• শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads

সংবাদ সম্মেলনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতারা

ফাইল ফটো

বাংলাদেশ

কোটা আন্দোলনের নেতারা আতঙ্কে

ফের ক্লাস বর্জনের ঘোষণা, শিক্ষক নিয়োগে কোটার ফয়সালা হয়নি

  • অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
  • প্রকাশিত ১৯ এপ্রিল ২০১৮

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় কোটা বাতিলের কথা বলেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোনো আদেশ জারি না করায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রাথমিকের আসন্ন শিক্ষক নিয়োগে নারীসহ বিভিন্ন কোটা থাকবে কি না- তারও ফয়সালা হয়নি। উল্লেখ্য, চলতি মাসেই এ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হবে।

এদিকে, কোটা আন্দোলনের নেতাদের ডিবি পুলিশ চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়েছিল কি না- এ নিয়ে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য আসায় রীতিমতো রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ বলেছিল, ছাত্রদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল। চোখ বাঁধা হয়নি। কিন্তু ছাত্ররা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তাদের চোখ বেঁধে নেওয়া হয়েছিল। পরে আবার বেসরকারি দুটি টেলিভিশনের আলোচনায় কোটা আন্দোলনের একজন নেতা বলেছেন, পুলিশ তাদের চোখ বাঁধেনি। আরেকজন নেতা সদুত্তর দিতে পারেননি।

কোটা আন্দোলনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাড়ি ভাঙচুর ও অন্যান্য ঘটনায় যে চারটি মামলা হয়েছিল, সেটি প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম গতকাল বুধবার শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন আন্দোলনকারীরা। সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলা সাত দিনের মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ বলেছে, অন্যথায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জীবননাশের শঙ্কাসহ নানা আতঙ্কে আছেন কোটা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা। এ কারণে গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হননি সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হাসান আল মামুন। সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক নূর। তবে অনেকেই বলছেন, কোটা আন্দোলনের সাধারণ শিক্ষার্থীরা জামায়াত-শিবিরের ‘খপ্পরে’ পড়েছেন। এ ছাড়া আন্দোলনের নেতারা শিক্ষার্থীদের সামনে এক কথা, টেলিভিশনে গিয়ে আরেক কথা বলায় তাদের সন্দেহের চোখে দেখছেন অনেকে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম একটি অরাজনৈতিক ইস্যুর আন্দোলনে ছাত্ররা কোনো রাজনৈতিক নেতার ছবি নিয়ে মিছিল করেছেন। তাদের অনেকেরই হাতে ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। শুধু তা-ই নয়, আন্দোলনকারীদের মুখে শোনা যায় ‘জয় বাংলা স্লোগানও। তবু আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার পর সরকার যেমন এর পেছনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি আছে বলে অভিযোগ করছে, তেমনি শিক্ষার্থীরাও বলছেন, তাদের আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।

আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী নূরুল হক বলেন, আমরা কোনোভাবেই সরকারবিরোধী নই। আমরা সরকারের প্রত্যেকটি সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই। অথচ মিডিয়ায় এটা এমনভাবে দেখানো হচ্ছিল, আমরা সরকারবিরোধী আন্দোলন করছি। এটা আসলে ভুল। আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ছাত্রী তাসনীম জাহান বললেন, শুরু থেকেই তাদের একটা সচেতন চেষ্টা ছিল, এ আন্দোলনকে যাতে কোনোভাবেই সরকারবিরোধী বলে চিহ্নিত করা না যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা প্রশ্ন উঠে যায়।

প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আশরাফুল আলম খোকন ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দেন, তাতে স্পষ্ট, তারা আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায় থেকে ছাত্রলীগের নেতারাও এখন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন। ‘জামায়াত-শিবির’ এর পেছনে রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন।

চোখ বাঁধা নিয়ে কোটা আন্দোলন নেতাদের ভিন্ন বক্তব্য : আন্দোলনকারী তিন নেতাকে চোখ বেঁধে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে এক নেতা যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা অস্বীকার করেছেন অন্যজন। নূরুল হক জানিয়েছিলেন, গাড়িতে তুলে তাদের চোখ বাঁধা হয়েছিল। তবে তুলে নেওয়া আরেকজন ফারুক হাসান জানিয়েছেন, চোখ বাঁধার কোনো ঘটনা ঘটেনি।

ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার ফারুক হাসান ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের বিশেষ সংবাদ এডিটরস পিকে অংশ নিয়ে জানান, তাদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়ার কথা সত্য নয়। তিনি বলেন, তাদের চোখ বাঁধা হয়নি, এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।

কোটা আন্দোলনের এ নেতা বলেন, চোখ বাঁধার ব্যাপারটা, ওইভাবে চোখ বাঁধা হয়নি। আমাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি বারবার বলেছি, আপনাদের যদি কোনো জিজ্ঞাসাবাদ বা কোনো ধরনের সহযোগিতা দরকার হয়, আমরা তা করতে প্রস্তুত। সুতরাং আমাদের বললেই আমরা চলে যেতাম। এখানে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে কোটা সংস্কারের দাবিতে তুমুল আন্দোলনের মুখে গত ১২ এপ্রিল ‘কোনো কোটা থাকার দরকার নেই’ বলে সংসদে মত দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ছাত্ররা রাজপথ থেকে উঠে যান। এর মধ্যে কোটা আন্দোলনের চার নেতা হাসান আল মামুন, রাশেদ খান, ফারুক হাসান ও নূরুল হক নূরের শিবির-সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় একটি জাতীয় দৈনিকে। পরে অবশ্য সেই দৈনিকটি ওই সংবাদ তুলে নেয়।

ফারুকের চোখ বাঁধার কথা অস্বীকার করার বিষয়ে জানতে চাইলে এ অভিযোগ তোলা নূরুল হক নূর তার বক্তব্যে অটল থাকেন। তিনি বলেন, আমাদের চোখ বেঁধে নিয়েছে এটাই সত্য। সে হয়তো ভয়ে এ কথা বলেছে।

আন্দোলনের আরেক নেতা রাশেদ খান সোমবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন একাত্তরের এক অনুষ্ঠানে সরাসরি যুক্ত হয়ে বিব্রতকর অবস্থানে পড়েন। ২০১৩ সালে তার নারী অধিকারবিরোধী পোস্ট এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়া-সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে রাশেদ খান দাবি করেন, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছিল। কিন্তু বারবার একজনের আইডি হ্যাক হয় কি না- এমন প্রশ্নেরও জবাব দিতে না পেরে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে যান। এরপর থেকে আন্দোলন নিয়ে আর কথা বলতে দেখা যায়নি রাশেদ খানকে।

মামলা প্রত্যাহার না করলে সারা দেশে ফের ক্লাস বর্জন : কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সরকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা মামলা সাত দিনের মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। অন্যথায় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। গতকাল বুধবার বিকাল সোয়া ৪টায় ঢাবি গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন থেকে এ দাবি জানান পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক নূর। সেখানে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান, ফারুক হাসান প্রমুখ। লিখিত বক্তব্যে নূর বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলার ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের খবর ও ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষীর তথ্য নিয়ে অতি দ্রুত জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করছি। অধিকতর তদন্ত ও সহায়তার স্বার্থে আমরা ঢাবি প্রশাসন ও পুলিশকে আরো সাত দিনের সময় দিয়ে মামলা প্রত্যাহার চাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও নেতৃত্বদানকারীদের নানা রকম ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে দাবি করে নূরুল হক বলেন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে আমাদের নামে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তাই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ও সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি এবং কোটা বাতিলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অতি দ্রুত প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।

উপাচার্যকে ১৯ শিক্ষকের খোলা চিঠি : কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ শিক্ষক। গতকাল বুধবার বিভিন্ন বিভাগের এই শিক্ষকদের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

বিবৃতি দাতারা হলেন এমএম আকাশ, গীতি আরা নাসরীন, ফাহমিদুল হক, মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, সামিনা লুৎফা, মোহাম্মদ আজম, মোশাহিদা সুলতানা, কাজী মারুফুল ইসলাম, রোবায়েত ফেরদৌস, সায়মা আহমেদ, মুনাসির কামাল, সাজ্জাদ এইচ সিদ্দিকী, রুশাদ ফরিদী, মো. সেলিম হোসেন, হুমায়ুন কবীর, আবদুর রাজ্জাক খান, সালমা চৌধুরী, দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন ও অতনু রাব্বানি। তারা বুধবার উপাচার্যের সঙ্গে দেখাও করেছেন জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘উপাচার্য মহোদয় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি যথাযথভাবে দেখভাল করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।’

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads