• সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬
ads
কাশ্মীরীদের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ভয়াবহতা

ছবি : সংগৃহীত

বিদেশ

কাশ্মীরীদের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ভয়াবহতা

  • অনলাইন ডেস্ক
  • প্রকাশিত ৩০ আগস্ট ২০১৯

সংবিধান থেকে বিশেষ মর্যাদার ব্যবস্থা বাতিল করার পর ভারত শাসিত কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ওপর মারধর এবং নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে অনেকদিন আগে থেকেই। সেখানাকার একাধিক গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বিবিসি সংবাদদাতা গ্রামবাসীদের অভিযোগ, তাদেরকে রড ও লাঠি দিয়ে মারা হয়েছে এবং বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে। কাশ্মীরীদের ওপর এমনই ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেছেন বিবিসির সংবাদদাতা সামির হাশমি। 

সম্প্রতি সামির হাশমি দক্ষিণ কাশ্মীরের অন্তত ৬টি গ্রামে ঘুরেছেন। যেগুলো গত কয়েক বছরে ভারত বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। সেসব গ্রামের সবগুলোর বাসিন্দাদের কাছ থেকেই নির্যাতনের একই ধরণের বক্তব্য জানতে পারেন সংবাদদাতা।

যদিও সেসব এলাকার ডাক্তার এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে গ্রামবাসীরা সংবাদদাতাকে তাদের শরীরের ক্ষত দেখিয়ে দাবি করেছেন যে, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা।

একটি গ্রামের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন যে, ভারতের সংসদে অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালায় সেনাবাহিনী।

একটি গ্রামের দু'জন বাসিন্দা, যারা সম্পর্কে দুই ভাই, সংবাদদাতাকে বলেন, ওইদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বাড়ি থেকে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে আরও কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে একসারিতে দাঁড় করায়। 

অন্যান্যদের মত নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক ওই দুই ভাইয়ের একজন, ‘তারা আমাদের ব্যাপক মারধর করে। আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি- আমরা কী করেছি? কিন্তু তারা আমাদের কোনও কথাই শোনেনি, কিছু বলেওনি। তারা আমাদের কেবল মারতেই থাকে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘আমার শরীরের প্রতিটি অংশে তারা আঘাত করে। তারা আমাদের লাথি দেয়, লাঠি ও তার দিয়ে মারে, বৈদ্যুতিক শকও দেয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে যখন আমরা অজ্ঞান হয়ে যাই তখন বৈদ্যুতিক শক দিয়ে আমাদের জ্ঞান ফিরিয়ে আনে।’

‘লাঠি দিয়ে মারার সময় আমরা যখন চিৎকার করছিলাম, তখন আমাদের মুখ বন্ধ করার জন্য মুখে কাদা ভরে দেয়।’

‘আমরা তাদের বারবার বলতে থাকি যে আমরা নির্দোষ। তাদের জিজ্ঞাসা করি, কেন আমাদের নির্যাতন করছে। কিন্তু তারা এসব কোনও কথাই শোনেনি।’

‘নির্যাতনের একপর্যায়ে তাদের বলি যে, আমাদের মেরো না, এর চেয়ে গুলি করো। সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুনয় করি যেন, আমাদের উঠিয়ে নেয়।’

গ্রামের আরেকজন তরুণ জানান, কিশোর ও তরুণদের মধ্যে কে কে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে তাদের নাম বলতে সেনা সদস্যরা তাকে বারবার চাপ দিতে থাকে। এই তরুণ ও কিশোররা বিগত কয়েকবছর ধরে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের প্রতিমূর্তি হিসেবে অনেকটাই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

ওই তরুণটি সেনা সদস্যদের বলেন যে, তিনি তাদের নাম জানেন না। তারপর সেনা সদস্যরা তার চশমা, জুতা ও কাপড় খুলতে নির্দেশ দেয়।

‘আমার গায়ের কাপড় খোলার পর তারা আমাকে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটায়, প্রায় দু'ঘন্টা যাবত। যখনই অজ্ঞান হয়ে যেতাম, তারা বৈদ্যুতিক শক দিতো আমার জ্ঞান ফেরানোর জন্য।’

‘তারা যদি আবারও আমার সঙ্গে এরকম করে, তাহলে আমি যে কোনওভাবে এর প্রতিরোধ করবো। প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে তুলে নেবো।’

তরুণটি বলে, সৈন্যরা তাকে সতর্ক করে দেয় যে, গ্রামের কেউ যদি কোনও ধরণের বিক্ষোভে অংশ নেয় তাহলে তাদের পরিণতিও একই হবে। গ্রামের মানুষ মনে করে, সেনা সদস্যরা এরকম নির্যাতন করেছে যেন গ্রামবাসীরা কোনও ধরণের বিক্ষোভে অংশ নিতে ভয় পায়।

এদিকে বিবিসিকে দেয়া এক বিবৃতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনা 'অভিযোগ অনুযায়ী কোনও নাগরিকের সঙ্গে জবরদস্তি করেনি' তারা।

‘এ ধরণের কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। এই অভিযোগগুলো শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা থেকে উদ্ধৃত,’ বলে দাবি করেন সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল আমান আনন্দ।

বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হলেও 'সেনাবাহিনীর নেয়া পদক্ষেপের কারণে নিহত বা আহত হওয়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি' বলে মন্তব্য করেন ভারতীয় এই কর্নেল।

বিবিসি'র সংবাদদাতা বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখতে পান যে, সেখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। গ্রামবাসীদের ভাষায়, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা 'মুক্তিযোদ্ধা'।

কাশ্মীরের ওই অঞ্চলে একটি সেনা ক্যাম্প রয়েছে এবং সেখানকার সেনা সদস্যরা নিয়মিত ভিত্তিতে জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদদের খোঁজে ওই গ্রামগুলোতে তল্লাশি অভিযান চালায়।

তবে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রায়ই সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বন্দ্বের ভুক্তভোগী হতে হয় তাদেরকে।

গ্রামের এক তরুণ জানায়, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের খবর জোগাড় করে না দিলে তার নামে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করা হবে বলে তাকে হুমকি দিয়েছিল সেনা সদস্যরা। পরে এই কাজে অস্বীকৃতি জানালে তাকে এমন নির্যাতন করা হয় যে, দু'সপ্তাহ পার হলেও সোজা হয়ে বিছানায় শুতে পারছে না সে।

তার ভাষায়, ‘এরকম অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবো আমি। তারা আমাদের এমনভাবে মারে যেন আমরা মানুষ না, পশু।’

নির্যাতনের শিকার আরেকজন বলেন, অন্তত ১৫-১৬ জন সেনা সদস্য তাকে মাটিতে ফেলে রড, লাঠি, তার দিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। ‘আমার জ্ঞান প্রায় ছিলই না। তারা আমার দাড়ি ধরে এত জোরে টানে যে আমার মনে হচ্ছিল যে, আমার দাঁত উপড়ে আসবে।’

পরে জ্ঞান ফিরলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একজনের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে, একজন সৈন্য তার দাড়ি পুড়িয়ে দিতে চাইলেও আরেকজন সৈন্য বাধা দেয়ায় শেষপর্যন্ত তার দাড়ি পোড়ানো হয় নি।

আরেকটি গ্রামে সংবাদদাতা সামির হাশমি এক তরুণের দেখা পান। যার ভাই দু'বছর আগে ভারত শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করা হিজবুল মুজাহিদিন গোষ্ঠীতে যোগ দেয়। তরুণটি জানায়, একটি ক্যাম্পে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং সেখান থেকে সে ‘ভাঙা পা’ নিয়ে বের হয়।

সে বলে, ‘আমার হাত পা বেঁধে উপুড় করে ঝুলায় তারা। এরপর দুই ঘন্টার বেশি সময় ধরে আমাকে মারতে থাকে।’

কিন্তু কোনও ধরণের অবৈধ কার্যক্রমের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। বিবিসিকে দেয়া বিবৃতিতে সেনাবাহিনী মন্তব্য করে যে, তারা ‘পেশাদার একটি সংস্থা, যারা মানবাধিকারের বিষয়টি বোঝে এবং সম্মান করে’ এবং তারা ‘অভিযোগগুলো দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত করছে।’

বিবৃতিতে তারা বলে যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গত পাঁচ বছরে আনা ৩৭টি অভিযোগের ২০টিই ‘ভিত্তিহীন’ হিসেবে পেয়েছে তারা। ওই অভিযোগগুলোর মধ্যে ১৫টির তদন্ত হচ্ছে এবং ‘শুধুমাত্র ৩টি অভিযোগ তদন্ত করার যোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছে তারা।

ওই বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

তবে গত তিন দশকে কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শতাধিক অভিযোগের সংকলন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দু'টি কাশ্মীরী মানবাধিকার সংস্থা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন কাশ্মীরীদের বিরুদ্ধে হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও স্বাধীনভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্তের উদ্দেশ্যে তদন্ত কমিশন গঠন করার আহ্বান জানিয়েছে। ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা রক্ষীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে ৪৯ পাতার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা।

জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনটিও প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

কাশ্মীরে আসলে কী হচ্ছে?
কাশ্মীর একটি উপত্যকাময় অঞ্চল, যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই দাবি করে। যদিও কোনও দেশই ওই অঞ্চল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে না। কাশ্মীর ইস্যুতে দুই দেশ একাধিকবার যুদ্ধ করেছে এবং বেশ কয়েকবার সীমিত পরিসরে দ্বন্দ্বেও জড়িয়েছে।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের আগ পর্যন্ত কাশ্মীরের ভারত নিয়ন্ত্রিত অংশে (জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য) আংশিক স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল।

কিন্তু গত ৫ অগাস্ট ভারত সরকার অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপের ঘোষণা দেয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তার ক্ষমতাসীন বিজেপি'র যুক্তি ছিল- ভারতের অন্যান্য এলাকার মতই শাসন ব্যবস্থা থাকা উচিত কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও।

তারপর থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। চলছে বিক্ষোভ। সেখানে হওয়া কিছু কিছু বিক্ষোভ সহিংস রুপও নিয়েছে। পাকিস্তান এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং সঙ্কট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। সূত্র- বিবিসি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads