• রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
আইএস জঙ্গিরা দেশে ফিরে আসা দুশ্চিন্তার

সংগৃহীত ছবি

অপরাধ

আইএস জঙ্গিরা দেশে ফিরে আসা দুশ্চিন্তার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ০৩ জুলাই ২০১৯

সিরিয়ায় আইএসের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর বিদেশি যোদ্ধা বা ফরেন টেরোরিস্ট ফাইটার (এফটিএফ) কিংবা জঙ্গিদের নিয়ে সারা বিশ্বে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে যাওয়া বাংলাদেশি জঙ্গিরাও দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এসব জঙ্গি যে কোনো পথে দেশে ফেরার চেষ্টা করবে। তারা ফিরতে পারলে দেশে আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকা জঙ্গি তৎপরতা বিপজ্জনক মাত্রা পাওয়ারও শঙ্কা আছে। ফিরতে চাওয়া জঙ্গিরা নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এর মাঝেই গতকাল সোমবার রংপুরে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী জানিয়েছেন, সিরিয়ায় শেষ ঘাঁটি পতনের পর আইএসে যোগ দেওয়া কোনো বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরে আসেনি।

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সরাসরি বাংলাদেশ থেকে সিরিয়ায় যাওয়া জঙ্গির সংখ্যা ৪০ জনের মতো। এর বাইরে নানা দেশ থেকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শতাধিক পুরুষ ও নারী সিরিয়া ও ইরাকে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এসব বাংলাদেশির মধ্যে অনেকে আইএসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও ছিলেন। এর মধ্যে সাইফুল ইসলাম সুজন আইএসের শীর্ষস্থানীয় ১০ জনের একজন ছিলেন। আর এই সাইফুলের পরামর্শেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক তামিম চৌধুরী ঢাকায় আসেন। তিনি এ দেশের উগ্রপন্থিদের একটা অংশকে সংগঠিত করে আইএসপন্থি নতুন জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলেন। এরপর হলি আর্টিজানের মতো ভয়ংকর জঙ্গি হামলা ছাড়াও দেশে বেশ কিছু হত্যাযজ্ঞ চালান।

জঙ্গি দমনে জড়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো বলছে, সরাসরি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া জঙ্গিদের নাম-পরিচয় ও সংখ্যা মোটামুটি জানা আছে। তবে তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অনেকে আইএসের হয়ে লড়তে গিয়েছিলেন সিরিয়ায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিরিয়ায় গেছেন যুক্তরাজ্য থেকে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ার মতো দেশ থেকেও কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ইরাক ও সিরিয়া গেছেন কি না, এ বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই। অন্যান্য দেশ বা প্রবাসী শ্রমিকদের কেউ যদি গিয়ে থাকেন, তারা যদি প্রবাসী শ্রমিক পরিচয়ে ফিরে আসেন, তবে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে গত মে মাসে ঢাকায় মুতাজ আবদুল মজিদ কফিলুদ্দিন নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সৌদি আরবে জন্ম নেওয়া এই যুবক সিরিয়ায় আইএসের হয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফেরেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মুতাজকে মূলত তুরস্কের পুলিশ আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। তবে মুতাজের বাইরে এমন আর কেউ দেশে ফিরেছেন কি না, সেটা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় আইএস জঙ্গিবিরোধী এক অভিযানে সে দেশের পুলিশ মালয় ও ইন্দোনেশীয়দের সঙ্গে এক বাংলাদেশিকেও গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশি ওই যুবক জাহাজের টেকনিশিয়ান ছিলেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী আপন দুই ভাই ইব্রাহিম হাসান খান ও জুনায়েদ হাসান খান নামের দুই জঙ্গিও দেশে ফিরতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তথ্য বলছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে বসবাস করেন। তবে তারা যখন সিরিয়াতে যান, তখন ঢাকা হয়েই গেছেন। বাংলাদেশ ছাড়ার আগে এই দুই ভাই সপরিবারে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় থাকতেন।

অন্যদিকে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বাংলাদেশে এখনো জঙ্গি হামলার ঝুঁকি রয়ে গেছে। ইন্টারপোলের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করলেও এখনো দেশটি জঙ্গিদের কোনো নজরদারির তালিকা তৈরি করেনি।

এমন সব আশঙ্কা থেকে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিইউ) দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ থেকে যারা সিরিয়ায় গেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশে ফিরে আসার চেষ্টা করছেন। বিমানবন্দরগুলোতে তাদের ছবিসহ প্রয়োজনীয় সব তথ্য দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি কোনো জঙ্গি এসেই পড়ে, সে বা তারা যেন কোনোভাবেই গ্রেপ্তার এড়াতে না পারেন, সে বিষয়ে আমরা সর্তক আছি।

উল্লেখ্য, সিরিয়া ও ইরাকে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএস খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার পরে বিশ্বের অনেক দেশ থেকে নাগরিকরা তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। সেই তালিকায় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যক্তিসহ বিদেশে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকরাও রয়েছেন।

কোনো আইএস সদস্য বাংলাদেশে ফেরেনি : পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছেন, আইএসের পক্ষ থেকে জঙ্গিদের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গিয়ে তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত আইএসে যোগদানকারী বাংলাদেশি কেউ দেশে ফিরে আসেনি।

গতকাল সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয়ে সমন্বিত সিসিটিভি মনিটরিং ব্যবস্থা, মেট্রোপলিটন পুলিশের ওয়েবসাইট চালু ও কর্মবণ্টন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান শেষে আইজিপি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

পুলিশের মহাপরিদর্শক বলেন, জেএমবির কেউ কেউ আইএসের অনুসারী হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা তাদের নজরদারিতে রেখেছি, গ্রেপ্তার করছি। গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় তাদের যে কোনো পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে পারব।

রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, চার্জশিট দেওয়ার পর মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে চূড়ান্তভাবে রায় ঘোষণা হবে। হলি আর্টিজানের হামলার পর পুলিশসহ সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি তৎপরতা দমনে কাজ করে যাচ্ছে। এতে স্বল্প সময়ের মধ্যে জঙ্গি তৎপরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads