• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads

স্বাধীনতা পদক-২০১৮ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

পিআইডি

বাংলাদেশ

নিজস্ব সম্পদ দিয়েই আত্মনির্ভরশীল হবে বাংলাদেশ : প্রধানমন্ত্রী

  • বাসস
  • প্রকাশিত ২৫ মার্চ ২০১৮

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি হিসেবে বাংলাদেশ কারো কাছে হাত পেতে নয় বরং বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে এবং নিজস্ব সম্পদ দিয়েই আত্মনির্ভরশীল হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ একদিন জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত দেশ হিসেবেই গড়ে উঠবে এবং বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে। কারো কাছে হাত পেতে নয়, আমাদের যতটুকু সম্পদ তাই দিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যাব এবং এদেশকে আমরা আরো সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যাব।’

শেখ হাসিনা রবিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত স্বাধীনতা পদক-২০১৮ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি চাই আমাদের স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা নিয়ে এই বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, সে যাত্রা যেন থেমে না যায়। এই যাত্রা যেন অব্যাহত থাকে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ আর ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

প্রত্যেকটি মানুষেরই রাষ্ট্রের কাছ থেকে তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আর জাতির পিতা আমাদের যে সংবিধান দিয়ে গেছেন সেখানেও এই মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার কথা বলে গেছেন। কাজেই এগুলো পূরণ করা আমাদের কর্তব্য।

শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর কাছে ক্ষমতায় থাকা মানে জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের কর্তব্য পালন করা। আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এই বাংলাদেশকে গড়ে তোলা।

এ বছর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরসহ ১৮ জনকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা এই স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং উন্নয়নসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এই পদক প্রদান করা হয়।

এ বছর যারা স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হয়েছেন তারা হচ্ছেন- স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে মরহুম কাজী জাকির হাসান (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী এস. এম. এ রাশিদুল হাসান (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে শংকর গোবিন্দ চৌধুরী (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে এয়ার ভাইস মার্শাল (অবসরপ্রাপ্ত) সুলতান মাহমুদ (বীর-উত্তম), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে মরহুম এম আব্দুর রহিম (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে প্রয়াত ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লে. মো. আনোয়ারুল আজিম (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে মরহুম হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (শহীদ আসাদ) (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে মরহুম মতিউর রহমান মল্লিক (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক (মরণোত্তর), স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে আমজাদুল হক, কৃষি ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে শাইখ সিরাজ, চিকিৎসায় অধ্যাপক ডা. এ কে. এম ডি আহসান আলী, সমাজ সেবায় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান, সাহিত্যে কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ।

স্বাধীনতা পদক বিজয়ী প্রত্যেকে এবং মরণোত্তর পদক বিজয়ীদের পক্ষে তাঁদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে পদক গ্রহণ করেন।

অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ পুরস্কার বিজয়ীদের পক্ষে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম স্বাধীনতা পদক বিতরণ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং স্বাধীনতা পদক বিজয়ীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেন।

এ পর্যন্ত ২৪৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে। পুরস্কার হিসেবে ৩ লাখ টাকার চেক, ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের একটি পদক ও সনদপত্র প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এবং বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যবৃন্দ, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যগণ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীগণ, হুইপগণ,সংসদ সদস্যগণ, সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিগণ, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধানগণ, বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণ, সিনিয়র সাংবাদিকবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনিতিকবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এই বাংলাদেশকে আমরা উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

তিনি বলেন, আমাদের এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছেন আমরা চেষ্টা করছি তাঁদের সম্মান জানাতে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৮৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। এ বছর ১৮ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হলো। যদিও আমরা জানি যে, আমাদের আরো বহু অবদান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমরাও চেষ্টা করছি খুঁজে খুঁজে বের করতে কারা আমাদের দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রেখে যাচ্ছেন আমরা তাঁদের সম্মানিত করে নিজেরাই সম্মানিত হতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে এবং দেশ ও জাতির প্রতি তাদের কর্তব্যবোধ আরো জাগ্রত হবে এবং তাঁরা এই দেশকে আগামীতে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এলেও জাতির পিতার অবর্তমানে অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। তাঁকে ’৭৫-এর ১৫ আগষ্ট নির্মমভাবে হত্যার পর সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত হয়। অথচ, জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনে যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তুলে তাকে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে যান। আজকে সেখান থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। তবে, যদি জাতির পিতা বেঁচে থাকতেন তাহলে আজকে ’৭৫ এর পর ৪৩ বছর লাগতো না। আরো অনেক আগেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের পর্যায়ে চলে যেতে পারতো।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় আসা বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে এরই মধ্যে সম্মানজনক অবস্থানে এসেছে। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে জাতিসংঘের তিনটি শর্তের মধ্যে দুটো শর্ত পূরণ করা হলেই স্বীকৃতি পাওয়া যায়। আমরা তিনটি শর্ত বড় ব্যবধানে পূরণ করতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, জাতিসংঘের মানদন্ড অনুযায়ী একটি দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) হবে ১,২৩০ ডলার অথবা আরো বেশী। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১০ ডলার। একটি দেশের মানবসম্পদ সূচক, হিউম্যান অ্যাসেটস ইনডেস্ক (এইচএআই) অবশ্যই ৬৬ অথবা বেশী এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেস্ক (ইভিআই) ৩২ অথবা নিচে থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সূচক যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৯ এবং ২৪ দশমিক ৮।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর ইউনেস্কো জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য দলিলের অমূল্য অংশ হিসেবে তাদের মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিষ্টারে অন্তর্ভূক্ত করেছে। ৭ মার্চের ভাষণ তাই এখন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এটি বিশ্বের সম্পদ।

একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির উপর অতর্কিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যে ঘোষণা তৎকালিন ইপিআর-এর (বর্তমান বিজিবি) ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিএনপি-জামাত (২০০৫-০৬) সরকারের সর্বশেষ বছর থেকে বর্তমানে তাঁর সরকারের শাসনে দেশের আর্থ সমাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন- বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার যা বর্তমানে ১,৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ যা বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। জিডিপি ছিল ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ বর্তমানে যা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

রপ্তানীর পরিমান ছিল ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বর্তমানে বর্তমানে যা ৩৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন হয়েছে। জিডিপি’র আকার ছিল ৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা যা বর্তমানে হয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ডাবল ডিজিট থেকে নেমে বছরের এ সময় নাগাদ ৫ দশমিক ৭ ভাগ হয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আমাদের বাজেট অতীতের থেকে চারগুণের বেশী বেড়ে বর্তমানে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা হয়েছে। এডিপি ১৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। বিদ্যুত উৎপাদন ৩২ শ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের উপরে হয়েছে।

তিনি বলেন, যদিও তাঁর সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতা ত্যাগের সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদের পরিমান ছিল ৪ হাজার ৩শ মেগাওয়াট। বিএনপি পরবর্তী ৫ বছরে ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে উল্টো প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট কমিয়ে ফেলে।

বর্তমানে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিতে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বহুমুখী করেছে বলেও উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads