• বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ ২০২১, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৭
কুমিল্লায় এক বছরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৩১

প্রতীকী ছবি

অপরাধ

তবু কমেনি মাদকের আমদানি-কেনাবেচা

কুমিল্লায় এক বছরে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৩১

  • খায়রুল আহসান মানিক, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ০৩ জুলাই ২০১৯

কুমিল্লায় মাদক নিয়ন্ত্রণে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কিংবা পুলিশের নিয়মিত ধরপাকড়-অভিযান অব্যাহত থাকলেও মাদকদ্রব্য আমদানি ও কেনাবেচায় ব্যবসায়ীরা এখনো সক্রিয় রয়েছেন। গত এক বছরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিদের সঙ্গে প্রায় অর্ধ শতাধিকবার বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। ওইসব ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩১ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি-নিহতরা জেলার শীর্ষ মাদকবিক্রেতা। তবে জেলার সচেতন ব্যক্তিদের দাবি-যারাই মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাচ্ছে, তারা সবাই খুচরাবিক্রেতা। কারণ গত এক বছরের মাথায় অর্ধ শতাধিকবার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩১ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হলেও জেলায় মাদকের আমদানি ও কেনাবেচা কমেনি। বরং বেড়েই চলেছে।

কুমিল্লা জেলার ১৭ উপজেলার মধ্যে সীমান্তবর্তী পাঁচটি উপজেলা রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে মাদক আমদানি ও কেনাবেচার মধ্যে অন্যতম ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা। ভারতের সীমান্তবর্তী উপজেলাটির একাধিক স্থানে মাদকের বেচাকেনা অনেকটা ওপেন সিক্রেট। এ ছাড়াও রয়েছে বুড়িচং, সদর, সদর দক্ষিণ এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলা। প্রতিদিনই ওই সব উপজেলার সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিজিবি লাখ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য আটক করছে। মাদক আমদানি ও কেনাবেচা করতে গিয়ে আটক হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও র্যাবের হাতে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্যসহ খুচরাবিক্রেতারা আটক হচ্ছেন।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাদকের ভয়াবহতা রোধে গত বছরের ৪ মে থেকে দেশব্যাপী অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই ঘোষণার পর কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুলিশসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগ মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে। গত বছরের ৩০ মে থেকে চলতি বছরের ১৬ জুন পর্যন্ত পুলিশ, র্যাব এবং বিজিবির অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩১ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত ১৬ জুন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ভারতীয় সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আবুল হোসেন হাসেম (৩৫) নামে এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হন। এর আগে গত বছর দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযানের ঘোষণার

পর কুমিল্লায় সর্বপ্রথম জেলার বুড়িচং থানা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মো. রুছমত আলী (৪০) নিহত হন।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমি কখনোই একমত না। ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে অপরাধীদের হত্যা না করে বিচারের আওতায় আনা হোক। আর যদি হত্যা করতেই হয়, তাহলে সীমান্ত দিয়ে যারা মাদক প্রবেশে সহযোগিতা করছেন, তাদের হত্যা করা হোক। খুচরাবিক্রেতাদের নয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ না করলে ব্যবসায়ীরা বিক্রি করবে কীভাবে? সেবকও নেশা করবে কীভাবে? তাই সমাধান হচ্ছে, সীমান্তে প্রশাসন কঠোর হতে হবে। আমদানি ও মাদকের গডফাদার ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেন, মাদক কেনাবেচা এবং মাদক কারবারের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। তার মানে এই নয় যে, বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। নারী নেত্রী ইয়াসমিন রীমা বলেন, সামাজিক ভয়াবহতাকে রুখতে অনেক সময় শাসনব্যবস্থায় বিচারবহির্ভূত কাজকে প্রশ্রয় দিতে হয়। মাদকের ভয়াবহতা যখন গোটা সমাজ জাতিকে বিশেষ করে তরুণদের ধবংস করছিল, তখন পাতানো ‘বন্দুকযুদ্ধ’ সেই ধ্বংসকে পুরো রক্ষা করতে না পারলেও মাত্রারিক্ততা হ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচারহীন হত্যাকে সমর্থন না করলেও সহমত পোষণ করি। তিনি বলেন, আগে দেশের ভবিষ্যৎ বাঁচুক পরে আইনকানুন।

গণজাগরণ মঞ্চ কুমিল্লার মুখপাত্র ও সংগঠক খায়রুল আনাম রায়হান বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কোনো সমাধান নয়, এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ড মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য নয় এবং আইনগতভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। সমাধান করতে হলে মানুষকে সচেতন করতে হবে এবং মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। কুমিল্লা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, মাদক সেবন যেমন নেশা, ঠিক মাদক ব্যবসাও তেমন। মাদক সেবনকারীরাই ব্যবসা করে। পুলিশসহ র‍্যাব, বিজিবি এবং মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থার হাতে প্রতিদিনই মাদকদ্রব্য জব্দের সঙ্গে আটক হচ্ছে ব্যবসায়ীরা। স্বাভাবিকভাবে পুলিশ তাদের মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠায়, এটাই সমাধান নয়। এ ছাড়াও সরকারের ঘোষণার পর অভিযানে জেলা পুলিশ এবং র‍্যাব-বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৩১ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। সমাজকে মাদক মুক্ত করতে ধরপাকড়, অভিযান এবং ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কোনোটাই সমাধান নয়। সমাজকে মাদক মুক্ত করতে হলে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিয়ে নিজের পরিবার থেকেই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads