• শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ৫ মাঘ ১৪২৪
৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবাসীর লাশ

৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবাসীর লাশ

সংরক্ষিত ছবি

প্রবাস

৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবাসীর লাশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৭ জানুয়ারি ২০১৯

প্রতিদিনই কোনো না কোনো প্রবাসীর মরদেহ আসছে দেশে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করার পর ফিরছে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এসব নায়কদের নিথর দেহ। সদ্য শেষ হওয়া ২০১৮ সালে প্রবাস থেকে দেশে ফিরেছে তিন হাজার ৫৭ জনের মরদেহ, যা গত ৪৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে এসেছে ১০০৮, কুয়েত থেকে ২০১, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২২৮, বাহরাইন থেকে ৮৭, ওমান থেকে ২৭৬, জর্ডান থেকে ২৬, কাতার থেকে ১১০, লেবানন থেকে ৪০ সহ মোট তিন হাজার ৫৭ জনের লাশ দেশে ফিরেছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করে এমন বেশ কয়েকটি সংগঠন, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে প্রবাসে বাংলাদেশিদের মৃতের পরিসংখ্যানের তালিকায় প্রথমে আছে সৌদি আরব। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মালয়েশিয়া। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে আরব আমিরাত, ওমান ও কুয়েত।

এ ছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবাসীর লাশ দেশে গেছে ২০১৮ সালেই। ২০০৯ সালে দুই হাজার ৩১৫ জন, ২০১০ সালে দুই হাজার ২৯৯ জন, ২০১১ সালে দুই হাজার ২৩৫ জন, ২০১২ সালে দুই হাজার ৩৮৩ জন, ২০১৩ সালে দুই হাজার ৫৪২ জন, ২০১৪ সালে দুই হাজার ৮৭২ জন, ২০১৫ সালে দুই হাজার ৮৩১ জন, ২০১৬ সালে দুই হাজার ৯৮৫ জন, ২০১৭ সালে দুই হাজার ৯১৯ জন এবং ২০১৮ সালে তিন হাজার ৫৭ জনের মরদেহ দেশে ফিরেছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন রামরুর এক হিসাবে দেখা গেছে, সর্বশেষ চার বছরে যত প্রবাসীর লাশ এসেছে, তাদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয়েছে আকস্মিকভাবে। প্রবাসীদের অকালমৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, দিনে ১২-১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ধার করে বিদেশ যাওয়ায় টাকা উপার্জনে মানসিক চাপ তাদের মৃত্যুর জন্য অনেকাংশে দায়ী।

প্রবাসী বাংলাদেশি, মৃতদের স্বজন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা স্ট্রোক ও হূদরোগে আক্রান্ত হন। যে বিপুল টাকা খরচ করে বিদেশে যান, সেই টাকা তুলতে অমানুষিক পরিশ্রম, দিনে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপে ভোগেন তারা।

সৌদি আরবে কাজ করা প্রবাসী শ্রমিক শাহিন আলমের বাবা সিদ্দিকুর রহমান মোল্লা বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিবাসী কর্মীরা ঋণ নিয়ে বিদেশে যায়। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পর যে বেতনের কথা তাদের বলা হয়, তা তারা পায় না। এ ঋণের বড় বোঝার চাপ মানসিক চাপের সঙ্গে হাড়ভাঙা পরিশ্রম যোগ হয়। এভাবে শারীরিক ও মানসিক চাপে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান অনেক প্রবাসী শ্রমিক।

অভিবাসন বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, অনেক শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ পায় না। যেসব শ্রমিকের অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং থাকার পরিবেশ ভালো নয় তাদের ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বড় ফ্যাক্টরিতে কাজ করা কিংবা কোম্পানির ভিসা নিয়ে গেলে কাজ এবং থাকার কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু যারা ফ্রি ভিসা নিয়ে সেখানে যাচ্ছে অর্থাৎ যাদের নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই তাদের অনেকেই ঝুঁকিতে পড়েন।

তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রি ভিসায় জনশক্তি পাঠানোর সংখ্যা বেড়েছে। এই ভিসায় যারা যায় তারা থাকে অত্যন্ত মানবেতর পরিবেশে। এদের কাজের কোনো ঠিক নেই। আজকে তাদের নিয়ে যায় খেজুর গাছ পরিষ্কার করাতে, আর আগামীকাল নিয়ে যায় কোনো স্কুলের টয়লেট পরিষ্কার করাতে।

এদিকে প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের সমস্যায় পড়ে বাংলাদেশি দূতাবাসের দ্বারস্থ হলে বেশিরভাগ সময় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায় না।

এ ছাড়া মারা যাওয়া শ্রমিকদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন দেশে স্বজনরা মারা গেলে অনেক ক্ষেত্রে লাশ আনতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। তাদের দাবি, সরকারের উচিত নিহতদের লাশ সহজে আনা ও অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতায় এগিয়ে আসা।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারকেই বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন তারা। বিদেশ গমনের জন্য নির্ধারিত খরচের পরিমাণ কমালে বা সরকারের তরফ থেকে এ বিষয়ে সহায়তা করলে টেনশনে এমন মৃত্যুর হার কমবে বলে মন্তব্য তাদের।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads