• সোমবার, ১ মার্চ ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
‘ভাষা আন্দোলন’ নির্ভর ছবি হচ্ছে না কেন?

সংগৃহীত ছবি

শোবিজ

‘ভাষা আন্দোলন’ নির্ভর ছবি হচ্ছে না কেন?

  • প্রকাশিত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দিকের প্রথম ধাপ। আমাদের বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম ও চূড়ান্ত প্রয়াস। ভাষার জন্য আন্দোলন করে জীবন দেওয়ার নজির একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও নেই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি। অথচ বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন নিয়ে তিনটির বেশি কোনো চলচ্চিত্র নেই। বাংলাদেশি চলচ্চিত্র তথ্যভান্ডার বলছে, ১৯৫২ সালের পর ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলাদেশে মাত্র তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে! যার প্রথমটি ১৯৭০ সালে পরিচালনা করেন জহির রায়হান, নাম ‘জীবন থেকে নেয়া’। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই চলচ্চিত্রটি বানিয়েছিলেন তিনি। যে চলচ্চিত্র শুধু কালজয়ী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়নি, স্বাধীনতা সংগ্রামেও ব্যাপক অবদান রেখেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র হলেও ভাষা আন্দোলনকে প্রাধান্য দিয়ে শহীদুল ইসলাম খোকন ২০০৬ সালে নির্মাণ করেন ‘বাঙলা’। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার ‘ওংকার’ উপন্যাসে অনুপ্রাণিত এটি। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে তৈরি হয় ‘বাঙলা’। হুমায়ুন ফরীদি, মাহফুজ আহমেদ, শাবনূর অভিনীত এ চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে একজন বোবা মেয়ের মুখ থেকে বের হয়ে আসে একটি শব্দ ‘বাঙলা’। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে তৌকীর আহমেদ নির্মাণ করেন ‘ফাগুন হাওয়ায়’। এতে অভিনয় করেন সিয়াম আহমেদ ও নুসরাত ইমরোজ তিশা। তবে এই তিনটি চলচ্চিত্রের কোনোটিতেই ভাষা আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নয় বলে মনে করেন চলচ্চিত্রবোদ্ধারা।

এই তিনটি চলচ্চিত্রের বাইরে চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন সত্তর সালের দিকে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাকে অনুমতি দেয়নি। আরেক বরেণ্য চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন ‘শহীদ আসাদ’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কুমিল্লার এক জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীকে নিয়ে চলচ্চিত্রটির মহরত হয়েছিল। কিন্তু পরে এর কাজ এগোয়নি। কারণ একটাই-তৎকালীন পাক সরকারের অনুমতি না পাওয়া। তার পরও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ ও ‘শহীদ আসাদ’ চলচ্চিত্র দুটি নিয়েই চলচ্চিত্র শিল্পে আশা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার দেড় মাস পর জহির রায়হান রহস্যজনক নিখোঁজ হলে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ হওয়ার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে ‘শহীদ আসাদ’-এর পরিকল্পনা থামিয়ে আমজাদ হোসেন ব্যস্ত হয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘সত্যি বলতে একুশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো ছবিই নেই। ‘জীবন থেকে নেওয়া’ সেটাও মূলত স্বাধিকার আন্দোলনের ছবি। এরপর যা হয়েছে তার কোনোটাই পূর্ণাঙ্গ ভাষা আন্দোলনের ছবি নয়। এ ধরনের ঐতিহাসিক গল্পকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এ জন্য বিস্তর গবেষণা দরকার। প্রচুর অর্থলগ্নির বিষয় আছে। মূলত এসব কারণেই ভাষা নিয়ে ছবি হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ জরুরি। আমার কথা হচ্ছে, সরকার তো প্রতি বছরই কোটি কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে সিনেমার জন্য। সেখানে ভাষা নিয়ে সিনেমা নির্মাণের জন্য বাজেট রাখা দরকার বলে মনে করি। অনুদান কমিটিতে যারা থাকেন, তারা প্রত্যেকেই অত্যন্ত বিজ্ঞ মানুষ। তাদের মাধ্যমেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে বছরে অন্তত একটি করে ছবি অনুদান পেতে পারে। সেটা তো হচ্ছে না। সময় এসেছে এ ক্ষেত্রে সরকারের একটু নজর দেওয়ার।’

মহান ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কেন এমন দীনতা? তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করার মতো প্রযোজক পাওয়া দুষ্কর। সব প্রযোজকই লগ্নিকৃত অর্থ ফেরত চান। কিন্তু এ ধরনের বিষয় নিয়ে নির্মিত ছবি বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে দর্শক পায় না বললেই চলে। সে ক্ষেত্রে সরকার অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তেমন কিছু এখনো দৃশ্যমান নয়। এ কারণে দেশ, দেশের মানুষ ও নতুন প্রজন্মের জন্য তেমন কোনো ছবি হচ্ছে না যেখানে ভাষা আন্দোলনের গল্প তুলে ধরা হবে।

‘ফাগুন হাওয়ায়’ পরিচালক তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা বেশ ব্যয়বহুল আর সময়সাপেক্ষ বিষয়। এ অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণ হওয়া প্রয়োজন। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের সার্বিক অবস্থাই আসলে নাজুক।’ তৌকীর আরো বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি দুটো মাধ্যমেরই চলচ্চিত্র শিল্পটার দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। কনটেন্ট নিয়ে ভাবারও সময় এসেছে। চলচ্চিত্রের সামগ্রিক জটিলতা না ছুটলে বিশেষ ছবি তৈরি হওয়ার আশা করা ভুল হবে।’

সেরাজুম মনিরা 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads