• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads

যোগাযোগ

সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮

গাড়ি রাস্তায় না থাকায় জনদুর্ভোগ 

জনসচেতনতা ও বৈধ কাগজপত্রের অভাব

  • মো. রেজাউর রহিম
  • প্রকাশিত ০৪ নভেম্বর ২০১৯

প্রয়োজনীয় জনসচেতনতার পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের আইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকা এবং সড়কে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় শুরুতেই সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকরে জটিলতা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে রাজধানীতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন পথচারী ও সাধারণ মানুষ। গত ১ নভেম্বর থেকে চালু হয়েছে নতুন সড়ক পরিবহন আইন। নতুন এ আইন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জনসচেতনতার অভাব, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং বৈধ কাগজপত্র না থাকা বাস-সিএনজি রাস্তায় বের না হওয়ায় গণপরিবহনের ঘাটতিতে জনদুর্ভোগ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়া বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ার ফলে আইনটি কার্যকরের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।  

সরেজমিন দেখা গেছে, গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে এবং বাসস্ট্যান্ডগুলোতে প্রয়োজনীয় গণপরিবহন বিশেষ করে বাস এবং সিএসজি চালিত অটোরিকশার সংখ্যা ছিল কম। ফলে অফিসগামী যাত্রী ও সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাবে যাতায়াতে নারী ও শিশুদেরও বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। মূলত বৈধ কাগজপত্র না থাকা বাস-সিএনজির একটি বড় অংশ রাস্তায় বের না হওয়ায় গণপরিবহনের ঘাটতিতে এ জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা সৃষ্টি না করে এ আইনটি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করার ক্ষেত্রে ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ পরিপূর্ণভাবে কার্যকরে আরো কিছু বাড়তি সময় প্রয়োজন হতে পারে।

এদিকে, নতুন এ আইনটি নিয়ে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে, আইনে বর্ণিত শাস্তি কমানোর দাবি করছেন চালকরা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ আইনটিকে স্বাগত জানালেও আইনটি প্রয়োগের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি ছিল বলে জানিয়েছেন। ফার্মগেট বাসস্ট্যান্ডে বাসের অপেক্ষায় থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রবিউল হোসেন বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করা হয়েছে বলে শুনেছি। এটা খুব ভালো উদ্যোগ। তবে এটা কার্যকরের আগে প্রয়োজনীয় যানবাহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের মাথায় রাখা উচিত ছিল। এছাড়া জনসাধারণ এবং গাড়িচালকদের মধ্যে আইনটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তাদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ফলে জনসাধারণ যাতে দুর্ভোগের স্বীকার না হন, সে বিষয়ে সরকারকে নজর দেওয়া উচিত। সেখানে আলাপ হয় মিজানুর রহমান নামের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তার ভাষ্য, নতুন আইন বাস্তবায়নের আগে সচেতনতাও তৈরি করা জরুরি। যেন আইন অমান্যের ক্ষেত্রে আইনে বর্ণিত চালক ও পথচারীদের শাস্তির বিষয়টা সবাই জানতে পারে। তবে জয়নাল আবেদিন নামের তার পাশে থাকা আরেকজন বলেন, আইন সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত গণমাধ্যমে পড়েছেন। তবে উচ্চ জরিমানার কারণে আইনটির যথাযথ প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন সরকারের পক্ষে বেশ কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে করেন তিনি। কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারা মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট জলিল আহমেদ বলেন, নতুন কোনো আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটু সময় লাগতেই পারে। অনেক সময় চালু হওয়া মাত্রই সেটা কার্যকর করা সম্ভব হয় না। আইনটি সম্পর্কে এখনো অনেকে বিশেষ করে চালক-পথচারীদের অনেকেই সচেতন নন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। 

এদিকে, আইন কার্যকর হওয়ার আগে সেটার প্রচারণা না হওয়ার বিষয়টিতে আপত্তি থাকলেও পরিবহন চালক ও তাদের সহকারীরা বলছেন, আইনের ধারায় আরো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় আইনে বর্ণিত শাস্তির ভয়ে দেশে পরিবহন চালক সংকট তৈরি হতে পারে। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে মিরপুর-গুলিস্তানগামী বাসের চালক আবদুর রহমান বলেন, আইন হলে মানতে আমরা রাজি আছি। সেটা লেন হোক আর লাইসেন্সের বিষয়ে হোক। কিন্তু সড়কে সাধারণ মানুষের পারাপারের ক্ষেত্রে জেব্রাক্রসিং ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে এবং মোবাইল ফোন কানে নিয়ে রাস্তার পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার স্বীকার হলে তার দায় গাড়ির চালকের ওপর চাপানো এবং শাস্তি প্রদান ঠিক হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। মিরপুর-যাত্রাবাড়ি রুটের শিকড় পরিবহনের একজন চালক বলেন, সরকার অবশ্যই ভালো মনে করছে বলে আইন করছে, ভালো হইছে। তবে আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনটি বাস্তবায়নের জন্য আরো প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। কারণ সড়ক-মহাসড়কের অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। এ ব্যাপারে পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, এই আইনের সার্থকতাটা তখনই হবে, যখন আর মানুষকে আইনের ভয় দেখানোর প্রয়োজন হবে না। তবে আইনটা যুগোপযোগী এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে করা হয়েছে কি না-সেটা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের আগে জনগণ ও পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো প্রয়োজন ছিল।

উল্লেখ্য, নতুন এ আইনে রাস্তা পারাপারে পথচারীদেরও সচেতন থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার ক্ষেত্রে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে হবে। তা না হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। এদিকে, নতুন সড়ক পরিবহন আইনকে স্বাগত জানালেও আইনটির কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। এছাড়া আইনটির বিধিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন তারা।

উল্লেখ্য, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে প্রচলিত আইনকে আরো কঠোর করে গত বছর সড়ক পরিবহন আইন পাস হয়। ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকরের জন্য গত ২৮ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ধারা ১ এর উপ-ধারা (২) এ দেওয়া ক্ষমতাবলে সরকার ১ নভেম্বর তারিখকে আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করল। গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট জারি করা হলেও তার কার্যকারিতা এতদিন ঝুলে ছিল। এই আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। গত বছর আগস্টে আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার। জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর গত বছরের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট জারি হয়। কিন্তু গেজেট জারির পরও আইনটি কার্যকর না হওয়ায় আদালতে রিট আবেদনও হয়েছিল। আর আইনটি প্রণয়নের পর থেকে এটির প্রবল বিরোধিতা করে আসছিল পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনার মামলায় নতুন আইনে শাস্তির মাত্রা অযৌক্তিকভাবে বেশি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads