• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭
ads

শোবিজ

স্মৃতির খোঁয়াড়ে রুপালি বিষাদ

  • সোহেল অটল
  • প্রকাশিত ১৮ অক্টোবর ২০১৯

মানুষ যখন চোখের সামনে থাকে না, কিংবা আর কোনোদিনই চোখের সামনে আসার সুযোগ থাকে না, তখন স্মৃতি হয়ে যায়। শুধুই স্মৃতি।

কিংবদন্তি রকস্টার আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন ঠিক এক বছর আগে। এই এক বছরে তার সশরীর উপস্থিতি ছিল না বটে, কিন্তু ঘটা করে মৃত্যুদিন পালনের সুযোগও হয়নি। প্রথমবার সেই দিনটি এসেছে। আজ সেই দিন। ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। আজ ঘটা করে তার চিরবিদায় স্মরণ করা হচ্ছে। আজকের দিনটি ঠিকঠাক মনে করিয়ে দিচ্ছে, আইয়ুব বাচ্চু স্মৃতি হয়ে গেছেন। নিখাদ স্মৃতি।

হারানোর স্মৃতি কখনোই সুখকর হয় না। যত ঘটা করেই আইয়ুব বাচ্চুকে আজ স্মরণ করা হোক, তাতে মিশে থাকবে বিষাদ।

সাংবাদিক হিসেবে আইয়ুব বাচ্চুকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। পেশাদার সাংবাদিকতা শুরুর দিকেই আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিল তার সাক্ষাৎকার নেওয়া। তখন আইয়ুব বাচ্চু আকাশের তারার মতো। দূর থেকে দেখা যায়। জ্বলজ্বল করে। কিন্তু কাছে ঘেঁষা যায় না। নবীন সাংবাদিকের জন্য তার সান্নিধ্য পাওয়া ছিল রীতিমতো কঠিন কাজ। তার কাছে বসে দুকথা শুনতে পারার সুযোগ ছিল গর্ব করার মতো।

তেমনই কঠিন কাজ করার জন্য আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমি খুশিই হলাম। রুপালি গিটারের মালিক, যার গান শুনে শুনে পেরিয়েছি কৈশর। উঠতি যৌবনে যার সুরের মিষ্টি-বিষাদে ভরিয়েছি মনপ্রাণ-তার গল্প শুনতে যাব, এমন অনুভূতিই আমাকে কঠিন কাজটা করতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

ফোনে ফোনে যোগাযোগ করার পর আইয়ুব বাচ্চু আমাকে যেতে বললেন তার এবি কিচেনে। মগবাজারের ওই স্টুডিওতেই তার বেশির ভাগ সময় কাটত। নির্ধারিত সময়ের আগেই পৌঁছে গেলাম। কিন্তু হায়, আইয়ুব বাচ্চু নেই। নেই তো নেই। স্টুডিওতে নেই, ফোনে নেই। এমনকি স্টুডিওর কর্মচারীদের খোঁজেও নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে, একরাশ হতাশা নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিলাম।

অফিসে ফেরার পর মনে হলো, আইয়ুব বাচ্চুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে না আমার। তিনি সম্ভবত আমাকে পছন্দ করেননি। আমার মতো পুঁচকে সাংবাদিককে দেওয়ার মতো সময় তার হাতে থাকার কথাও না।

সাহস দিলেন সহকর্মী বড় ভাই। জানালেন, বাচ্চু ভাই একটু খামখেয়ালি আছেন। নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। আপনি লেগে থাকেন। পারবেন।

সাহস পেয়ে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠলাম। আবারো যোগাযোগ। আবারো সময় দিলেন। আবারো নির্ধারিত সময়ের আগে এবি কিচেনে গিয়ে বসে থাকলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আবারো তার নিরুদ্দেশ পরিস্থিতির মুখে পড়লাম। আবারো হতাশ হয়ে ফিরে এলাম।

এভাবে চারবার ফিরে এসেছি তার স্টুডিও থেকে। পঞ্চমবার যখন তার নাগাল পেলাম, দেখা মাত্রই আমার সব অভিমান উড়ে গেল। উনি জড়িয়ে ধরে আমাকে বসতে দিলেন। চারবার ফিরে যেতে হয়েছে শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন। এবং মনপ্রাণ উজাড় করে কথা বললেন। আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে আমার জমানো যত প্রশ্ন ছিল-তার সব উত্তর দিলেন হাসিমুখে। বললেন, ‘তোমার যত সময় লাগে আজ নিয়ে নাও। তোমাকে চারবার ফিরে যেতে হয়েছে। এই চারবারের সময়টা এখন তোমার জন্য বরাদ্দ।’

খুব মনে পড়ছে, কালো হ্যাটটা মাথায় দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে কথা বলছিলেন। খুব আরাম করে, নির্ভার হয়ে। মাঝে-মধ্যে স্টুডিওর কর্মচারীরা এসে এটা-ওটা বলে তাকে ব্যস্ত করতে চাচ্ছিলেন, তিনি তাদের কথায় ব্যস্ত হননি। খুব মনোসংযোগ ছিল সেদিনের আলাপচারিতায়।

এরপর আইয়ুব বাচ্চু কোনোদিন ভোলেননি আমাকে। তার সঙ্গে দেখা হতো কমই। মোবাইল ফোনের যুগে জরুরি কথাটা টুক করে শুনে নেওয়া যেত। তবে যতদিন পরই দেখা হতো, দরাজ গলায় নাম ধরে ডাকতেন। খুব আন্তরিক ভঙ্গিতে ডাকতেন। বড় ভাইয়ের মতো।

কত মানুষই তো চলে যায়। চেনা মানুষগুলোও বিস্মৃত হয়ে যায় কখনো কখনো। কিন্তু কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যায় আরো অধিক। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতার মতো করে বললে, ‘চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়, বিচ্ছেদ নয়/ চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন করা আদ্র রজনী/ চলে গেলে আমারো অধিক কিছু থেকে যাবে/ আমার না-থাকা জুড়ে।’

আইয়ুব বাচ্চু চলে গেছেন। তার চলে যাওয়ার আজ এক বছর। কিন্তু তিনি থেকে গেছেন না-থাকার সবটুকুজুড়ে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads