• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
দুই তীরে মহা কর্মযজ্ঞ

ছবি : সংগৃহীত

যোগাযোগ

পদ্মা সেত‍ু

দুই তীরে মহা কর্মযজ্ঞ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বর্তমানে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ ও ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প পদ্মা সেতু। এ সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসবে। এই পদ্মা সেতুকে ঘিরে পদ্মার দুই তীরে এখন কাজের মহাযজ্ঞ চলছে। মূল সেতুর খুঁটি ও স্প্যান দৃশ্যমান অবস্থায় বড় বড় ক্রেন আর যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পদ্মায় এবং দুই তীর মিলে প্রায় নয় কিলোমিটারজুড়ে দেখা মিলবে দেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্পটির কর্মযজ্ঞ।

প্রকৃতির সঙ্গে স্বপ্নের এই পদ্মা সেতুর কাজে রয়েছে বিশেষ ছন্দ। শরতের প্রকৃতিতে এই কাজ পেয়েছে নতুন ছন্দ। ক্রমেই এগিয়ে থাকা সেতুর কাজে গতি ছড়াচ্ছে- যেন পদ্মায় নতুন ঝিলিক! আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের আরো অনেক কিছুই দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে। বর্ষাকে বিদায় জানাতে না জানাতেই সেই ঝলকানি শুরু হয়ে গেছে। মাওয়ায় আরেকটি স্প্যান এসেছে। এটা নিয়ে চীন থেকে আসা স্প্যানের সংখ্যা হলো ২৮টি। সমুদ্রপথ হয়ে সর্বশেষ স্প্যানটি মাওয়ার কুমারভোগ বিশেষায়িত কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে আসে। পরে এটি খালাস করা হয়েছে।

পদ্মা সেতুতে মোট ৪১টি স্প্যান বসবে। বাকি ১৩টি স্প্যান চীনে তৈরি হয়ে আছে, সেগুলোও কিছুদিনের মধ্যে মাওয়ায় এসে পৌঁছবে বলে দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন। মাওয়ায় আসা ২৮টি স্প্যানের মধ্যে অর্ধেক অর্থাৎ ১৪টি স্প্যান পিলারে বসনো হয়েছে। আরো দুটি স্প্যান সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় নদীতীরে স্টোর করে রাখা হয়েছে। দুটি স্প্যান পেইন্টিং করে প্রস্তুত অবস্থায় ইয়ার্ডের জেটির কাছে ক্রেন লাইনে রাখা হয়েছে। দুটি স্প্যানের পেইন্টিং করা হচ্ছে এবং দুটি স্প্যান ফিটিং অবস্থায় চূড়ান্ত পেইন্টিংয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। বাকি ছয়টি এখন জোড়া লাগানো হচ্ছে বা প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একদিকে যেমন স্প্যান প্রস্তুত করা হচ্ছে, আরেকদিকে সেতুর খুঁটি তোলা হচ্ছে। ৪২ খুঁটির মধ্যে ৩১টি সম্পন্ন হয়ে আছে। বাকি ১১ খুঁটির কাজ পুরোদমে চলছে।

সেতুর বাকি ১১ খুঁটি হচ্ছে- ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ২৬, ২৭, ২৯, ৩০, ৩১ ও ৩২। আগামী মার্চের মধ্যেই এই ১১ খুঁটির কাজ সম্পন্ন হতে যাচ্ছে বলে জানান প্রকৌশলীরা। এদিকে মাঝের চরের চ্যানেলে এবারো ব্যাপক পলি জমেছে। পানি কমতে শুরু করায় এবং স্রোত হ্রাসে খুঁটির পাইলের ভেতর স্ক্রিন গ্রাউটিং এবং কংক্রিটিংয়ের কাজ চলছে। অন্যদিকে বর্ষায় গত বছরের মতো প্রচুর পলি জমা হয়েছে। অনেকটা চরের মতো। মাওয়া প্রান্তের ১৭ নম্বর খুঁটি থেকে ৩২ নম্বর খুঁটি পর্যন্ত এলাকায় বর্ষায় পলি জমে নাব্য সংকট দেখা দিয়েছে। তাই এই চ্যানেলে সাড়ে তিন হাজার টন ধারণ ক্ষমতার স্প্যানবাহী জাহাজটি প্রবেশ করতে পারছে না। তাই খুঁটি ও স্প্যান প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও নতুন করে স্প্যান বসানো যাচ্ছে না। নদীশাসনের কাজে নিয়োজিত সিনো হাইড্রো কোম্পানির উচ্চ ক্ষমতার দুটি ড্রেজার রাত-দিন ড্রেজিং করে চলেছে। আগামী ৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই ড্রেজিং সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। এরপরই স্প্যান বসা শুরু হবে এবং একটানা ৬টি স্প্যান বসিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান। পদ্মা সেতু এখন ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দৃশ্যমান হয়েছে। অক্টোবরের মধ্যে ৩ কিলোমিটার দৃশ্যমান হবে বলে তাদের ধারণা।

পুরো প্রকল্পজুড়ে দেশি-বিদেশি কর্মীদের ব্যস্ততা। দিনের বেলায় পুরো সময় ধরে যে ব্যস্ততা, রাতেও দিনের মতো কাজের গতি চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঠিকাদারকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তাই মূল সেতুটির ঠিকাদার চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানি কাজের গতি বাড়িয়েছে, যা আরো বাড়ানো হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। সব নকশাসহ যাবতীয় চ্যালেঞ্জ সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এখন সময় ক্ষেপণের কোনো অজুহাত দেখানোর সুযোগ নেই। তাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেঁধে দেওয়া সময়ে কাজ সম্পন্ন করায় মনোযোগ দিয়েছে। বর্ষা বিদায় নেওয়ার কারণে পদ্মার দু’পাড়ে নদীশাসনের কাজেও গতি আনা হচ্ছে। আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো কোম্পানি নদীশাসনের কাজ করছে। তবে নানা কারণে এখনো নদীশাসনের কাজ অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে।

ওদিকে সেতুর দু’পাশের প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ভায়াটাক্টের (সংযোগ সেতু) কাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে। জাজিরা প্রান্তে মাত্র দুটি খুঁটির এবং মাওয়া প্রান্তে মাত্র ১৩টি খুঁটির ক্যাপ ঢালাইয়ের কাজ চলছে। আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে পদ্মা সেতুর সংযোগ সেতুর খুঁটির কাজ পুরোপুরি সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাজিরা প্রান্তে সেতুর ৩২২ রেলওয়ে স্লাব বসেছে, রোডওয়ে স্লাব বসেছে ২৯টি, সুপার টি বসেছে ১৭টি এবং আই গার্ডার বসেছে ৪২টি।

এদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত বিদ্যুৎ টাওয়ারের কাজও এগিয়ে চলেছে। ৭ ও ৮ নম্বরে টাওয়ারের পাইল বসছে। ৭ নম্বর টাওয়ারে দুটি এবং ৮ নম্বর টাওয়ারে তিনটি মোট পাঁচটি পাইলের বটম সেকশন বসানো হয়েছে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের সার্বিক অগ্রগতি শতকরা ৭৩ ভাগ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ২০২১ সালের জুনের মধ্যেই পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে। প্রকল্পের কাজ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ হবে। তবে ফিনিশিংসহ অন্যান্য কার্যসম্পাদন করতে আরো ৫-৬ মাস লাগবে। আশা করছি, ২০২১ সালের জুনের মধ্যেই পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু করবে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং সংযোগ সেতুসহ প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এ বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হবে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে এ সেতুর কাঠামো।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads