• মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৫
ads
তিনি আদর্শ হবেন না কেন?

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্দা আরডান

সংগৃহীত ছবি

বিদেশ

তিনি আদর্শ হবেন না কেন?

  • তপু রায়হান
  • প্রকাশিত ২২ মার্চ ২০১৯

২০১৮ সালে প্রকাশিত এক হিসাব অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রে এ যাবৎকালের বন্দুক হামলায় আট হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ হামলা ঘটেছে স্কুলপড়ুয়াদের ওপর কিংবা মানুষ যখন বিনোদনের জন্য কোথাও জড়ো হয়েছেন সেখানে। দেশটির ‘গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, গেল বছরও সেখানে সপ্তাহে গড়ে দুটি বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আফসোস, সেখানে এ নিয়ে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র। উল্টো হামলাকারী সাদা চামড়ার হলে মোটাদাগে বলে দেওয়া হয়েছে, হামলাকারী মানসিক ‘বিকারগ্রস্ত’। আর হামলাকারী কালো চামড়ার হলে বলে দেওয়া হয়েছে এটা ‘সন্ত্রাসী’ হামলা।

যুদ্ধ আর সন্ত্রাস মাথা চাড়া দেওয়ার এই যুগে মানুষ শুধু মরেই। কারণে মরে, অকারণে মরে। স্কুলে গিয়ে মরে, গান শুনতে গিয়ে মরে, গির্জায় গিয়ে মরে, মসজিদে গিয়েও মরে।

সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুই মসজিদে বন্দুকধারীর হামলায় ৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। এখানে হামলাকারী সাদা চামড়ার অস্ট্রেলীয় নাগরিক ব্রেনটন ট্যারান্ট। অভিবাসী আর ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়ানক বিদ্বেষ আছে তার। বর্ণবাদের চরম দীক্ষায় দীক্ষিত সে। হামলার পরপরই অনেকের মনে হয়েছিল ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুক হামলার ঘটনাগুলোর একটি হবে। হামলাকারীকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে দায় সারবে নিউজিল্যান্ড সরকার। কিন্তু দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দিলেন, এটি একটি সন্ত্রাসী হামলা। হামলার নিন্দা জানালেন, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ালেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান এমন ঘটনার পরও যেখানে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করতে পারেননি সেখানে জাসিন্ডা নিলেন কঠোর পদক্ষেপ। তার ইচ্ছায়ই নিউজিল্যান্ড সব ধরনের সেমি-অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র নিষিদ্ধ করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

শুধু তাই নয়, হামলার পর বন্ধ থাকা মসজিদ দুটিতে আজ আবারো জুমার নামাজ হবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন (টিভি এনজেড) ও রেডিওতে (রেডিও এনজেড) জুমার নামাজের আজান সম্প্রচার করবে কর্তৃপক্ষ। জাতীয়ভাবে পালন করা হবে দুই মিনিটের নীরবতা।

গভীর শোকাবহ ঘটনার স্মরণে প্রথাগতভাবে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হলেও শুক্রবারের ওই বিয়োগান্ত ঘটনার মাত্রা বিবেচনায় নিউজিল্যান্ডে দুই মিনিটের নীরবতা পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোও নেওয়া হয়েছে জাসিন্ডা আরডের্নের একান্ত ইচ্ছায়। গত বুধবার এই সিদ্ধান্তের কথা সংবাদমাধ্যমকে জানান জাসিন্ডা। ওই সময় তিনি ডানপন্থি বর্ণবাদী আদর্শ নির্মূলের লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে লড়াইয়ের আহ্বানও জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি অভিবাসন বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্ণবাদ উসকে দেওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ওইদিন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এটা (হামলাকারী) ছিল অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। কিন্তু বলা যাবে না নিউজিল্যান্ডে আমাদের এমন কোনো আদর্শ আছে, যা নিউজিল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ক্ষতি করতে পারে। তিনি বলেন, যেখানেই এই আদর্শ (বর্ণবাদ) রয়েছে, সেখানেই তা দূর করারও দায়িত্ব রয়েছে। এ ধরনের (হামলার) পরিবেশ যাতে তৈরি না হতে পারে তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর জাসিন্ডা আরডের্নের এমন অবস্থান তাকে পরিণত করেছে বিশ্বকে শান্তির পথে নেতৃত্ব দেওয়ার দূত হিসেবে। বিশ্ব গণমাধ্যম তাকে নিয়ে ছাপছে নানা আঙ্গিকের বিশেষ প্রতিবেদন, নিবন্ধ। সেইসব প্রতিবেদন বা নিবন্ধে উঠে এসেছে জাসিন্ডার আজকের অবস্থানে উঠে আসার গল্প।

যোগাযোগের ছাত্রী জাসিন্ডা স্নাতক শেষ করে নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির একজন সংসদ সদস্যের অধীনে গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে ২০০৫ সালে পাড়ি জমান ব্রিটেনে। আড়াই বছর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মন্ত্রিসভার দফতরে চাকরি করেন। ২০০৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সোশ্যালিস্ট ওয়েলথের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘুরে বেড়িয়েছেন আলজেরিয়া, চীন, ভারত, ইসরাইল, জর্ডান ও লেবানন। ২০০৮ সালে জাসিন্ডা লেবার পার্টি থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েও ১৩ হাজার ভোটে হেরে যান। কিন্তু দেশটির সাংবিধানিক নিয়মে তিনি সংসদে যাওয়ার সুযোগ পান। ২৮ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে জায়গা করে নেন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে। এরপর থেকে রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হয়ে ওঠেন তরুণ জাসিন্ডা।

এর মধ্যে ২০১২ সালে মন দেওয়া-নেওয়া শুরু করেন টেলিভিশন প্রেজেন্টার ক্লার্ক গেফোর্ডের সঙ্গেও। এক ফাঁকে পেতে বসেন সংসারও। কিন্তু রাজনীতিই তার প্রধান ধ্যান বলেই ২০১৭ সালে লেবার পার্টির উপপ্রধান নির্বাচিত হন জাসিন্ডা।

এরপর নির্বাচনের দুই মাস আগে দলটির প্রধান পদত্যাগ করলে সেই ভারও চাপে তার কাঁধে। নির্বাচনী প্রচারে তরুণদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হন তিনি। দেশটিতে তিনি পরিচিত হন ‘জাসিন্ডামেনিয়া’ নামে।

মাত্র দু’মাসের নেতৃত্বে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করেন জাসিন্ডা। ২০১৭ সালে ৩৮ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। শুধু তাই নয়, নিউজিল্যান্ডের ১৫০ বছরের ইতিহাসেও তিনি সবচেয়ে কম বয়সী সরকারপ্রধান।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই তিনি জলবায়ু পরিবর্তন ও শিশু দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডের সরকার হবে সহানুভূতিশীল। তার এই অবস্থানের কারণে ২০১৮ সালে ‘ফোর্বসের পাওয়ার উইমেনের’ তালিকায় জায়গা করে নেন তিনি। আছেন টাইম ম্যাগাজিনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায়ও।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর জাসিন্ডা গড়েন নতুন আরেকটি ইতিহাস। ২০১৮ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর পর বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সন্তানের জন্ম দেন আরডের্ন। এজন্য মাত্র ছয় সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছিলেন তিনি।

এরপরই তিনি সন্তান কোলে জাতিসংঘে উপস্থিত হয়ে বিশ্বে আরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। বিশ্বে প্রথমবার কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের কক্ষে সন্তান নিয়ে বক্তৃতা দিতে যান জাসিন্ডা আরডের্ন। গত বছর নেলসন ম্যান্ডেলা পিস সামিটে অংশ নিয়েও বিশ্ব গণমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছেন। তিনি বক্তৃতা দেওয়ার সময় সন্তান ছিল সঙ্গী ক্লার্ক গেফোর্ডের কোলে।

তবে বিশ্ববাসীর নজরে আদর্শ নেতা হিসেবে তার আবির্ভাব ঘটে ক্রাইস্টচার্চ ঘটনার পর। তাকে নতুন করে চেনে বিশ্ব। এ ঘটনার অভিযুক্তকে কোনো কার্পণ্য না করেই সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হিসেবে অভিহিত করেন তিনি। দ্রুত অস্ত্র আইন পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। ঘটনার পর প্রতিদিনই ছুটে যাচ্ছেন নিহতদের স্বজনদের কাছে। তাদের জড়িয়ে ধরছেন, সমব্যাথী হচ্ছেন। শুধু তাই নয়, মুসলমানদের সঙ্গে একাত্মতার প্রকাশ হিসেবে তিনি একাধিক দিন হিজাব পরে বেরিয়েছেন।

মুসলমানদের উদ্দেশে ঘোষণা দিয়েছেন, নিউজিল্যান্ড সন্ত্রাসের রাষ্ট্র নয়। এখানে মুসলমানদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এই দেশে তারা স্বাধীনভাবেই থাকতে পারবেন।

আর গত ১৯ মার্চ সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিশ্বকে আবার চমকে দেন তিনি। ভ্রাতৃত্ব হূদয়ে ধারণ করেই বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সম্বোধন করেন তিনি।

এ সময় তিনি জানান, ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলাকারীর নাম তিনি কখনো মুখে আনবেন না। একই সঙ্গে তিনি দেশের জনগণকেও তার নাম মুখে না আনার আহ্বান জানান।

এ সময় তিনি ওই হামলার ভিডিও শেয়ার করা বন্ধ করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে আরো কাজ করার আহ্বান জানান। আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিউজিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী হামলাকারী পূর্ণ শাস্তির মুখোমুখি হবে।

জাসিন্ডার এই অবস্থানের কারণেই তিনি আজ আদর্শ নেতার স্বীকৃতি পাচ্ছেন।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads