• মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
তানিয়াকে প্রথম ধর্ষণ করে চালক

ছবি : সংগৃহীত

অপরাধ

তানিয়াকে প্রথম ধর্ষণ করে চালক

বাসের গায়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ

  • কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ১২ মে ২০১৯

কিশোরগঞ্জে চলন্ত বাসে নার্স শাহীনুর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যায় জড়িত সন্দেহে রিমান্ডে থাকা আটকরা মুখ খুলতে শুরু করেছে। রিমান্ডে স্বর্ণলতা বাসের চালক নূরুজ্জামান ও হেলপার লালন মিয়া ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তাদের কথামতো স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৪২৭৪) গাজীপুরের কাপাসিয়ার টোক থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাসটির তিন জায়গায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। এছাড়া রিমান্ডে থাকা আসামিরা জানায়, প্রথমে তানিয়াকে ধর্ষণ করে চালক নূরুজ্জামান। এ সময় হেলপার বাসিটি চালিয়ে যায়। তারা তানিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলেও মিথ্যা নাটক সাজানোর চেষ্টা করে। হাসপাতালে চিকিৎসকদের সন্দেহ হলে পুলিশকে জানানো হয়। এছাড়া ধর্ষণের পর তানিয়ার মাথার পেছনে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে অন্য একটি বাসের কথা বলেছিল আসামিরা। সেই বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৬২৮৫) আগেই আটক করেছিল পুলিশ। সেই বাসে ধর্ষণ বা হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। পরে চালক নূরুজ্জামান ও হেলপার লালনের কথায় পুলিশের সন্দেহ হয়। রিমান্ডের শুরুতে এলোমেলো কথা বলে আসামিরা। পরে প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে তারা অপরাধ স্বীকার করে। আসামিদের কথামতো উদ্ধার করা হয়েছে তানিয়ার ব্যাগের কাপড়-চোপড়, তানিয়ার ব্যবহূত মোবাইল ফোন ও তানিয়ার সঙ্গে থাকা টেলিভিশন।

পুলিশের কাছে নূরুজ্জামান ও লালন মিয়া স্বীকার করেছে, ধর্ষণ ও হত্যায় তারা নিজেরাসহ সরাসরি আরো একজন জড়িত ছিল।

পুলিশের কয়েকটি সূত্র জানায়, ধর্ষণ ও হত্যার পর ধর্ষণকারীরা বিষয়টি সড়ক দুর্ঘটনা প্রমাণ করতে নাটক সাজিয়েছিল। ধর্ষণের পর তানিয়াকে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়ার পর ধর্ষকরা নিজেরাই আবার ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে মেয়েটিকে পড়ে থাকতে দেখে অনেক স্থানীয় মানুষও এগিয়ে আসে। কিন্তু ধর্ষকরা স্থানীয়দের জানিয়েছিল, এয়ারফোনে গান শুনতে শুনতে মেয়েটি বাস থেকে পড়ে গেছে, আমরাই হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। তাদের কথা বিশ্বাসও করেছিল স্থানীয়রা। পরে অচেতন অবস্থায় তানিয়াকে পিরিজপুর বাজারের সততা ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ফার্মেসি থেকে মেয়েটিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার কথা বললে স্বর্ণলতা বাসের স্টাফ আল আল আমিন ও রফিকে দিয়ে কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায় তারা। এরপর তানিয়াকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনার বর্ণনা দেয় চালক ও হেলপার। হাসপাতালের আশপাশ থেকে রফিককে গ্রেফতার করলেও পালিয়ে যায় আল আমিন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজিতপুর থানার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলন্ত বাসের দরজা জানালা লাগিয়ে তানিয়াকে ধর্ষণ করে তারা। হেলপারকে গাড়ি চালাতে দিয়ে প্রথমে চালক তাকে ধর্ষণ করে। এরপর আরো দুজন ধর্ষণ করে তাকে। তানিয়া নিজেকে বাঁচাতে সজোরে তাদের কিল ঘুষিও মারে। ধর্ষণের পর তানিয়াকে গলা টিপে বা অন্য কোনো উপায়ে হত্যা করতে চেয়েছিল ধর্ষণকারীরা। এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে তাদের বািবতণ্ডা হয়। পরে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা।

জেলা পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, আমরা একেবারেই নিশ্চিত তানিয়াকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

কটিয়াদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাজরিন তৈয়ব বলেন, মেয়েটিকে যারা নিয়ে এসেছিল, তারা সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাদের কথার সঙ্গে তানিয়ার শরীরের আঘাতের চিহ্ন ও সার্বিক বাস্তবতা মিলছিল না। তাই আমরা তাদের বুঝতে না দিয়ে দ্রুত পুলিশকে খবর দিয়েছিলাম। পুলিশ এসে ঘটনাস্থলেও তাদের পেয়েছিল। হঠাৎ শুনলাম ছেলে দুটো পালিয়ে গেছে। প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল মেয়েটির সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে।

ময়নাতদন্তের দায়িত্বে থাকা সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্তে তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। মেয়েটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এটা নিশ্চিত। ধর্ষণের পর তার মাথার পেছনে প্রচণ্ডভাবে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। মাথার খুলির পেছনের অংশ দুই ভাগ হয়ে গেছে। মাথার ভেতর প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এমন আঘাতের পর সঙ্গে সঙ্গে মারা যাওয়ার কথা। যদি সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু নিশ্চিত না হয় তবে সর্বোচ্চ ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে।

তানিয়াকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় তার বাবা গিয়াসউদ্দিন বাদী হয়ে ৭ মে রাতে বাজিতপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু (৩৯) ও হেলপার লালন মিয়াসহ (৩২) মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত বুধবার আটকদের কিশোরগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

উল্লেখ্য, গত ৬ মে সোমবার রাতে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের পিরিজপুর রুটে চলাচলকারী ‘স্বর্ণলতা’ নামক বাসে নার্স তানিয়াকে ধর্ষণের পর মাথার পেছনে আঘাত করে হত্যা করা হয়। তিনি কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরি ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াসউদ্দিনের মেয়ে। তানিয়া ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালের কল্যাণপুর ক্যাম্পাসে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওইদিন রাতে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলায় কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের বিলপাড় গজারিয়া নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তানিয়া ঢাকা থেকে নিজ গ্রামে ফিরছিলেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads