• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
আসাম থেকে বাঙালি বিতাড়নের হুমকি বিজেপির

বিজেপির ভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ

আসাম থেকে বাঙালি বিতাড়নের হুমকি বিজেপির

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এই প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে ঘোষণা করল যে, আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা বা এনআরসি থেকে যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের বাংলাদেশেই ‘ডিপোর্ট’ করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপির অত্যন্ত প্রভাবশালী সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লি এনআরসি বিষয়ক এক আলোচনা সভায় তাদের এই নীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, এখানে আমাদের পরিকল্পনা হলো তিনটি ডি- ডিটেক্ট, ডিলিট ও ডিপোর্ট। অর্থাৎ প্রথম ধাপে অবৈধ বিদেশি কারা, তাদের শনাক্ত করা হবে (ডিটেক্ট)- যেটা এখন চলছে। তারপর ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া ও বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে (ডিলিট)। আর তারপর আমরা তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করব।

এর আগে বিজেপির শীর্ষ স্তরের কোনো নেতাই এত স্পষ্টভাবে এনআরসি থেকে বাদপড়া লোকজনকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা বলেননি। সভায় হাজির ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও। তিনি মন্তব্য করেন, অবৈধ বিদেশিদের খুঁজতে আসামের পর এবার সারা ভারতেই এনআরসি প্রক্রিয়া চালু করা উচিত। রাম মাধব যখন ডিপোর্ট করার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী সোনোওয়ালসহ সভায় উপস্থিত বিজেপির শীর্ষ নেতারা ও শ্রোতা-দর্শকরা টেবিল চাপড়ে এবং তুমুল করতালিতে সেই মন্তব্যকে স্বাগত জানান। বস্তুত রাম মাধব ‘অবৈধ বিদেশিদের’ যেভাবে বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেছেন তাতে পরিষ্কার যে, বিজেপির মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যেই অনেক ভাবনাচিন্তা হয়েছে। তিনি বলেন, অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলবেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ, সেখানে কীভাবে আপনি এই লোকগুলোকে ডিপোর্ট করবেন? আরে, বন্ধু তো আপনাদের সবাই- তাই বলে কি তাদের যেসব লোকজন অবৈধভাবে এখানে আছেন তাদের কি ফেরত পাঠানো যাবে না? আরে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের দিকেই তাকান না। বাংলাদেশ নিজেরাই তো লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সে দেশের সঙ্গে সক্রিয় আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছে। সৌদি আরবও সে দেশে থাকা অবৈধ পাকিস্তানি, বাংলাদেশি বা ভারতীয়দের মাঝে মাঝেই ফেরত পাঠায়। কাজেই ডিপোর্ট করার মধ্যে অন্যায় কিছু নেই। ভারত সরকার বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিষয়টি ঠিকই ‘কূটনৈতিক দক্ষতায় ম্যানেজ করে নিতে পারবে’ বলেও তিনি দাবি করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাম মাধব বিজেপির নিছক একজন সাধারণ সম্পাদক মাত্র নন, দলের কাশ্মীর নীতি থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব ভারতের নীতি, সবই তিনি দেখাশোনা করেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের সঙ্গে বিজেপির প্রধান সেতুও তিনি। বিজেপির পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও দলের বাংলাদেশবিষয়ক নীতি এবং কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় রাম মাধবের নির্দেশে। বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়দুল কাদের বা এইচটি ইমাম, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ কিংবা জাকের পার্টির নেতা আমির ফয়সল মুজাদ্দেদি- দিল্লিতে যারাই আসুন না কেন, রাম মাধবের সঙ্গে তারা দেখা করবেন ধরেই নেওয়া যায়। দিল্লিতে রাম মাধব ‘ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ নামে যে থিঙ্কট্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত, বাংলাদেশের নেতা-মন্ত্রী-নীতিনির্ধারকরাও সেখানে নিয়মিতই বিভিন্ন আলোচনা সভা বা সেমিনারে যোগ দিয়ে থাকেন। এ কারণেই রাম মাধব যখন এনআরসি থেকে বাদপড়া লোকজনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেন, সেটাকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হয়। বস্তুত এটা যে তার কোনো ব্যক্তিগত দাবি নয়, বরং বিজেপির ‘সুচিন্তিত মতামত’, সেটাও তিনি সোমবার সভার পর একান্ত আলোচনায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তবে এনআরসি থেকে যারা বাদ পড়বেন, তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করাটা ভারত সরকারেরও নীতি কি না- দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টতই এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমরা এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলছি। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া যে এখনো শেষ হয়নি এবং খসড়ায় যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা যে নিজেদের ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করার আরো অনেক সুযোগ পাবেন, সেটাও বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি কিছু আমাদের বলার নেই, বলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। তার কথা থেকে এটা পরিষ্কার, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশে ডিপোর্ট করার কথা পরিষ্কার করে বললেও ভারত সরকার এখনই এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইছে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে জুলাই মাসের শেষে আসামের জাতীয় নাগরিক তালিকার (এনআরসি) যে দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকে রাজ্যের প্রায় চল্লিশ লাখ বাসিন্দার নাম বাদ পড়েছে। সরকার যদিও বলছে, এরা সবাই আবার আপিল করার বা নথিপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। তারপরও যদি এনআরসিতে তাদের নাম না ওঠে, তাহলেও তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে বা শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে যাওয়ার অবকাশ থাকবে। কিন্তু এসব প্রক্রিয়ার শেষেও আসামের বেশ কয়েক লাখ লোক অবৈধ বিদেশি হিসেবেই চিহ্নিত হবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। বিজেপি এই লোকজনদেরই এখন বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছে- তারা এদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে মনে করে না, আর তাই তাদের ফিরিয়ে নেওয়ারও কোনো প্রশ্ন নেই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads