• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
মাদকাসক্তরা চালাচ্ছে নিরাময় কেন্দ্র, সনদ মিলছে টাকায়

মাঠ পর্যায়ের কিছু মাদক বিক্রেতা গ্রেফতার এড়াতে রাজধানীর বিভিন্ন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে

সংরক্ষিত ছবি

অপরাধ

মাদকাসক্তরা চালাচ্ছে নিরাময় কেন্দ্র, সনদ মিলছে টাকায়

পলাতকদের একাংশ তাবলিগে আরেক অংশ নিরাময় কেন্দ্রে

  • আজাদ হোসেন সুমন
  • প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০১৮

মাদকবিরোধী অভিযানে নিখোঁজ মাদক বিক্রেতারা। আবার অনেকে ধরা পড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। অন্যদিকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যু হয়েছে অনেকের। মাঠ পর্যায়ের কিছু মাদক বিক্রেতা গ্রেফতার এড়াতে রাজধানীর বিভিন্ন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। আরেক অংশ ঘুরছে তাবলিগ জামাতে। মিরপুর এলাকার বেশ ক’টি নিরাময় কেন্দ্র ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

গত বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার দিকে মিরপুর শাহআলী মাজারের পেছনের রাস্তায় নিরাময় কেন্দ্র ‘ছায়ানিবাসে’র দরজা নক করতেই বেরিয়ে এলেন চোখ ছানাবড়া করা তিন যুবক। ভেতরে ঢুকে নাকে লাগল বিস্কুটের গন্ধ। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর রুমের ভেতরে সুগন্ধি স্প্রে করতে লাগলেন আরেক যুবক। ততক্ষণে বোঝার বাকি নেই তারা কী করছিলেন। মালিক বা কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করতে চাইলে সুমন নামে এক যুবক বলেন, আমিই মালিকদের একজন।

মাদকাসক্তদের (রোগী) কী সেবা দিয়ে থাকেন এবং কীভাবে রোগী আসে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণত পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়। পরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একটি টিম গিয়ে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে নিয়ে আসে। অনেক সময় মাদক মামলার আসামিদের ডাক্তারি সার্টিফিকেট দিয়ে জামিনের জন্য সহযোগিতা করা হয়। নিরাময় কেন্দ্রে তিন ডাক্তার রয়েছেন বলা হলেও তাদের কারো দেখা মেলেনি। মাদকবিরোধী অভিযান  শুরুর পর রোগী বেড়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তেমন একটা বাড়েনি। তবে কেউ নিজের ইচ্ছায় ভর্তি হতে চাইলে তাকে ভর্তি করা হয়।

প্রায় অভিন্ন অবস্থা দেখা যায় মিরপুর বেড়িবাঁধে ‘অনুসন্ধান’ নামক আরেকটি কেন্দ্রে। ভেতরে গিয়ে দেখা যায় একটি কক্ষ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। খালি গায়ে রুমে থাকা চার যুবক কিছু একটা সেবন করছিলেন। তবে সেখানে বিস্কুটের গন্ধ পাওয়া যায়নি। এক যুবক বেরিয়ে এসে বললেন, এ প্রতিষ্ঠানে কোনো অনিয়ম নেই। মাঝে মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন পরিদর্শন করে যান। পরে ওই কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন যুবক ইয়াসীন আলী। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। তিনি ওই চার যুবককে দেখিয়ে বলেন, আমরা সকলেই মাদকে আসক্ত ছিলাম। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম। এখন চিকিৎসা নিয়ে নিজেরাই মাদকাসক্তদের ভালো পথে ফেরানোর কাজ করছি। ২০ জন রোগী রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাজধানীর ৯৯ ভাগ নিরাময় কেন্দ্রই চলে একসময় মাদকাসক্ত পরে ভালো হয়ে যাওয়াদের মাধ্যমে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মাদকে আসক্তদের দুঃখ তারাই ভালো বোঝেন। একজন ভালো মানুষ কখনোই বুঝবে না আসক্তদের বিষয়। তার প্রতিষ্ঠানেও তিনজন ডাক্তার রয়েছেন জানালেও কাউকে দেখাতে পারেননি। বছরখানেক ধরে চালু হওয়া ওই প্রতিষ্ঠানে ৩০ জন রোগী রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের আবেদন করলেও এখনো অনুমোদন পাননি তারা। এই প্রতিষ্ঠানের পাশেই ‘নিউ ফিউচার লাইফ’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেল উল্টোচিত্র। নিচতলায় প্রতিষ্ঠানটির অফিস। দোতলায় বড় একটি কক্ষে রাখা হয়েছে রোগীদের। সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য পালাক্রমে ডিউটি করছেন প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা। একজন ডাক্তার ও একজন কাউন্সিলরকে দেখা গেছে।

প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আল-আমিন রনি বলেন, সকাল থেকেই কাউন্সেলিং, শেয়ারিং এবং মোটিভেশনের কাজ চলে এখানে। কোনো রোগীকে একা একটি কক্ষে রাখা হয় না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করা বাধ্যতামূলক এখানে। একজন আরেকজনের বন্ধু হিসেবে সময় কাটান রোগীরা। বেশিরভাগ রোগী ইয়াবা ও হেরোইনে আসক্ত। তিনি নিজেও একসময় মাদকে আসক্ত ছিলেন। এখন অন্য রোগীদের ভালো পথে ফেরানোর কাজ করছেন। আরো বলেন, একজন ইয়াবাসেবী সাধারণত এসি রুমে বসে নেশা করে। আর ফুটপাথে বসে নেশা করে ড্যান্ডিসেবীরা। এ প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসা এই দুই ধরনের রোগীই সমান চোখে দেখা হয় বলে জানান তিনি। এ ছাড়াও আশ্রয় নীড়, সূর্যোদয়, সুপার লাইফ, আশ্রয়, গোল্ডেন লাইফ নামক প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধ কাগজপত্রের মাধ্যমে সুনামের সঙ্গে নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে। পরিবর্তন নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন আগে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, আসলে মাদকসেবীরা নিরাময় কেন্দ্র চালাচ্ছেন বিষয়টি তেমন না। একসময় মাদকাসক্ত ছিলেন পরে ভালো হয়ে সেবা দিচ্ছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে আবেদন করেছে। তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করায় গত কয়েক মাসে ১০টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলো মনিটরিংয়ের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads