• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্রোকারেজ হাউজ

সংগৃহীত ছবি

পুঁজিবাজার

খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে ব্রোকারেজ হাউজ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ অক্টোবর ২০১৯

পুঁজিবাজারের চলমান মন্দা অবস্থায় একদিকে বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা, অন্যদিকে দুর্দিন নেমে এসেছে ব্রোকারেজ হাউজগুলোতে। খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বেশির ভাগ ব্রোকারেজ হাউজ। ফলে চাকরি হারানোর আতঙ্ক ভর করছে হাউজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। মালিকরা বলছেন, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাই করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লেনদেন থেকে পাওয়া কমিশনের ওপর ভর করেই মূলত ব্রোকারেজ হাউজগুলো চলে। কিন্তু পুঁজিবাজারের চলমান মন্দায় লেনদেন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ফলে লেনদেন থেকে পাওয়া কমিশনে মুনাফা তো দূরের কথা, উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে। ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১০ সালের মহাধসের পর পুঁজিবাজারে যে মন্দাভাব দেখা দেয় তা এখনো কাটেনি। বরং দিন যত যাচ্ছে বাজার তত তলানিতে ঠেকছে। এ পরিস্থিতিতে সবার মধ্যেই চাকরি হারানোর আতঙ্ক রয়েছে। কারণ এটা স্বাভাবিক যে, মালিকরা বছরের পর বছর ধরে লোকসানের ভার বহন করবেন না। তাদের মতে, ২০১০ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তিন হাজার কোটি টাকার ওপরে লেনদেন হতো। সেই লেনদেন এখন ৩০০ কোটি টাকার ঘরে নেমে এসেছে। এ লেনদেন থেকে যে কমিশন পাওয়া যায় তাতে ব্রোকারেজ হাউজের খরচের এক-তৃতীয়াংশের মতো উঠে আসে। অর্থাৎ মাসে ব্রোকারেজ হাউজের মালিককে প্রায় ৭০ শতাংশের মতো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বা লোকসান গুনতে হচ্ছে। পার্কওয়ে সিকিউরিটিজের এক কর্মকর্তা বলেন, পুঁজিবাজার যখন ভালো ছিল মালিক আমাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতেন। কিন্তু এখন বাজারের যে দশা তাতে মালিকের পক্ষে হাউজ চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এটা আমরা সবাই বুঝি। মালিক কিছু বলছেন না; কিন্তু হাউজের প্রায় সবার মধ্যেই চাকরি হারানোর এক ধরনের আশঙ্কা আছে। মালিক কতদিন এভাবে লোকসান টানবেন?

তিনি বলেন, ২০১০ সালের ধসের পর গত নয় বছরে বাজার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মাঝে কিছুদিন সূচক ও লেনদেন বাড়লেও তা স্থায়ী হয়নি। আর গত কয়েক মাস ধরে তো বাজার পতনের মধ্যেই আছে। দিন যত যাচ্ছে বাজার পরিস্থিতি তত খারাপ হচ্ছে। এ পরিস্থিতি সবার জন্য অস্বস্তিকর। স্টকের কর্মকর্তা শাকিল রিজভী বলেন, বাজার যখন ভালো ছিল আমাদের হাউজ বিনিয়োগকারীদের পদচারণে ভরপুর থাকত। এখন প্রায় সময় বিনিয়োগকারীদের অভাবে হাউজ হাহাকার করে। নয় বছরে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে না পারা দুঃখজনক। পুঁজিবাজারে যে দুরবস্থা বিরাজ করছে, তাতে কার চাকরি কতদিন টেকে বলা মুশকিল। প্রতিনিয়ত চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকি। এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ব্রোকারেজ হাউজগুলো পরিচালনা করতে মালিকরা বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। হাউজগুলো অবশ্যই তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করবে। সুতরাং তাদের ব্যয় হ্রাস করতে হবে। প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু কর্মী হ্রাস করতে হতে পারে।

এদিকে পুঁজিবাজারে দুরবস্থা বিরাজ করলেও সম্প্রতি বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারল্য সংকট কাটাতে বাড়ানো হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর)। রেপোর (পুনঃক্রয় চুক্তি) মাধ্যমে অর্থ সরবরাহের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি ব্যাংক এ সুবিধাও গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াতে রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। বন্ড বিক্রি করে সোনালী ব্যাংক থেকে পাওয়া ২০০ কোটি টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি বাজারে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারি পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কাছে দুই হাজার কোটি টাকা চেয়েছে আইসিবি। এ টাকা পেলে তার পুরোটাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া ইউনিট ফান্ডের মাধ্যমে আইসিবিকে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ দিতে চাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। গতি ফেরাতে এ ধরনের একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তলানিতেই রয়ে যাচ্ছে পুঁজিবাজার। এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা বলেন, মন্দার পেছনে অনেক কিছুই থাকতে পারে, তবে এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় সমস্যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের কোনো আস্থা নেই। তারা বাজারবিমুখ হয়ে গেছেন। ফলে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাজারে তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি চালু হওয়া ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স শুরুতে ছিল চার হাজার ৫৫ পয়েন্টে। এরপর উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সূচকটি ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রথম পাঁচ হাজার পয়েন্ট স্পর্শ করে। একপর্যায়ে ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর সূচকটি ছয় হাজার ৩৩৬ পয়েন্টে উঠে যায়।

এরপর কয়েক দফা উত্থান-পতন হলেও সূচকটি চলতি বছরের আগে আর পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নামেনি। তবে চলতি বছরের জুলাইতে সূচকটি পাঁচ হাজার পয়েন্টের নিচে নেমে যায়। এরপর কিছুটা উত্থান-পতন হলেও পতনের প্রবণতাই বেশি লক্ষ করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে টানা দরপতনের ফলে ১৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে সূচকটি চার হাজার ৭৭০ পয়েন্টে নেমে যায়, যা ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন। এ পর্যন্ত চলতি মাসে ১২ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে একদিনও ডিএসইর লেনদেন ৪০০ কোটি টাকার ঘর স্পর্শ করতে পারেনি। ১২ দিনের মধ্যে ১০ দিন ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার ঘরে। বাকি দুদিন লেনদেন ছিল ২০০ কোটি টাকার ঘরে। লেনদেনের এমন খরার মধ্যে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকার ওপরে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads