• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
হাজারীবাগে ড্রেনে ডুবে শিশুর মৃত্যু

সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর সড়কগুলোতে তৈরি হয় জলবদ্ধতা। ছবিটি শাহজানহাপুর এলাকা থেকে তোলা

ছবি : বাংলাদেশের খবর

বাংলাদেশ

প্রাণ সংহারী রূপ জলাবদ্ধতার

হাজারীবাগে ড্রেনে ডুবে শিশুর মৃত্যু

  • রানা হানিফ
  • প্রকাশিত ২৬ জুন ২০১৮

রাজধানীর অকার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে জলাবদ্ধতা। মাঝারি থেকে একটু ভারী বর্ষণ হলে শুধু প্রধান প্রধান সড়কই না, অলিগলিও ডুবছে। আর বৃষ্টি শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরও সরছে না এসব পানি। এতে খোলা ড্রেন ও রাস্তার পানি হয়ে যাচ্ছে একাকার। চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে। রাস্তার খানাখন্দে পড়ে উল্টে যাচ্ছে রিকশাসহ যাত্রী, অকেজো হয়ে পড়ছে বিভিন্ন মোটরযান। রিকশা উল্টে দুর্ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর জলাবদ্ধতার এমন ভয়াবহ রূপে প্রাণহানির ঘটনাও শুরু হয়েছে রাজধানীতে। এদিকে গতকালই ভারী বৃষ্টিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বেশকিছু এলাকায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। নিচু এলাকায় জমে যায় হাঁটু সমান পানি।

রাজধানীতে গতকাল দুপুরের মাঝারি বৃষ্টিতে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এমনই এক জলাবদ্ধ ড্রেনে পড়ে মারা গেছে তানজিল নামের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু। পুরান ঢাকার হাজারীবাগ পার্কের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। হাজারীবাগের ঢাল উলাল মহলের বাবুল মিয়ার সন্তান তানজিল অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় খেলছিল। বৃষ্টিতে রাস্তা ও ড্রেনে পানি একাকার হয়ে যাওয়ায় অসাবধানতাবশত তানজিল ড্রেনে পড়ে যায়। খবর পেয়ে বাবুল মিয়া ছুটে গিয়ে নেমে পড়েন ড্রেনে; উদ্ধার করেন অচেতন সন্তানকে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাজধানীর জলাবদ্ধতা এমন প্রাণ সংহারী রূপ নেওয়ায় উদ্বিগ্ন নগর বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিগত বছরের অভিজ্ঞতা থেকেও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর টনক নড়েনি। জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারায় এমন দুর্ঘটনার দায় তাদেরই। নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবীব বাংলাদেশের খবরকে বলেন, গত বছর জলাবদ্ধতার যে চিত্র আমরা দেখেছি, সেখানে সেবাদানকারী সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা, এমনকি মন্ত্রণালয় থেকেও ঘোষণা এসেছিল এ বছর থেকে রাজধানীতে কোনো জলাবদ্ধতা হবে না। কিন্তু দেখছি আরো ভয়াবহ চিত্র। জলাবদ্ধতা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা রাস্তা খুঁড়ে একাকার করে ফেলেছে। দেখাচ্ছে তারা কত না প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু ফলাফল আরো ভয়াবহ। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতায় রিকশা উল্টে যাত্রীসহ দুর্ঘটনা ঘটছে। গর্তে পড়ে অটোরিকশা, বাসের স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এবার ড্রেনে ডুবে শিশুর মৃত্যু হলো। ঢাকার জলাবদ্ধতা তো এখন প্রাণহানির রূপ নিয়েছে।

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যত কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা হয়নি। মন্ত্রণালয় থেকে যে অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে তা যেনতেনভাবে খরচ করে দেখানো হচ্ছে। কোনো পরিকল্পনা নেই। জলাবদ্ধতার কারণ শনাক্তে কোনো সেবা সংস্থা কাজ করছে না। আমরা যারা বলছি তাদের কথাও কানে নিচ্ছে না। সামান্য বৃষ্টিতে যে জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে, যদি টানা দুই তিন দিন বৃষ্টিপাত হয় তাহলে তো পুরো ঢাকায় বন্যার রূপ নেবে।

জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, রাস্তার উপরের পানি সরাতে আমরা যথেষ্ট কাজ করেছি। পুরনো ড্রেন সংস্কার, নতুন ড্রেন নির্মাণ করেছি। কিন্তু আমাদের তৈরি ড্রেন সংযোগ দেওয়া হয়েছে ওয়াসার পয়ঃনালিতে। তাদের ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়লে পানি সরবে কোথায়। এসব বিষয়ে কথা বলতে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গতকাল দুপুর ১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত রাজধানীতে মোট ৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। মাঝারি এই বৃষ্টিতে মিরপুর ১০, ১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, তালতলা, আগারগাঁও, হাতিরঝিল-তেজগাঁও লিংকরোড, চানখাঁরপুল, সিদ্ধেশ্বরী, মালিবাগ, মগবাজার এলাকার সড়ক ও আশাপাশের অলিগলি ডুবে যায়। একই চিত্র ছিল বঙ্গভবনের দক্ষিণ পাশের সড়কেরও। এই সড়কে গর্তে পড়ে বেশ কয়েকটি রিকশা উল্টে যাওয়ারও ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা যায় ধানমন্ডি ১৫ নম্বর, শংকর, ২৭ নম্বর সড়ক, শুক্রাবাদ, সোবহানবাগ, ঝিগাতলা এলাকায়ও। দুই পাশের সড়ক পানিতে ডুবে একাকার হয়ে যায় পান্থপথ থেকে সেন্ট্রাল রোড পর্যন্ত গ্রিন রোডের পুরো অংশ। বৃষ্টি কমার ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্তও জমে ছিল পানি। বিশেষ কিছু সড়কের জলাবদ্ধতা দূর করতে ওয়াসার কর্মীদের মাঠে দেখা যায়। ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে এসব সড়কের পানি সরার ব্যবস্থা করে তারা।

আবহাওয়া অফিস বলছে, আজ মঙ্গলবার ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণও হতে পারে। আগামীকাল বুধবার থেকে পরবর্তী ৩ দিন বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ভারী বর্ষণে নগরীর চকবাজার, কেবি আমান আলী রোড, বাদুরতলা, বহদ্দারহাট, খাতুনগঞ্জ, বকশিরহাট, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক, ২ নম্বর গেইট, মুরাদপুর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। হাঁটু সমান পানি থাকায় বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। নিচু এলাকায় ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে যাওয়ায় বাসিন্দারা পড়েন চরম দুর্ভোগে। ধুনিরপুল এলাকার বাসিন্দা ইফতেখার উদ্দিন জানান, বর্ষার আগেই সিডিএ’র জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের অধীনে চকবাজারের উপর দিয়ে বড় খালটিতে বাঁধ দিয়ে তা খনন করা হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হচ্ছে সড়ক দিয়ে। এতে দুর্ভোগে পড়েছে নগরবাসী। শুষ্ক মৌসুমে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করা হলে দুর্ভোগ কম হতো বলে মনে করেন তিনি। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শেখ ফরিদ আহমদ জানান, মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মঙ্গলবারও হতে পারে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads