• বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫
ads

অর্গানিক চাষাবাদ

ছবি: সংগৃহীত

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

অর্গানিক চাষাবাদে আদিম যুগে বাংলাদেশ

  • নাজমুল হুসাইন
  • প্রকাশিত ০৬ মে ২০১৮

সাধারণভাবে জৈবখাদ্য অথবা অর্গানিক ফুড বলতে কোনো ধরনের রাসায়নিক, হরমোন বা কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদিত খাবারকে বোঝায়। এ কারণে অর্গানিক খাবার শতভাগ নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। ফলে সারা বিশ্বে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ক্রমেই বাড়ছে অর্গানিক চাষাবাদ। কিন্তু সে তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে, বলা চলে আদিম যুগে।

এখন বিশ্বের যেসব দেশে ১ শতাংশেরও কম জমিতে অর্গানিক চাষাবাদ হচ্ছে, সেই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। তাও আবার অনেক দেশের পেছনে। এই সময় দেশের মাত্র ৬ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষাবাদ হচ্ছে, যা মোট চাষযোগ্য জমির মাত্র দশমিক ১ শতাংশ। এশিয়ার অধিকাংশ দেশই বাংলাদেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে।

সম্প্রতি ‘বিশ্ব জৈব কৃষি ২০১৮ : পরিসংখ্যান ও দ্রুত বর্ধনশীল প্রবণতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অর্গানিক চাষাবাদ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তর তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বে এখন ৫৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন হেক্টরে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে, যা মোট জমির ১ দশমিক ২ শতাংশ।

এশিয়া মহাদেশে সার্বিক অর্গানিক চাষাবাদের হার দশমিক ৩ শতাংশ। এ অঞ্চলে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে চীন। আর সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে তলানিতে। অর্গানিক চাষাবাদে শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে বেশ এগিয়ে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর অর্গানিক এগ্রিকালচার মুভমেন্টের সদস্য (আইএফওএএম) ও বাংলাদেশ জৈব কৃষি নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ড. মো. নাজিম উদ্দিন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দেশে সামগ্রিক কৃষিতে অর্গানিকের অবদান অনেক কম। তবে রাতারাতি সারা দেশে এ পদ্ধতির চাষাবাদ প্রবর্তনও সম্ভব নয়। এর জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি দরকার। সরকার কৌশলগত কিছু উদ্যোগ নিলেও বাস্তবে এর অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য নিরাপত্তার দেশে অর্গানিকের বিকল্প নেই। কিন্তু এখনো এ ধরনের খাদ্য নিয়ে কিছু ভুল ধারণা আছে। রাসায়নিক সার প্রয়োগে উৎপাদনকে গুরুত্ব দিয়ে অর্গানিক ফুডকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। এতে মাটি, পরিবেশ মানুষের স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল দেশে চাহিদামতো খাদ্যের জোগান দেওয়া জৈব কৃষির পক্ষে আদৌ সম্ভব কি না,  তা নিয়ে দেশের নীতিনির্ধারক মহল এখনো সন্দিহান। যদিও এ বিষয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) নিশ্চিত করেছে, জৈব কৃষি সারা বিশ্বের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

এফএওর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি একটি তাত্ত্বিক মডেলে বিশ্বের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ও ফলন না বাড়িয়েই শুধু জৈব কৃষির মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য দৈনিক ২ হাজার ৬৪০ থেকে ৪ হাজার ৩৮০ কিলোক্যালরি খাদ্যের জোগান দিতে সমর্থ হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক উৎপাদনের আশায় দেশে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ও জিএম শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসল ও ফলমূল উৎপাদনে ঝুঁকছে কৃষক। এসব পদ্ধতিতে দফায় দফায় প্রয়োগ করা হচ্ছে বিষাক্ত কীটনাশক। আবার ফল পাকাতে কার্বাইড ব্যবহার ও পচন রোধে অতিমাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগের ঝোঁক বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা  আকৃষ্ট করার জন্য শাকসবজি ও ফলমূলে মেশানো হচ্ছে নানা ধরনের বিষাক্ত রঞ্জক, যা খাদ্যের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করছে। এসব খাদ্য খেয়ে কমে যাচ্ছে জীবনীশক্তি ও আয়ুষ্কাল। সঙ্গে শরীরে ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগব্যাধি বাসা বাঁধছে।

ষাটের দশকের আগে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা ছিল জৈব নির্ভর। কিন্তু এরপর থেকে বাণিজ্যিক চাষাবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে নিম্ন সারিতে এসে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য দেশ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে অর্গানিক চাষাবাদকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ঝুঁকছে।

এদিকে বাংলাদেশে এখন যেটুকু উৎপাদন হচ্ছে তাও শতভাগ অর্গানিক নয়- এ তথ্য জানিয়ে বাংলাদেশে অর্গানিক পণ্য উৎপাদনকারী সমিতির সভাপতি কামরুজ্জামান মৃধা বলেন, দেশে এখন সেমি-অর্গানিক পণ্য উৎপন্ন হচ্ছে। ফলে অর্গানিক পণ্য উৎপাদনকারী হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃত নয়।

ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বীকৃত উপায়ে শতভাগ অর্গানিক ফসল উৎপাদনের জন্য সেই পণ্যের খাদ্য বা সারও অর্গানিক হতে হয়। অর্থাৎ সব স্তরের উপাদানগুলো অর্গানিক হওয়া প্রয়োজন। যেমন অর্গানিক মাছ বা মুরগি উৎপাদনের জন্য তাদের খাদ্যও অর্গানিক হতে হবে, যা বাংলাদেশে হচ্ছে না। 

প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের পর থেকে অর্গানিক চাষাবাদের জমি বাড়ছে না দেশে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ১০১টি অর্গানিক চাষাবাদের প্রকল্প চালু ছিল, যেখানে প্রায় ৯ হাজার ৩০৩ জন উদ্যোক্তা সম্পৃক্ত।

তবে বাংলাদেশ সরকার অর্গানিক চাষাবাদ বাড়াতে ‘ন্যাশনাল অর্গানিক এগ্রিকালচার পলিসি-২০১৬’ বাস্তবায়ন ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘ন্যাশনাল অর্গানিক স্ট্যান্ডার্ড বোর্ড’ গঠনের পরিকল্পনা করেছে। এ দেশের চা একটি উল্লেখযোগ্য অর্গানিক পণ্য। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘কাজী অ্যান্ড কাজী’ ২০১০ সাল থেকে অর্গানিক পদ্ধতিতে চা উৎপাদন করছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালে ‘সাহবাজপুর টি লিমিটেড’ ১২ দশমিক ৪ টন অর্গানিক ব্ল্যাক টি ও ২ দশমিক ৪ টন গ্রিন টি উৎপন্ন করেছে। এ ছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে উৎপাদিত অর্গানিক কাজুবাদাম রফতানি হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে অর্গানিক চাষাবাদ নিয়ে কাজ করছে প্রশিকা, উবিনীগ, উন্নয়নধারা, হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড, অ্যাকশনএইড, রাজশাহী কৃষি পাঠাগার, বারসিক, এএলআরডি, কারিতাসের মতো আরো শতাধিক প্রতিষ্ঠান।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads