• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads
ফের যা-তা অবস্থা সড়কে

এত আন্দোল, এত প্রচার-প্রচারণা-তারপরও সচেতনতা আসছে না কারো মধ্যে। সেই মোবাইল কানে বিপজ্জনক পথচলা, রাস্তার মাঝখানে বাস থামিয়ে যাত্রঅ তোলা। গতকাল কারওয়ানবাজার মোড়ের দৃশ্য

ছবি : আদনান আদিত

যোগাযোগ

ফের যা-তা অবস্থা সড়কে

  • রানা হানিফ
  • প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০১৮

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ‘উজ্জীবিত’ হয়ে জাতীয় ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু করে পুলিশ। আন্দোলনকালে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। ট্রাফিক সপ্তাহের শুরুর দিকেও সেই শৃঙ্খলা বজায় থাকার আভাস ছিল। কর্তৃপক্ষের নানা হুমকি-ধমকির কারণে রাস্তায় যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া গাড়ি না নামায় যানবাহনের সংখ্যাও ছিল কম। তবে যতই দিন গড়াতে শুরু করেছে সড়কের বিশৃঙ্খল অবস্থা ততই উন্মোচিত হচ্ছে। গাড়িচালক, হেলপার থেকে শুরু করে যাত্রী, পথচারীরাও ফিরে গেছেন আগের সেই আইন না মানার প্রবণতায়। গতকাল শনিবার ছুটির দিনে সড়কে যা-তা অবস্থা চোখে পড়েছে।

আন্দোলন চলাকালে রাস্তায় নামেনি ফিটনেসবিহীন যান, বৈধ লাইসেন্স ছাড়া চালকের আসনে বসেনি কেউ। বাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, অ্যাম্বুলেন্স চলেছে লেন ধরে। রিকশা চলাচলেও ছিল শৃঙ্খলা। যত্রতত্র বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠা-নামা দেখা যায়নি। সিগন্যাল পয়েন্টগুলোতে জেব্রা ক্রসিং ছিল পথচারী পারাপারের জন্য মুক্ত। সড়ক থেকে শিক্ষার্থীরা উঠে গেলেও ট্রাফিক সপ্তাহের শুরুতে সেই শৃঙ্খলা দেখা গেছে। পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে সড়কে পরিবহন সঙ্কটও ছিল।

গতকাল শনিবার সড়কে আবার দেখা যায় পুরনো চিত্র। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও রাজধানীতে ছিল তীব্র যানজট। গাড়ি ও পথচারী উভয়কেই নিয়ম লঙ্ঘন করতে দেখা যায়। এ অবস্থায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার দাবি করেছেন, দেশের ৯০ শতাংশ মানুষই মানছে না ট্রাফিক আইন।

এ দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহ রাস্তায় না নামা ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলো চলা শুরু করেছে। হিউম্যান হলারে চালকের আসনে ছিল অপ্রাপ্তবয়স্করা। সিগন্যাল পয়েন্টে জেব্রা ক্রসিং দখল করেই দাঁড়িয়ে আছে যান। প্রধান প্রধান সড়কে রয়েছে রিকশার বিশৃঙ্খল অবস্থান। বেশ কিছু সড়কে মোটরসাইকেল চালকদের দেখা যায় উল্টো পথে চলাচল করতে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রুটের অধিকাংশ বাস চলছে। পাশাপাশি ট্রাফিক সপ্তাহ থাকায় মামলার আতঙ্কও ছিল চালক-মালিকদের মধ্যে। মোহাম্মদপুর-খিলগাঁও রুটে চলাচলকারী মিডলাইন পরিবহনের লাইনম্যান মো. আমিন বলেন, ‘আমাদের সব গাড়িই নতুন। তবে রুট পারমিটের সমস্যা ছিল। তাই কোম্পানির অনেক মালিকই বাস রাস্তায় নামাতে ভয় পেয়েছেন। এখন আর রাস্তায় কড়াকড়ি নেই।’

এ দিন মিরপুর সড়কের পুরোটাতেই দেখা যায় তীব্র যানজট। নিউমার্কেট-নীলক্ষেত মোড় থেকে সায়েন্সল্যাব সিগন্যাল, সায়েন্সল্যাব থেকে ধানমন্ডি ৮ নম্বর পর্যন্ত ছিল দীর্ঘ যানজট। একই চিত্র ছিল সায়েন্সল্যাব থেকে শাহবাগ পর্যন্ত। বেসরকারি চাকরিজীবী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, অফিসের কাজে কারওয়ানবাজার থেকে মতিঝিল পর্যন্ত রাইড শেয়ারের মোটরসাইকেলে আসতে সময় লেগেছে এক ঘণ্টা।

শাহবাগ মোড়ে তিনটি সিগন্যাল পয়েন্টেই গাড়ি দাঁড় করানো ছিল পথচারী পারাপারের জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর। এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল মশিউর কোনো উত্তর না দিয়ে যানগুলোকে পেছনে সরিয়ে দেন। বারডেম হাসপাতালের পাশের সড়কে যাত্রী ওঠা-নামায় যত্রতত্র বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পেছনে থাকা বাসকে ওভারটেকিংয়ে বাধা দিতে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে দেখা যায় বেশ কয়েকটি কোম্পানির বাসকে। যাত্রাবাড়ী-গাবতলী রুটের ৮ নম্বর বাসের চালককে রাস্তায় আড়াআড়ি করে দাঁড় করানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাত্র এসে দাঁড়িয়েছি, সোজা করার সুযোগ দেবেন তো।’

তীব্র যানজটের কারণে বেশ কিছু মোটরসাইকেল উল্টোপথে চলাচল করতে দেখা যায়। কাঁটাবন বাটার সিগন্যাল থেকে শাহবাগ পর্যন্ত যানজট থাকায় একসঙ্গে প্রায় ৮-১০টি মোটরসাইকেলকে উল্টোপথে আসতে দেখা যায়। এ সময় সেখানে ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্ট দায়িত্ব পালন করছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আপনারা লিখে দিচ্ছেন, ট্রাফিকের দায়িত্বে অবহেলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ, গাড়িচালক কেউ তার দায়িত্ব পালন করছে না। গত প্রায় ১৫ দিন রাস্তায় মানুষ শৃঙ্খল ছিল। কিন্তু সেটা ছিল ভয়ে, দায়িত্ববোধ থেকে না।’

আন্দোলনের সময় থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত রাজধানীতে শিশুদের হিউম্যান হলারের চালকের আসনে তেমন একটা দেখা না গেলেও, রাতারাতি পাল্টে গেছে সে চিত্র। শনিবার দুপুরে নিউমার্কেট-নীলক্ষেত মোড় থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত চলাচলকারী হিউম্যান হলারগুলোর অধিকাংশেরই চালক ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। সিটি কলেজ মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রীকে নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘বাচ্চারা ড্রাইভিং করছে এটা দেখে আমি লেগুনাতে না উঠলে কি হবে, অন্যরা কি এগুলো মানছে? আসলে এগুলো (অনিয়ম) কোনো দিন ঠিক হবে না।’

যানবাহনের মতো সাধারণ পথচারীর মধ্যেও দেখা যায় ট্রাফিক অমান্যের প্রবণতা। নিউমার্কেট এলাকায় ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ পথচারীকে দেখা যায় সড়ক বিভাজকের বেষ্টনীর ফাঁক গলে রাস্তা পারাপার হতে। একই চিত্র ছিল সায়েন্সল্যাব মোড়েও। সড়কে যানবাহন চলন্ত থাকা অবস্থায় রাস্তা পারাপার হতে দেখা যায় পথচারীদের। ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত বাসে চড়তে ও নামতে দেখা যায় বেশ কয়েকজন যাত্রীকে।

সড়কের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘রাতারাতি মানুষ ট্রাফিক আইনের প্রতি সচেতন হবে না- এটা যেমন সত্য, আইনের কঠোর প্রয়োগ করলে যে শৃঙ্খলা ফিরে আসে- সেটাও প্রমাণিত হয়েছে। ট্রাফিক সপ্তাহ উদযাপন শেষ হওয়া মাত্রই যদি ট্রাফিক পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন ছেড়ে দেন তাহলে বিশৃঙ্খল অবস্থা আবারো ফিরে আসবে। প্রয়োজনে প্রতি মাসে ট্রাফিক সপ্তাহের আদলে বিশেষ কর্মসূচি পালন করা উচিত।’

ওয়ার্ল্ড ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. মাহরুফ হাসান বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে ট্রাফিক আইন মানতে শিখিয়েছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহ রাজধানীসহ সারা দেশে ট্রাফিক আইন মান্যের যে প্রাকটিস তৈরি হয়েছিল, সেটা ধরে রাখতে সরকারকে আরো পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে এই শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে একদিন রাস্তায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads