• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ৭ কার্তিক ১৪২৭
দুদকের নজরদারিতে বিমান

ছবি : সংগৃহীত

যোগাযোগ

দুদকের নজরদারিতে বিমান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৯ মে ২০১৯

দেশের একমাত্র সরকারি এয়ারলাইনস বিমান বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে সদ্যবিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) ১০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখন দুদকের নজরদারিতে রয়েছেন।

বিভিন্ন অনিয়মে ধুঁকছে সংস্থাটি। এর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এবার শুদ্ধি অভিযানে নেমেছে দুদক। বিভিন্ন শাখার পাশাপাশি সংস্থাটির অনেক ব্যক্তি দুদকের গোপন নজরদারিতে আছেন। তাদের গতিবিধি নজরে রাখা হচ্ছে। এমনকি যেকোনো সময় যে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হতে পারে।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, দুদকের চারটি দলকে বিমানের বিভিন্ন শাখার দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের সম্পদের অনুসন্ধানও করবে। বিমানের অন্তত ২০০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হবে বলে দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

গত ৩ মার্চ বিমান নিয়ে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক দলের একটি প্রতিবেদন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীর কাছে হস্তান্তর করে। তাতে বিমানের দুর্নীতির ৮ খাতকে চিহ্নিত করা হয়। সেগুলো হলো, এয়ারক্রাফট কেনা ও ইজারা নেওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ-ওভারহোলিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, কার্গো আমদানি-রফতানি, ট্রানজিট যাত্রী ও লে-ওভার যাত্রী, অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ, টিকেট বিক্রি ও ক্যাটারিং খাতের দুর্নীতি।

এদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ঘুষ নিয়ে ক্যাডেট পাইলট নিয়োগসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান করছেন সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম। গত ২ মে ১০ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বরাবর চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি। এসবির বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওসি (ইমিগ্রেশন) বরাবর চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়।

যাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তারা হলেন, বিমানের সদ্য পদত্যাগী এমডি আবদুল মুনীম মোসাদ্দিক আহম্মেদ, জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার-বিমান শ্রমিক লীগের সভাপতি ও বিমানের সিবিএ নেতা মশিকুর রহমান, গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার জিএম জাকির হোসেন, মিজানুর রহমান ও এ কে এম মাসুম বিল্লাহ, কমার্শিয়াল সুপারভাইজার রফিকুল আলম ও গোলাম কায়সার আহমেদ, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার মারুফ মেহেদী হাসান এবং কমার্শিয়াল অফিসার জাওয়েদ তারিক খান ও মাহফুজুল করিম সিদ্দিকী।

সূত্রমতে, দুদক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এরই মধ্যে পাইলট নিয়োগ সম্পর্কিত কিছু নথি সংগ্রহ করেছেন। আরো কিছু নথির অপেক্ষায় আছেন তিনি। নথি পাওয়ার পরপরই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে। দুদকের এই কর্মকর্তার হাতে বিমানের কারগো ও গ্রাউন্ড সার্ভিসের ৩৭ জনের সম্পদের অনুসন্ধান রয়েছে।

দুদকের একাধিক সূত্র জানায়, বিমানের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা লোপাটের একটি অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে বিমানের পরিচালক (বিপণন) আলী আহসান বাবু, শফিকুর রহমান, মোমিনুল ইসলাম ও মহাব্যবস্থাপক (জিএসই) তোফাজ্জল হোসেন আকন্দের বক্তব্য নিয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক সালাহ উদ্দিন। কমার্শিয়াল অফিসার মাহফুজুল করিম সিদ্দিকী ও তার স্ত্রীর সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছে। মাহফুজুল সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন দুদকে।

সূত্র আরো জানায়, বিমানের সদ্য পদত্যাগী এমডি আবদুল মুনীম মোসাদ্দিক আহম্মেদসহ অন্য কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও প্রকল্পের দুর্নীতি খোঁজার দায়িত্ব পেয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম। আরেক সহকারী পরিচালক সালাহ উদ্দিনকেও এই দলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

বিমানের কার্গো হ্যান্ডেলিং চার্জের ৭২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন উপপরিচালক নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি দল। তবে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ তদন্তে কার্গো শাখায় ৪১২ কোটি টাকা লোপাটের তথ্য বেরিয়ে আসে। অনিয়ম দুর্নীতির আরেকটি অভিযোগ অনুসন্ধান করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক আতাউর রহমান। এ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। পছন্দসই কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিয়ে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন- এমন একাধিক বোর্ড পরিচালককেও অনুসন্ধানের আওতায় আনার কথা রয়েছে।

বিমান, বিমানের যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং যন্ত্রাংশের বড় অঙ্কের কেনাকাটা এবং বিমান লিজের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে বলে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দুদক বলছে, বিমান এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং ইক্যুপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটায় শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি হয়ে থাকে। বিমানের বোর্ড পরিচালক ও কর্মকর্তারা লাভবান হওয়ার জন্য তাদের পছন্দসই প্রতিষ্ঠানকে ঠিকাদার নিয়োগ করে কার্যাদেশ দেয়। নিম্নমানের যন্ত্রাংশ অতি উচ্চ মূল্যে ক্রয় দেখিয়ে ঠিকাদার ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে টাকা আত্মসাৎ করা হয় বলে দুদক জেনেছে।

দুদকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, বিমানের দুর্নীতির অন্যতম খাত হলো গ্রাউন্ড সার্ভিস। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে উচ্চমূল্যে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা হয়। অদক্ষতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না কিনে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়। ওই সব যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। রক্ষণাবেক্ষণের মূল্যবান উপকরণও বিক্রি করে আত্মসাৎ করা হয়।

আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং কর্মী নিয়োগেও চলে ব্যাপক দুর্নীতি। এতে দিন দিন বাংলাদেশ বিমান অদক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারে পরিণত হয়েছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং বিল বাবদ বিভিন্ন এয়ারলাইন থেকে প্রতিদিন ফ্লাইট-টু-ফ্লাইট ভিত্তিতে লাখ লাখ টাকা বিল নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিভিন্ন এয়ারলাইনসে তাদের নিজস্ব উদ্যোগে গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিংয়ের অধিকাংশ কাজ করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন চুক্তি অনুযায়ী এয়ারলাইনসগুলোকে ন্যূনতম সেবাও দিতে পারে না। দুদক বলছে, বিমানের আয়ের একটি বড় খাত কার্গো সার্ভিস। এই খাতে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে কোটি কোটি টাকা এয়ারওয়ে বিল কম পাচ্ছে বিমান। আমদানি ও রফতানি পণ্যের ওজন ও ভলিউম রেকর্ডভিত্তিক কম দেখিয়েও বেশি পরিমাণ মালামাল বিমানে ওঠানো হয়। এই অতিরিক্ত টাকা আমদানি-রফতানিকারকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে।

ট্রানজিট যাত্রীদের হিসেব এদিক-সেদিক করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রতিদিন ট্রানজিট যাত্রীর সংখ্যা যতজন হয়, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে খাবারের বিল করে অতিরিক্ত টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। লে-ওভার যাত্রীদের জন্য নিয়ম অনুযায়ী হোটেলের প্রতি রুমে একজন রাখার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রতি রুমে ৪-৫ জন রাখা হয়। আর বিল তৈরি করা হয় জনপ্রতি।

দুদক বলছে, অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে তা মূল হিসাবে না দেখিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। যাত্রীদের বুকিং ট্যাগ এবং ফ্লাইট ডিটেইলে অতিরিক্ত ওজন দেখানো হয় না। দুদকের পর্যবেক্ষণের তথ্যমতে, প্রায়ই বাংলাদেশ বিমানের টিকিট পাওয়া না গেলেও বাস্তবে বিমানের আসন খালি যায়। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগসাজশে অন্য এয়ারলাইনসকে টিকেট বিক্রির সুবিধা করে দেওয়া হয়।

খাবারের ক্ষেত্রও ব্যাপক দুর্নীতির কথা বলেছে দুদক। নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের কারণে অনেক দেশি-বিদেশি বিমানের ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার (বিএফসিসি) খাবার দেয় না। এসব অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানের ক্ষেত্র আরো বাড়বে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads