• মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৫
ads
রিকশায় অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া

রিকশায় অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া

ছবি : বাংলাদেশের খবর

যোগাযোগ

দুই সিটি করপোরেশনের উদাসীনতা

রিকশায় অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ জানুয়ারি ২০১৯

সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী রাজধানীতে বৈধ নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা ৮৭ হাজার হলেও চলছে প্রায় ১০ লাখ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি না থাকায় একদিকে যেমন বাড়ছে রিকশার সংখ্যা, অন্যদিকে ভাড়া নির্ধারণের ব্যাপারেও নেই কোনো উদ্যোগ। রাজধানীতে চলাচলকারী রিকশার জন্য কার্যকর ভাড়ার তালিকা না থাকায় চরম হেনস্থা হতে হচ্ছে নগরবাসীকে।

স্থানীয় সরকার আইন (সিটি করপোরেশন)-২০০৯ অনুযায়ী সিটি করপোরেশনকে তার আওতাধীন এলাকায় চলাচলকারী অযান্ত্রিক যানের নিবন্ধন দেওয়া ও সেগুলোর ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ভাড়ার এই তালিকা টানিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে। তবে রাজধানীতে কখনোই রিকশাভাড়া নির্ধারণ করে কোনো তালিকা টানানো হয়েছে কি না তা জানা নেই নগরবাসীর।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, সময় পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী কম-বেশি হতে থাকে রিকশাভাড়া। আর ভাড়া চাওয়ার ব্যাপারে যেন রিকশাচালকের রয়েছে একচ্ছত্র ক্ষমতা। প্রতিদিনই রিকশাভাড়া নিয়ে চালকের সঙ্গে ঘটছে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা। 

সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিকূল আবহাওয়া, যানজট, বিভিন্ন উৎসব, বাস ও অন্যান্য মোটরযানের সঙ্কট দেখা দিলে বেড়ে যায় রিকশাভাড়া। আর এই বাড়তি ভাড়া কখনো কখনো দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত হাঁকিয়ে বসে চালকরা। আর এসব পরিস্থিতিতে রিকশাচালকদের কাছে পুরোপুরিই জিম্মি নগরবাসী।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, মতিঝিল থেকে ধানমন্ডি (জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড) পর্যন্ত যেতে একেক চালক দাবি করে একেক ভাড়া। সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য রয়েছে কম দূরত্বের ক্ষেত্রে। রাজধানীতে বর্তমানে সর্বনিম্ন ২০ টাকার নিচে রিকশায় কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টায় ধানমন্ডির জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে মতিঝিল শাপলা চত্বর যেতে ৫ চালক দাবি করেন ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া। সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দাবি করে তারা। একই দিন রাত ৯টায় মতিঝিল থেকে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪০ থেকে সর্বনিম্ন ৮০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দাবি করে ভিন্ন ভিন্ন চালক।

রাজধানীতে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, বিশেষ কারণে মোটরযান চলাচল বন্ধ থাকলে বেড়ে যায় রিকশাচালকদের দৌরাত্ম্য, আর যাত্রীর তুলনায় পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হওয়ায় রিকশাভাড়াও বেড়ে যায় ৫ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত। বাসসহ অন্যান্য মোটরযানের সঙ্কট থাকায় এদিন রিকশাচালকদের কাছে চরম জিম্মি হতে হয় সাধারণ যাত্রীদের। ওইদিন সর্বনিম্ন যেকোনো দূরত্বের জন্য রিকশাচালকরা ভাড়া দাবি করে ন্যূনতম ৫০ টাকা। আর তা দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা পর্যন্তও দাবি করে অনেকেই।

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মার্কেটের ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী মুজাহিদুর রহমান। থাকেন ধানমন্ডি ১৫ নম্বর এলাকায়। প্রতিদিন বাসে করেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসা-যাওয়া করেন তিনি। তবে সময়মতো বাস না পাওয়া ও অতিরিক্ত ভিড় থাকার কারণে মাঝেমধ্যে রিকশার ওপরই নির্ভর করতে হয় তাকে।

মুজাহিদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দোকানে আসা-যাওয়ার জন্য মাঝেমধ্যেই রিকশায় চড়তে হয়। এ ছাড়া অনেক জায়গা আছে যেখানে বাস চলাচল করে না। সেখানে রিকশা ছাড়া কোনো উপায়ও থাকে না। তবে রিকশাভাড়ার ব্যাপারে আমরা সাধারণ মানুষ পুরোটাই জিম্মি ওদের কাছে (চালক)। নির্ধারিত ভাড়া বলতে ঢাকায় কিছুই নেই। যে যেমন ইচ্ছা ভাড়া চায়। আবার ওদের মধ্যে বেশ একতাও আছে। একজন চালক যে ভাড়া দাবি করল, আশপাশের কোনো চালকই ওই ভাড়ার নিচে দাবি করে না।

তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত রিকশাভাড়া সবচেয়ে বেশি। কারণ এ সময় স্কুল-কলেজে সবাই আশা-যাওয়া করে, অনেকেই অফিসে যায়। বাসে জায়গা থাকে না। তখন অনেকেই নিরুপায় হয়ে রিকশায় চড়ে। আর তখনই রিকশাওয়ালারা নিজের ইচ্ছামতো ভাড়া দাবি করে। আবার রোদ, বৃষ্টি, বেশি শীত, যানজটের মতো অজুহাত তো আছেই। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া বাড়িয়ে দেয় এরা।

মতিঝিলের একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগে ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন নিগার সুলতানা মালা। হাজারীবাগের গনকটুলির বাসা থেকে প্রতিদিনই তাকে রিকশায় চড়ে অফিসে আসা-যাওয়া করতে হয়। রিকশাভাড়ার ক্ষেত্রে নারীরাই বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে দাবি তার।

তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, কর্মজীবী নারীরাই রিকশাভাড়ার ক্ষেত্রে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বাসে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেকেই রিকশায় চলাচল করেন। আর এই সুযোগে আমাদের কাছ থেকে রিকশাচালকরা নিচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।

রাজধানীতে রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভাড়া নির্ধারণের ব্যাপারে দুই সিটি করপোরেশনের অবহেলা ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আইন অনুযায়ী রিকশার নিবন্ধন দেওয়া ও দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। কিন্তু রাজধানীতে শেষ কবে রিকশাভাড়ার তালিকা টানানো হয়েছে তা অনেক জ্যেষ্ঠ নাগরিকও বলতে পারবেন না। একদিকে নিয়ন্ত্রিতভাবে রাজধানীতে বাড়ছে রিকশার সংখ্যা, অন্যদিকে রিকশাভাড়া নির্ধারণের ব্যাপারে নেই কোনো উদ্যোগ। এতে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন হাসান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বুয়েটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে- রাজধানীতে বিভিন্ন সংগঠনের নামে চলছে প্রায় ১০ লাখ রিকশা। প্রতিদিনই এই সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। একজন নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে রিকশার মতো অযান্ত্রিক যানকে আমরা পরিবেশবান্ধব ও যাত্রী অনুকূল বাহন হিসেবে গণ্য করে থাকি। কিন্তু ঢাকার যে অবস্থা, তাতে রিকশা এখন বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। না আছে রিকশার নিবন্ধনের নিয়ন্ত্রণ, না আছে ভাড়া নির্ধারণের ব্যাপারে উদ্যোগ। রিকশা নিয়ে এই অরাজকতার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে দুই সিটি করপোরেশনই দায়ী বলে আমরা মনে করি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন- এটা সত্য, রিকশার নিবন্ধন ও ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব করপোরেশনের। দেশের বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশন এলাকায় সেটা করা হচ্ছে। কিন্তু রাজধানীতে রিকশার সংখ্যা নিয়ে আইনি ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে একটা জটিলতা রয়েছে। এই সুযোগে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল বিভিন্ন সংগঠনের নামে রাজধানীতে রিকশা নামাচ্ছে। রিকশার ভাড়া ও নিবন্ধন নিয়ে যে অরাজকতা চলছে, সেটা সমাধানের জন্য সরকারের উচ্চমহল থেকে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads