• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬
ads
‘মিথ্যা অভিযোগে’ ফেরত আসছেন শ্রমিকরা

সংগৃহীত ছবি

প্রবাস

‘মিথ্যা অভিযোগে’ ফেরত আসছেন শ্রমিকরা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ২৯ অক্টোবর ২০১৯

চলতি মাসেই সৌদি আরব থেকে ৮০৪ জন শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছেন। মিথ্যা অভিযোগে এসব শ্রমিককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত আসা শ্রমিকরা বলছেন, তাদের অনেকেরই আকামা বা কাজের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস শ্রমিক ফেরত পাঠানো বিষয়ে চিন্তিত এবং সৌদি সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে তারা কথা বলেছেন। সর্বশেষ গত শুক্র ও শনিবার সৌদি আরব থেকে সাড়ে তিন শতাধিক শ্রমিককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। বাংলাদেশের প্রবাসী

 কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংস্থা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহযোগিতায় তারা দেশে ফেরত এসেছেন।

এদের একজন সিরাজগঞ্জের শহীদুল ইসলাম যিনি এ বছরের জানুয়ারিতে জেদ্দায় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে নিয়োগপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। এখনো তার ভিসার মেয়াদ আছে আরো তিন মাস। তিনি বলেন, আমি মার্কেটে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে বের হবার পরই পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। সাতদিন সেখানকার জেলে থাকার পর দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। কোনো কথা শোনেনি। কিন্তু আমার আকামার মেয়াদ আছে ২০২০ সালের জানুয়ারির ৩০ তারিখ পর্যন্ত।

গত শুক্রবার ফেরত আসা চট্টগ্রামের আবদুল্লাহ আল নোমানের কাজের বৈধ অনুমোদন বা আকামা শেষ হতে আরো কয়েক মাস বাকি। তার মা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তার ছেলেকে কপর্দকশূন্য অবস্থায় দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আমার ছেলের আকামার মেয়াদ শেষ হতে সময় বাকি আছে। কিন্তু তার মালিক কাগজপত্র বৈধ করে দেওয়ার কথা বলে ঘোরাচ্ছেন, করে দিচ্ছেন না। এদিকে ছেলে হঠাৎ করে গ্রেপ্তার হয়ে চারদিন জেল খেটে দেশে ফেরত এসেছে, কিছু নিয়ে আসতে পারেনি।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক বলছে, ২০১৯ সালে সৌদি আরব থেকে ১৮ হাজার শ্রমিক দেশে ফিরেছেন, এদের মধ্যে এক হাজারের বেশি নারী শ্রমিকও রয়েছেন।

কী বলছে বাংলাদেশ দূতাবাস : সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, শ্রমিক হেনস্তা ও ফেরত আসা বিষয়ে তারা চিন্তিত এবং দেশটির সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে তারা কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তারা যেসব কোম্পানিতে কাজ করতেন সেসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দূতাবাসকে জানিয়েছে এদের অনেকে আকামার আইন ভেঙেছেন, অর্থাৎ এক প্রতিষ্ঠানে কাজের অনুমতিপত্র নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। আবার কেউ নিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তিনি আরো বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন। কিন্তু এর আগে আমরা বেশ কয়েকবারই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখেছি, সৌদি আরবের আইনে পরিষ্কার করে বলা আছে সৌদি আরবে যে ভিসাতে আসবেন ঠিক সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই নিজের কাজের বাইরে অন্য জায়গায় কাজ করছেন বা অবস্থান করছেন। সেসব তারা প্রমাণসহ আমাদের দেখিয়েছেন।

ঢাকায় পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে এখন এ সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

এদিকে ফেরত আসা শ্রমিকদের কয়েকজন অভিযোগ করেন, তাদের যে কাজের কথা বলে নেওয়া হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি কাজ করানো হতো। কারো অভিযোগ তাদের নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না।

নির্যাতনের অভিযোগ : শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানোর অভিযোগও শোনা গেছে এর আগে। সে বিষয়ে রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেন, এসব সমস্যার ক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের উচিত সবার আগে বিষয়টি দূতাবাসকে জানানো। তিনি বলেন, সৌদি আরবের শ্রম আইন খুবই শক্ত, নিয়োগদাতা এবং কর্মী উভয়ের জন্যই। নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করানো হলে আইন আছে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা পদক্ষেপ নিই, লেবার কোর্টে যাই। তাদের ফাইন (জরিমানা) করা হয় এবং ওদের জেলও হয়।

গোলাম মসিহ বলেন, সমস্যা হলে আমাদের জানাতে হবে; কিন্তু তা না করে এক কোম্পানি ছেড়ে অন্য কোম্পানিতে যাওয়াটা তো পুরোপুরি বেআইনি।

সৌদি আরবে কাজ করতে যাওয়ার আগে একজন শ্রমিককে যদি সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে ঠিকমতো জানানোর ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে এ সমস্যা অনেকটাই সমাধান করা যাবে বলে তিনি মনে করেন।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে অনেক শ্রমিকই প্রতারণার শিকার হন। এক প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে যাওয়া কিংবা বৈধ কাগজপত্রের মেয়াদ শেষের পরও সে দেশে থেকে যাওয়ার চেষ্টা; এগুলো প্রতারণার শিকার হওয়ার কারণেও ঘটে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, যেমন অনেক শ্রমিককে বলা হয়েছে, ফ্রি ভিসার কথা, মানে তারা যেখানে খুশি কাজ করতে পারবে। কিন্তু সৌদি আরবে তো আইন হচ্ছে, কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে গেলে তাকে সেখানেই কাজ করতে হবে। ফলে যে জানত না সে কোনো কারণে এক নিয়োগকর্তার বদলে আরেক জায়গায় কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়ে ফেরত আসেন। অনেককে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ফিরতে হচ্ছে, খরচের টাকাও তুলতে পারেননি তারা। শরিফুল হাসান বলেন, আরেকটা কারণ হলো, অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করে গেছে একজন; কিন্তু তার মেয়াদ হয়তো দুই বা তিন বছর। এই সময়ে সে যে টাকা খরচ করে গেছে, তা তুলতে পারে না। ফলে আকামার মেয়াদ শেষেও সে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করে। এভাবেও সে ওই দেশে গ্রেপ্তার হয়, পরে দেশে ফেরত পাঠানো হয় তাকে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারকে উদ্যোগ নিয়ে এসব অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।

অভিবাসন খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর পরিচালক সি আর আবরার বলেন, যে কাজের কথা বলে নেওয়া হয়, তা দেওয়া হয় না। তাই বাধ্য হয়েই অন্য কোনো কাজের দিকে যান কর্মীরা। বৈধভাবে গিয়ে অবৈধ হয়ে পড়ার বিষয়টি ভালো করে খতিয়ে দেখা উচিত সরকারের।

দুটি নির্দিষ্ট কারণে সৌদি আরব থেকে শ্রমিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশে অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান। তিনি বলেন, বৈধ অনুমতিপত্র নেই এমন শ্রমিকদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। এ ছাড়া অনেককে তাদের নির্ধারিত কাজের পাশাপাশি শাকসবজি বিক্রি বা হকারের কাজ করার কারণে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

তবে বৈধ অনুমোদন থাকার পরও অনেক শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানোর কথা স্বীকার করে শামীম বলেন, সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাসের বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত।

বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের বড় অংশটি কাজ করেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। কিন্তু শ্রমিক ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রেও সৌদি আরব এ বছর শীর্ষে রয়েছে। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নানা কারণে মোট ৩৫ হাজার শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি ফেরত এসেছেন সৌদি আরব থেকে।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads