• রবিবার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৫
ads
হিতে বিপরীত হতে পারে পুঁজিবাজারে

ছবি : সংগৃহীত

পুঁজিবাজার

আইপিও বিধি সংশোধন

হিতে বিপরীত হতে পারে পুঁজিবাজারে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২১ মে ২০১৯

বিধি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে কোনো কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির আইপিও নিয়ে সমালোচনার মুখে সম্প্রতি কমিশনের এক নিয়মিত সভায় ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এতদিন আইপিওতে স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে ন্যূনতম ১৫ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়তে পারত কোম্পানিগুলো। বিএসইসির নতুন প্রস্তাবে এখন থেকে স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকার বা পাঁচ কোটি শেয়ার ছাড়তে হবে। এছাড়া বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ন্যূনতম ১০০ কোটি টাকা বা পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ বা এর মধ্যে যেটা বেশি হয়, সে পরিমাণের শেয়ার ছাড়তে হবে। বুক বিল্ডিংয়ে ডাচঅকশন পদ্ধতি আরোপ করা হবে। এর মানে হচ্ছে নিলামে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা শেয়ার দরের যে প্রস্তাব করবে, তাদের সেই দরেই শেয়ার নিতে হবে। এদিকে নতুন কোম্পানি স্থির মূল্য পদ্ধতিতে ৫০ কোটি ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১০০ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়ার প্রস্তাব যদি কার্যকর করা হয় তাহলে হিতে বিপরীত হবে বলে মনে করছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা।

কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংক ও ইস্যুয়ার কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এমনিতেই কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে চায় না। তার ওপর যদি এত বড় ভলিউমের শেয়ার ছাড়ার বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে পুঁজিবাজারে এখন যেসব কোম্পানিকে আনা যাচ্ছে তাও পাড়া যাবে না। এর পুরো প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারে। তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিরা বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারের সরবরাহ এমনিতেই কম। তার ওপর যদি নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বাজারে বড় ধরনের খারাপ প্রভাব পড়বে। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে পুঁজিবাজার ফুলেফেঁপে ওঠার কারণ ছিল শেয়ার সরবরাহ কম থাকা। যা পরবর্তী সময়ে সরবরাহ বাড়ায় একটা স্থিতিশীল অবস্থা ছিল বাজারে। এখন যদি নতুন করে সেই সঙ্কট তৈরি হয় তাহলে বাজারে আবার বিপর্যয় হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

এদিকে আইপিওতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলো নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, একটি চক্র বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলো নিয়ে না বুঝে মন্তব্য করে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। আর গত দুই বছরে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে, এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যায় পড়ায় বেকায়দায় পড়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে স্থির মূল্য পদ্ধতিতে ডিএসইতে ৬টি  কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। এগুলো হলো- নাহি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল, ওয়াইম্যাক্স ইলেক্ট্রোড, বিবিএস কেব্ল, নূরানী ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ও প্যাসিফিক ডেনিম।

সবগুলো কোম্পানিই ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে তালিকাভুক্ত হয়। গত বৃহস্পতিবার নাহি অ্যালুমিনিয়ামের সমাপ্ত দর  ছিল ৫৪ টাকা, ওয়াইম্যাক্সের ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা, বিবিএস ক্যাবলের ২৮ টাকা ১০ পয়সা, নূরানী ডাইংয়ের  ১৪ টাকা ৭০ পয়সা, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ৩২ টাকা ৩০ পয়সা ও প্যাসিফিক ডেনিমের প্রতিটি শেয়ারের সমাপ্ত দর ছিল ১৫ টাকা ৪০ পয়সা।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পুঁজিবাজারে মোট ৮৬টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। এর মধ্যে ১০টি কোম্পানির শেয়ার গত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ফেসভ্যালুর নিচে রয়েছে। আর ইস্যু প্রাইসের নিচে রয়েছে ২৭টি কোম্পানির শেয়ার।

ফেসভ্যালুর নিচে থাকা কোম্পানিগুলো হলো- জাহিন ইন্ডাস্ট্রিজ, মোজাফ্ফর হোসেন স্পিনিং মিল, প্যাসিফিক ডেনিম, ফ্যামিলি টেক্স, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন, ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, অ্যাপোলো ইস্পাত, ন্যাশনাল ফিড মিল, জিবিবি পাওয়ার ও জাহিন স্পিনিং লিমিটেড। এ ১০ কোম্পানির অধিকাংশের আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যাকে দায়ী করেছেন ইস্যু ম্যানেজাররা। আর এই ৮৬টি কোম্পানি তালিকাভুক্তির পর বিনিয়োগকারীদের মোট ১২৬১.৭৬ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে, যা গড়ে ১৪.৭ শতাংশ।

এছাড়া বর্তমান কমিশনের অনুমোদন নিয়ে পুঁজিবাজারে আসার পরে বিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে এমন কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, তুং হাই নিটিং, আরএন স্পিনিং, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ইত্যাদি। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঋণ জটিলতায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের। আর পারিবারিক অন্তঃকলহে বন্ধ হয়ে গেছে তুং হাই নিটিং ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ব্যবসায়। এছাড়া অগ্নিকাণ্ডে আরএন স্পিনিংয়ের উৎপাদন এবং পর্ষদের অন্তঃকলহ ও ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতার কারণে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বিনিয়োগকারী তথা পুরো শেয়ারবাজার।

মার্চেন্ট ব্যাংকের এক কর্মকর্তা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০১৭ সালে সেখানে ৮৮ কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। এর মধ্যে লেনদেনের প্রথম দিনই ২০টি কোম্পানির শেয়ার দরই ইস্যুমূল্যের নিচে চলে যায়। আর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এমন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি যে লেনদেনের প্রথম দিনই ইস্যু মূল্যের নিচে চলে গেছে। তাই অহেতুক কোম্পানির মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তালিকাভুক্তির পর কীভাবে কোম্পানিগুলোকে আরো জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে তা নিয়ে কথা বলা উচিত। এতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবে। 

এ ব্যাপারে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান বলেন, আইপিও সংক্রান্ত বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। মার্চেন্ট ব্যাংক ও ইস্যু ম্যানেজারদের যদি এ ব্যাপারে কোনো চাওয়া থাকে তাহলে তারা বিএসইসিতে তা জানাতে পারে। সবার আলোচনার মাধ্যমেই আইপিওতে কী সংশোধনী আনা যায় তা কার্যকর হবে।

এ ব্যাপারে  সিএপিএম ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানিয়া শারমীন বলেন, এভাবেই পুঁজিবাজারে কোনো ইস্যু আনতে আমাদের অনেক ধরনের বাধার মধ্যে পড়তে হয়। তার ওপর যদি স্থির মূল্য পদ্ধতিতে ন্যূনতম ৫০ কোটি টাকা ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১০০ কোটি টাকা বা পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়, তাহলে আমাদের পক্ষে নতুন ইস্যু আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। এর ফলে বাজারে ইস্যু আসা কমে যাবে ও এর পুরো প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারে।

আইপিও সংক্রান্ত বিষয়ে আলফা ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর মোহাম্মদ বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে অবশ্যই আইপিওর নতুন বিধি করার আগে ভাবতে হবে যে বর্তমান বাজারে কোম্পানিগুলোর অবস্থা কেমন। স্থির মূল্য পদ্ধতিতে ৫০ কোটি ও বুক বিল্ডিংয়ে ১০০ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়ার নিয়ম যদি করা হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মাঝারি মানের কোম্পানিগুলো। কারণ বাংলাদেশে মাঝারি মানের যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ আছে নতুন নিয়মে তারা বাজারে আসতে পারবে না। তিনি নতুন বিধি করার আগে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানান।

 এর আগে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ৩০ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক ইস্যু) রুলস, ২০১৫ সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত আইপিও-সংক্রান্ত কোনো আবেদন গ্রহণ করা হবে না। এখন থেকে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির মূলধন তোলার বিষয়ে কোনো আবেদনও বিএসইসি গ্রহণ করবে না। দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে টানা দরপতনের পর কোম্পানির আইপিও ও প্লেসমেন্ট ইস্যু নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে বিএসইসি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে গত ২৯ এপ্রিল ‘আইপিওর আগে কোম্পানির মূলধন বৃদ্ধিতে বিএসইসির কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন নেই’ বলে জানায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এর ফলে কোম্পানিগুলো বিএসইসির সম্মতি ছাড়াই মূলধন বৃদ্ধি ও প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করার সুযোগ পায়। তবে আইপিও আবেদনের সময় মূলধন বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বিএসইসি জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থিরমূল্য ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির আইন সংশোধনের সিদ্ধান্তের কথাও জানায় বিএসইসি।

বিএসইসির এমন সিদ্ধান্তের কারণেই নতুন করে আইপিও আবেদনের প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল। এর আগেও একাধিকবার পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধনের কারণে বিভিন্ন কোম্পানির আইপিও প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়। এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বিএসইসির পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধনের কারণে গত ছয় বছরে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। তবে এবার বিষয়টি বিবেচনা করে এরই মধ্যে যেসব কোম্পানি আইপিও আবেদন জমা দিয়েছে, সেসব আইপিও তালিকাভুক্তির সুযোগ রেখেছে কমিশন।

এদিকে চলতি বছর পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় বুক বিল্ডিং ও স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের অংশ ৬০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫০ শতাংশ করা হবে বলে জানিয়েছে বিএসইসি। এর ফলে আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ বেড়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত হবে। এছাড়া পেনশন ফান্ড, গ্রাচুয়িটি ফান্ড ও প্রভিডেন্ড ফান্ড যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে আইপিওতে শেয়ার বরাদ্দ পেয়ে আসছিল, সে সব ফান্ড যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে এ ধরনের সুবিধা আর পাবে না। এছাড়া যেসব মার্চেন্ট ব্যাংক, ব্রোকার যারা নিষ্ক্রিয় কিন্তু যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে সুবিধা নিচ্ছে, তারাও আর এ সুবিধা পাবে না।

আইপিওর চেক লিস্ট সংশোধন করা হবে ও ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নিয়ে এটা চূড়ান্ত করা হবে। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর ডিএসই ও সিএসই আইপিওতে মতামত এক মাসের মধ্যে দিতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads