• বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
জামায়াতে টাকা লুটপাট

লোগো জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ

অপরাধ

জামায়াতে টাকা লুটপাট

# বায়তুল মাল-এর ৩৫ কোটি টাকা হাপিস # অভিযুক্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান # ফুঁসে উঠেছে দলের কর্ম পরিষদ

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আর্থিক তহবিল— ‘বায়তুল মাল’ থেকে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। ‘সৎ লোকের শাসন’ কায়েমে প্রত্যাশী ধর্মভিত্তিক দলটিতে এই প্রথম কোনো বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেল।

অর্থ আত্মসাতের এই অভিযোগ দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ কেলেঙ্কারিতে দলের আমির মাওলানা মকবুল আহমদও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। দলের গঠনতান্ত্রিক বিধি ভেঙে তিনি এ বিপুল অঙ্কের টাকা লোপাট করেছেন বলে ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রমাণও মিলেছে। নির্বাহী কমিটি ও দলের কর্মপরিষদের একাধিক সদস্য বাংলাদেশের খবরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সেক্রেটারি জেনারেল তহবিল সরানোর ঘটনাকে লোপাট না বলে বেহাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন নিজ দলের কাছে। বাংলাদেশের খবরের কাছে এ প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দুর্নীতির এ ঘটনায় জামায়াতের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, কেন্দ্র থেকে পাড়া-মহল্লার ক্ষুদ্র নেতাকর্মীদের কষ্টার্জিত জমানো টাকা লোপাট দলের আদর্শ পরিপন্থি। সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক মুক্তি এবং বিদেশ সফরের নেপথ্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘সমঝোতা’র যে গুঞ্জন শোনা যায়, তাতেই বায়তুল মালে হাত পড়েছে কি না, সে আলোচনাই এখন জামায়াতের টপ টু বটম।

জামায়াতে ইসলামীর রোকন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বাংলাদেশের খবরকে বলেন, জামায়াতের আর্থিক তহবিল ‘বায়তুল মাল’ নামে পরিচিত। সংগঠনকে মজবুত করার লক্ষ্যে এ তহবিলেই দেশ-বিদেশের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভানুধ্যায়ীরা মাসিক আয়ের একটি অংশ জমা দেন। সংগঠনের জনপ্রিয় মুরব্বিকে এ তহবিল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলের বিশেষ প্রয়োজনে বিভিন্ন রকমের খরচ এ তহবিল থেকে নিয়েই করা হয়। অনুকূল পরিবেশ থাকলে নির্দিষ্ট সময় পরপর এসব খরচের হিসাব অডিটও হয়। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই এই দায়িত্ব পালন করেছেন। বায়তুল মাল পরিচালনার দায়িত্বে আগে ছিলেন মাওলানা আবদুল মান্নান। তার সময় পর্যন্ত এ ধরনের আর্থিক অনিয়মের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মান্নানকে সরিয়ে তহবিলের দায়িত্ব দেওয়া হয় বগুড়ার অধ্যক্ষ মাওলানা শাহাব উদ্দিনকে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু হয় বায়তুল মালের টাকা লোপাটের ঘটনা। তহবিলের কিছু অনিয়মের প্রতিবাদ করায় নায়েবে আমির আতাউর রহমানকে বহিষ্কার করা হয় ভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে। সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন।

কর্মপরিষদের এক সদস্য বলেন, শীর্ষ নেতাদের এত বড় দুর্নীতির সমালোচনা তো দূরের কথা, তাদের নিয়ে কিঞ্চিত নেতিবাচক মন্তব্যের সাহস কর্মী-সমর্থকরা রাখেন না। তাহলে আর সংগঠনে থাকা হবে না। অবস্থা হবে নায়েবে আমির আতাউর রহমানের মতোই।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির পর ২০১৬ সালে সে পদের দায়িত্ব পান সিলেটের ডা. শফিকুর রহমান। এর আগে ‘আপদকালীন’ ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন এটিএম আজহারুল ইসলাম, ডা. শফিকুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও এটিএম মা’ছুম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাহী কমিটির এক সদস্য জানান, সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান বিভিন্ন ভাউচারের মাধ্যমে প্রায় সাত কোটি টাকা বিভিন্নজনের নাম দিয়ে আসলে নিজেই খরচ করেছেন। কিছু টাকা তার কয়েকজন অনুসারীকেও দিয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন তাদের মতাদর্শের পত্রিকার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জামাতা, কৃষিবিদ ও জামায়াতের এক রোকন, সংগঠনের আরেক রোকন উত্তরার ব্যবসায়ী। টাকা নিয়ে নিজ নামে জমি কিনে তিনি এখন দুবাই রয়েছেন, একটি ওষুধ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও বায়তুল মালের অর্থ সুবিধা পেয়েছেন।

আলাপকালে জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, এই লেনদেনের সিদ্ধান্ত নির্বাহী কমিটির ছিল না। শফিকুর রহমান সেক্রেটারি জেনারেলের ‘প্রভাব খাটিয়ে’ বায়তুল মাল পরিচালক মাওলানা শাহাব উদ্দিনকে টাকা দিতে বাধ্য করেন। বায়তুল মালের টাকা লোপাটের ঘটনা প্রকাশ পেলে কার্যনির্বাহী কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একাধিক সভা করে। চলতি মাসেও অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির সভায় শফিকুর রহমানের কাছে ওই টাকার সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়। ডা. শফিকুর কমিটিকে জানিয়েছেন, সব টাকাই আছে। তবে যাদের কাছে গচ্ছিত আছে তারা ফেরত দিতে টালবাহানা করছেন। যাকে বেহাত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন নির্বাহী কমিটির কাছে।

জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে অর্থ লোপাটকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার খসড়া সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর অংশ হিসেবে জেলা আমিরদের কাছে মতামত চেয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি। কারণ নির্বাহী কমিটির শীর্ষ অনেক নেতাই এখন কারাগারে।

জামায়াতে ইসলামীর মজলিশে শুরার এক সদস্য বলেন, তাদের বৈঠক হয় না ছয় বছর। সংগঠনের সর্বোচ্চ ফোরাম কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে পরিচালিত হয় বায়তুল মাল। এ কমিটির বৈঠকও হয়নি দীর্ঘদিন। সিদ্ধান্ত নেন গ্রেফতার এড়িয়ে চলা ও জামিনে থাকা শীর্ষ কয়েকজন নেতা। তারা জেলা আমির ও বিভিন্ন কমিটির সদস্যদের কাছ থেকেও পরামর্শ নেন।

গোপনে বৈঠক করে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে ২০১৭ সালের ৯ অক্টোবর রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে জামায়াতের আমির মাওলানা মকবুল আহমদ ও সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমানসহ ৮ নেতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই বছরের ২২ অক্টোবর তাদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর ৩০ অক্টোবর শফিকুর রহমানকে কাশিমপুর কারাগারে (নম্বর-১) স্থানান্তর করা হয়। গত ১০ জুলাই রাতে জামায়াতের আমির মাওলানা মকবুল আহমদ গাজীপুর কারাগার-২ থেকে মুক্ত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার তদন্ত চলছে।

গত ২১ মার্চ একই কারাগার থেকে মুক্তি পান ডা. শফিকুর রহমান। ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব যান গত ১১ মে। সেখান থেকেই পাকিস্তান সফর করে গত ৩১ মে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে রয়েছে নাশকতাসহ ১২ মামলা।

বায়তুল মালের অর্থ লোপাট প্রসঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট নগর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেছেন, এ-সংক্রান্ত কোনো বিষয় তার জানা নেই। বায়তুল মালের হিসাব স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালিত হওয়ার কথাও জানান তিনি।

জামায়াতের নায়েবে আমির সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার তহবিল তছরুপ প্রসঙ্গে বলেন, জামায়াতের এমন রেকর্ড নেই। ‘বায়তুল মাল’ তহবিলটি প্রতি মাসে অডিট হয়। আমার কাছে বিষয়টি উদ্ভট মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি সংগঠনের উচ্চপর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছি। সংগঠনের জন্য আমাদের ত্যাগ রয়েছে। আপনার সহযোগিতার জন্যই বলছি- এ পথে পা বাড়াবেন না, আপনি বিপদে পড়বেন। আমিও সাংবাদিক ছিলাম। জামায়াতের বিরুদ্ধে অনেক নিউজ আছে সেগুলো লিখুন।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads