• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

বাংলাদেশ

রোহিঙ্গায় প্রকৃতির সর্বনাশ

কাটা হচ্ছে ৩৩ পাহাড়, হাত গুটিয়ে বন বিভাগ

  • জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, টেকনাফ
  • প্রকাশিত ২৫ এপ্রিল ২০১৮

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার বাস এখন কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার বেশ কিছু পাহাড় ও সেগুলোর পাদদেশে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক বিপর্যয়ে পড়তে পারে সেখানে ঝুপড়ি ঘরে থাকা এসব রোহিঙ্গা। এ কারণে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ব্যানারে উখিয়ার অন্তত ৩৩টি পাহাড় কেটে বসবাস উপযোগী করা হচ্ছে। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও যেন অসহায়ের মতো হাত গুটিয়ে বসে আছে বন বিভাগ। তারা বলছে, রোহিঙ্গাদের কারণে প্রতিমাসে বন বিভাগের জমি বেহাত হচ্ছে, কাটা পড়ছে পাহাড়। কী পরিমাণ জমি রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে- প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সে নির্দেশনা না থাকলেও অলিখিতভাবে এসব কার্যক্রম চলছে।

বর্ষায় কক্সবাজারে টানা সাত দিন বা তারও বেশি দিন বৃষ্টির রেকর্ড আছে। এ সময় পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস ও প্লাবন হয়। এ বছর রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও টাইংখালী এবং টেকনাফের উনছিপ্রাং, লেদা, জাদিমোড়া এলাকার অনেক পাহাড় কাটা পড়ায় মাটি ঝরঝরে হয়ে গেছে। এ ছাড়া পাহাড়ি ছড়া বা খালগুলোর গতিপথ কোথাও কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার আশঙ্কায় আছেন অনেকে।

সরেজমিন দেখা গেছে, মিয়ানমারে জাতিগত সহিংসতার জেরে গত ২৫ আগস্টের পর পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছাড়াও পাহাড়গুলো কেটেছেঁটে মরুভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। যে যেমন পারছে এসব পাহাড়ে গড়ে তুলছে বসতি। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) রোহিঙ্গাদের জন্য টয়লেট, স্কুল, মাদরাসা ও মসজিদ করেছে। বনভূমিতে হয়েছে হাসপাতাল, অফিস ও বাজার। তবে হয়নি আশ্রয় কেন্দ্র। এ দুই উপজেলায় বসবাস দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার। তাদের মধ্যে দেড় লক্ষাধিক রয়েছে পাহাড়চূড়া ও ঢালু বা নিম্নাঞ্চলে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভারি বর্ষণ হলে ভূমিধস ও প্লাবনের শিকার হতে পারে তারা। উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে অধিক ঝুঁকিতে থাকা এক লাখ রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করে তাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজও শুরু করেছে।

সম্প্রতি উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও মধুছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, ৪০-৫০টি মাটি কাটার গাড়ি দিয়ে ৩৩টি পাহাড় কেটে সমান করা হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ব্যানারে হচ্ছে মাঠি ভরাট, রাস্তা নির্মাণ ও স্থাপনা তৈরির কাজ। প্রতি পাহাড়ে একজন মাঝি ও ৫০ জন রোহিঙ্গা শ্রমিক দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে পাহাড় কাটার কাজ করছে। কাজ তদারকি করছে ডব্লিউএফপির কার্য সহকারী হাফেজ ছালেহ। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে চাননি।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের আসন্ন বর্ষার ঝুঁকি মোকাবেলার নামে প্রায় ৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সরকারি পাহাড় কেটে সমতল করে।

ডব্লিউএফপির কমিউনিকেশন অফিসার শেলি টাকরাল জানান, আসন্ন বর্ষা মৌসুমের ঝুঁকি মোকাবেলায় নির্ধারিত স্থাপনা নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে চলছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের গৃহীত উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিপন্ন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে সমস্যা সমাধানে অনেকদূর এগিয়েছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন সংস্থা রোহিঙ্গাদের ঝুঁকি মোকাবেলা, খাদ্য নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছে।

পাহাড় কাটার বিষয়ে কথা হয় কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তা (ডিএফও) আলী কবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা এ পর্যন্ত কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের ৫ হাজার ৫১৩ একর জমি দখলে নিয়ে অবস্থান করছে। প্রতিমাসে বন বিভাগের জমি বেহাত হচ্ছে, কাটা হচ্ছে পাহাড়। প্রতিমাসেই আমরা জমি পরিমাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। বন বিভাগের কী পরিমাণ জমি রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে- সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে সে নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। অলিখিতভাবে এসব কার্যক্রম চলছে।

বন বিভাগের একটি সূত্র বলছে, এ দুই উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার একর ভূমি দখল করে রেখেছে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। কৃষিজমি, পাহাড়, বন উজাড় করে নির্মিত তাদের বসতি স্থানীয়দের জন্যও বিরাট ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বালুখালী আইওএম হাসপাতালের পাশ থেকে গত সপ্তাহে ৯টি পরিবারকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে হাসপাতালটি রয়ে গেছে। জাহেরা নামের এক রোহিঙ্গা নারী আক্ষেপ করে বলেন, বার বার আমাদের সরানো হচ্ছে। এ যে কত কষ্টের তা বোঝানো যাবে না। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে এখানেও অশান্তি। এনজিও হাসপাতাল ঝুঁকিতে পড়ে না। ঝুঁকিতে পড়ছি আমারা।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) প্রশিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাড়িঘর শক্ত করে তৈরির কৌশলও শেখানো হচ্ছে। টেকনাফস্থ ২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্নেল আছাদুদ জামান চৌধুরীর আশঙ্কা, ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের নিরাপদে না সরালে বর্ষা মৌসুমে ভয়ানক সমস্যা হতে পারে।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী রবিন জানান, ঝুঁকি মোকাবেলায় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদে সরাতে নতুন করে ৫০০ একর ভূমি নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে কাজ চলছে। স্থানান্তরও করা হচ্ছে। এ ছাড়া পাহাড়ি এলাকার খাল ও ছড়া খনন করে পানি চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় করণীয় ঠিক করতে বেশ কয়েকটি সভাও হয়েছে। কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাছুম কবির নজরুল ইসলাম বলেন, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য আগাম কাজকর্ম চলছে। দেশি-বিদেশি এনজিওকেও কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads