পানি কমপ্যাক জিপ২-কে ১৯৯৯ সালে ৩০৭ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। নিখুঁত ভবিষ্যৎদ্রষ্টা মাস্ক মাত্র ২৭ বছরেই হন মিলিওনিয়ার।

মাস্ক এরপর ইন্টারনেটে বেচাকেনা, টাকা আদানপ্রদানের সুবিধার জন্য একটা ওয়েব ব্যাংকের আইডিয়া নিয়ে উঠেপড়ে লাগেন। জিপ২ থেকে পাওয়া অর্থের তিন-চতুর্থাংশই বিনিয়োগ করেন তার নতুন আইডিয়ার পেছনে। তৈরি হয় এক্স.কম। এক্স.কমের অফিস বিল্ডিংয়েই আরেকটি কোম্পানি ছিল, পিটার থিলের ইন্টারনেট ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানি ‘কনফিনিটি’। ইন্টারনেটে অর্থ লেনদেনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বুঝতে পেরে প্রতিযোগিতা ছেড়ে দুটি কোম্পানি একসঙ্গে হয়ে গঠন করে ‘পে-প্যাল’। ওয়েব জায়ান্ট ই-বে পে-প্যালকে কিনে নেয় ২০০২ সালে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে। সেখান থেকে সর্বোচ্চ শেয়ার-হোল্ডার হিসেবে ট্যাক্স বাদ দিয়েই মাস্ক উপার্জন করেন ১৮০ মিলিয়ন ডলার।

এই পরিমাণ টাকা দিয়ে যে কেউ ২-৩ প্রজন্ম পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু এই টাকা দিয়ে মাস্ক কী করেছিলেন একবার আন্দাজ করুন তো? তিন তিনটি অচিন্তনীয় ও সাহসী প্রজেক্টে বিনিয়োগ করে ফেললেন!

কিন্তু স্বপ্নবাজ মাস্ক ২০০২ সালে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে একটা নতুন কোম্পানি গঠন করেন, ‘স্পেস এক্স’। একটি রকেট কোম্পানি! এর ভিশন হিসেবে বলা হয়, মহাকাশ ভ্রমণের খরচ সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসা এবং সামনের ১০০ বছরের মধ্যে ভিন্ন গ্রহে (মঙ্গল) মানুষের কলোনি তৈরি করা! ২০০৪ সালে ৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন ইলেকট্রিক অটোমোবাইল কোম্পানি টেসলায়। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তেল ও গ্যাসের ওপর চাপ কমিয়ে আনা। ২০০৬ সালে তার কাজিনের সঙ্গে মিলে গঠন করেন আরেকটি কোম্পানি, ‘সোলার সিটি’। এটির লক্ষ্য সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘরদোরের জন্য ব্যবহূত বিদ্যুৎ, যা ফুয়েলের মাধ্যমে তৈরি করা হয়, তার পরিমাণ কমিয়ে আনা। এর মাধ্যমে তিনি চেয়েছেন তার পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ধারণাটির আরো বিস্তার ঘটাতে।

তবে ২০০২ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়টা মাস্কের জন্য খুব সুখকর ছিল না। স্পেসএক্সের তিনটি রকেট কক্ষপথে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস হয়ে যায়। টাকার অভাবে টেসলার গাড়ির প্রকল্পও এগুচ্ছিল না। তবে হাল ছাড়েননি মাস্ক। তিনি বলেছিলেন, আমার কাছে যা আছে তা দিয়ে হয়তো আরো একটি রকেট পাঠানো যাবে, এবং আমি সুযোগটি নিতে চাই। হয়তো এটাই স্পেসএক্সের জন্য শেষ সুযোগ।

এলন মাস্ক ফিনিক্স পাখির মতোই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এলেন ২০০৮-এর শেষে। রকেট ঠিকঠাক কক্ষপথে পৌঁছুল। আর বাজারে এলো নতুন গাড়ি- টেসলা রোডস্টার।

এই ‘টেসলা রোডস্টার’ আরাম, সৌন্দর্য, ব্যয়বহুলতা এবং গতি- সবদিক থেকেই যেকোনো দামি গাড়ির তুলনায় কোনো দিক থেকেই কম নয়। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তেই তিনি তৈরি করলেন গাড়ি চার্জ করার পাম্প, যেখানে কিনা বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় তার সেই সোলার সিটি থেকেই। এলনের ‘টেসলা রোডস্টার’ গাড়ির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, একবার সম্পূর্ণ চার্জ করার পর তা একটানা ৪৫০ কিলোমিটার চলতে সক্ষম ছিল।

নাসা বা ইসরো যে রকেটগুলো মহাকাশে পাঠায়, সেগুলো অনেকটা ওয়ান টাইম। রকেটগুলো পৃথিবীর বলয় থেকে একটা টার্গেটে পৌঁছার পরপরই ধ্বংস হয়ে যায়। সে কথা মাথায় রেখে এলন হাত দেন তার ড্রিম প্রজেক্টে, যার নাম ‘স্পেস এক্স’।

তিনি তৈরি করলেন পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট। রকেট মহাকাশে পাঠাতে যে জ্বালানি প্রয়োজন হয়, তা প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ। মাথা খাটিয়ে তিনি তৈরি করলেন ভাসমান গোছের এক হেলিপ্যাড।

কম জ্বালানি পুড়িয়ে পৃথিবীর অদূরে কোনো মহাসাগরের নিকটবর্তী এলাকায়, যেখানে সাধারণত রকেট ব্লাস্ট হয়, সেই স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে এই হেলিপ্যাড। এতে করে রকেট সেখানে ল্যান্ড করার সুযোগ থাকবে। এই নতুন সম্ভাবনায় নাসাও এখন এলনের সঙ্গে আশাবাদী ও চুক্তিবদ্ধ। তাদের চিন্তা এখন অ্যাস্ট্রোনটদের কীভাবে এমন রি-ইউজেবল রকেটে করে পাঠানো যায়।

তা ছাড়া এলনের নতুনতম আবিষ্কার হলো সৌরশক্তিচালিত হাইস্পিড মোটর ‘হাইপারলুপ’। ইলনের এই হাইপারলুপ মোটরের সাহায্যে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সানফ্রান্সিসকো পর্যন্ত ৬১৪ কিলোমিটার পথ যেতে সময় নেবে মাত্র ৩০ মিনিট। হাইপারলুপের আইডিয়া তার মগজ-উদ্ভূত হলেও অর্থের অভাবে তিনি তা বানাতে পারেননি। কিন্তু তাতে কী? নিজের তৈরি ডিজাইন গোটা দুনিয়ার সামনে মেলে দিলেন তিনি। তার মূল উদ্দেশ্য- যারা পারবে, তারা তা বানিয়ে নেবে। এখানেই এলন মাস্ক বাকি ব্যবসায়ীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

তাই মহাকাশযান, ইলেকট্রিক গাড়ি ও অনলাইন ট্রানজেকশন- এই তিন ইন্ডাস্ট্রিকে আমূল বদলে দেওয়া স্বপ্নবাজ মানুষটির সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একদিন মঙ্গলে হবে তার বসতি। মঙ্গলে কোনো এক ঘরে এক কাপ কফি খেতে খেতে মৃত্যু হবে তার।

ইন্টারনেট অবলম্বনে তপু রায়হান

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads