• শনিবার, ৬ জুন ২০২০, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
হোঁচট খাবে বিনিয়োগ

সংগৃহীত ছবি

বাণিজ্য

তহবিলের সংকট বাড়বে

হোঁচট খাবে বিনিয়োগ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

তহবিল সংকট প্রকট হবে ব্যাংকিং খাতে। আর এই সংকট প্রকট হলে ধাক্কা আসবে বিনিয়োগে, যা চূড়ান্তভাবে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সরকার এক অঙ্ক সুদে ঋণ দিয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিকল্পনা নিয়েছে। সেটিও ব্যাহত হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাত নিয়ে বিশদ পরিকল্পনা দরকার। সাময়িক সমাধান থেকে বড় সাফল্য আসবে না। আর বড় সাফল্য এলেও সেটি টেকসই হবে না। বিনিয়োগের বড় অংশ আসে সঞ্চয় থেকে। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, আমানতের সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করবে তা কার্যকর শুরু হয়ে গেছে। এটি অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। অপ্রচলিত খাতে চলে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থ পাচার আরো বাড়বে। এতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়ে অর্থনীতি আরো ধীর হয়ে পড়বে। তবে আবাসন খাত, জমি কিংবা ফ্ল্যাটে পুঁজির জোগান বাড়বে।

সূত্রগুলো বলছে, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখান থেকে কর আদায় নিশ্চিত করতে নতুন আদেশ জারি করেছে। ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট বাড়ছে। ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও টাকা রাখতে চাইছেন না অনেকে। শেয়ারবাজারের টালমাটাল অবস্থার কারণে সেখানেও আস্থা নেই বিনিয়োগকারীদের। এর মধ্যে ব্যাংক আমানতে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৬ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার উদ্যোগ কার্যকর হলো। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, আমানতকারীরা টাকা রাখবেন কোথায়।

জনগণের আমানত অপ্রচলিত খাতে চলে গেলে ব্যাংকে তারল্য সংকট আরো বাড়তে পারে। ফলে নতুন করে ডেসটিনি, ইউনিপে, ইউনিরুট, আজিজ কো-অপারেটিভ, যুবকের মতো অনেক ধান্দাবাজ প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠবে। ফলে ঋণের সুদ কমানোর লক্ষ্যে শুধু আমানতের সুদ কমানোর ওপর জোর না দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায় ও বাহুল্য খরচ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে পরিচালনা ব্যয় কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটি ভাবতে হবে ব্যাংকগুলোকে। ব্যাংকগুলোকে উচ্চ মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা পরিহার করতে হবে।

আলাপকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের বেশি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে জিডিপির কমপক্ষে ৩৪ শতাংশ। আর বিনিয়োগের বড় একটি অংশ আসে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় থেকে। ফলে আমানতের সুদ ৬ শতাংশ কার্যকর হলে সঞ্চয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

তিনি আরো বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ঋণের সুদ কমাতে হবে। এ জন্য আমানতের সুদ কমালেই হবে না; বরং উচ্চ খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ঋণ ও আমানতের মধ্যে সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) কীভাবে কমানো যায় সেটি দক্ষতার সঙ্গে চূড়ান্ত করতে হবে। তাতে ঋণগ্রহীতা ও আমানতকারী উভয়েই উপকৃত হবেন।

অনুসন্ধান বলছে, বর্তমানে সরকারের নীতি আমানতকারীদের সহায়ক নয়। মূল্যম্ফীতির অভিঘাত, ব্যাংকে মেয়াদি আমানতে কম সুদহার, মুনাফায় উচ্চ হারে উৎসে কর কর্তন, অ্যাকাউন্টে টাকা জমার ওপর আবগারি শুল্ক, ব্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ আরোপ করে সঞ্চয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়। গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট আমানত রয়েছে ১১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ ৬ হাজার কোটি মেয়াদি আমানত। মাত্র ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা রয়েছে চলতি হিসাবে। ব্যাংক খাতের মোট আমানতের সিংহভাগ বেসরকারি খাতের। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে উদ্বৃত্ত অর্থ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে আমানতের গড় সুদহার রয়েছে ৫ দশমিক ৭১ শতাংশে। চলতি আমানত এবং তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর ও তিন বছর মেয়াদি আমানতসহ গড় সুদহার এ রকম দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশে টাকা রেখে দুই-আড়াই শতাংশ বা তার চেয়ে কম সুদ পাওয়ার নজির আছে। তবে ওইসব দেশে মূল্যস্ফীতি খুব কম থাকায় এবং বিনিয়োগ করার মতো নির্ভরযোগ্য অনেক উপায় থাকায় সেখানে সঞ্চয়কারীদের ঠকতে হয় না। গত ডিসেম্বরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এখন ধরা যাক, আমেনা বেগম এক লাখ টাকার মেয়াদি আমানত রাখলেন। ৬ শতাংশ হারে বছর শেষে তিনি পেলেন এক লাখ ৬ হাজার টাকা। তবে মূল্যস্ফীতির কারণে এখন এক লাখ টাকায় যে পণ্য কিনতে পারছেন, এক বছর পরে তা কিনতে খরচ করতে হবে এক লাখ ৫ হাজার ৭৫০ টাকা। এর মানে, নিট তিনি পেলেন এক লাখ আড়াইশ টাকা। তবে টিআইএন না থাকার কারণে পুরো ৬ হাজার টাকা মুনাফার ওপর তাকে উৎসে কর দিতে হবে ৬শ টাকা। এর ওপর বছরে দুই দফায় চারশ টাকা চার্জ কেটে নেবে ব্যাংক। ফলে এক লাখ টাকা রেখে বছর শেষে গ্রাহক পাচ্ছেন ৯৯ হাজার ২৫০ টাকা। তবে এই হিসাব মানতে রাজি নন ব্যাংকাররা। 

ব্যাংকিং খাতে খারাপ পরিস্থিতি বিদ্যমান। বেসরকারি খাতে ঋণ পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। একক মাস হিসেবে নভেম্বরের তুলনায় গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে দশমিক ৪ শতাংশ। গত নভেম্ব্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

অপরদিকে সরকারের ঋণ বেড়েছে। সর্বশেষ হিসাব মতে, চলতি অর্থবছরের সাত মাসে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৫০ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার আরো প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ধার নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে সরকারের ব্যাংক ঋণ দাঁড়াবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এজন্য সম্প্রতি মুদ্রানীতির সংশোধন আনা হয়েছে। সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়ে গেলেও বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান কমে যায়। বেসরকারি খাতে এত কম প্রবৃদ্ধি গত ১৫ বছরের মধ্যে হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের হার কমছে। গত ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। নভেম্বর ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ০৪ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ছিল ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। আগস্টে ছিল ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। যদিও ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। ২০১১ সালে মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৯ দশমিক ১৩ শতাংশে ওঠে। এর আগে ২০০৩ ও ২০০৪ সালে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে নেমেছিল। ২০০৫ সালে এটি বেড়ে ১২ শতাংশে উন্নীত হয়। এরপর একক মাস হিসেবে কখনো বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সিঙ্গেল ডিজিট নামেনি।

এনবিআর হিসাব বলছে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো যাচ্ছে না। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। এই সময় আদায় লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads