• শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬
ads

অপরাধ

ক্ষমতার সঙ্গে বদলায় ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রণ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসে ক্লাব ও ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রণে। তবে প্রশাসনের ছত্রছায়া থাকে আগের মতোই। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে তাদের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হয়েছে এসব ক্লাব ও ক্যাসিনো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্লাব, ক্যাসিনো ও পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে চাঁদাবাজি যেন ওপেন সিক্রেট। তবে অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন সময় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন রাজনৈতিক মদতদাতারা। প্রভাবশালীরা এরই মধ্যে তৎপর হয়ে উঠেছেন অভিযান আটকে দিতে। শেষ পর্যন্ত শুদ্ধি অভিযান কতটা কার্যকর করা যাবে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ক্ষমতাসীনদের সংগঠনগুলো। এসব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রভাবশালীরা নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছেন। তবে কখনোই মনোযোগ দেওয়া হয়নি ক্লাবের মূল কর্মকাণ্ডে।

জানা গেছে, জুয়া ও ক্লাবগুলোর টাকা যেত রাজনৈতিক নেতাদের পকেটে। বিএনপির শাসন আমলে এসব নিয়ন্ত্রণ করতেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। আর মাসোহারা পেতেন স্থানীয় পুলিশও। গত বুধবার রাজধানীর চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান ও একটি ক্যাসিনোর মালিককে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য বেরিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মত, ক্লাবগুলো গড়ে তোলা হয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়ার প্রসারে। কিন্তু কার্যত তার ধারে-কাছেই নেই এসব ক্লাব। একসময় আলোচিত হাওয়া ভবন থেকে এসব নিয়ন্ত্রণ করা হলেও ক্ষমতার পালবদলে এসব এখন আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের লোকদের নিয়ন্ত্রণে।  

‘এই সরকার ঢাকাকে ক্যাসিনোর শহর বানিয়েছে’— বিএনপির একাধিক নেতা শুক্রবার এমন মন্তব্য করেছেন। অপরদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল  দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকাকে ক্যাসিনোর শহর বানিয়েছে বিএনপি। তাদের সময় এই ক্যাসিনোগুলো ছিল। সে ক্যাসিনোর ব্যাপারে অ্যাকশন তো নেওয়া হচ্ছে।

এলিট ফোর্স র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম জানিয়েছেন, অবৈধ ক্যাসিনো নিয়ে আরো তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিশ্চিত তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আরো অভিযান হবে।

গত বুধবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সভায় দলীয় নেতাকর্মীদের অপরাধ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। গত বৃহস্পতিবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ছাত্রলীগের পর যুবলীগ ধরেছি। বুধবারের অভিযানের পর গতকাল বৃহস্পতিবার আর কোনো অভিযান হয়নি। তবে আতঙ্ক ভর করেছে সরকারি দলের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে, যাদের প্রায় সবাই যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে রয়েছেন। অনেকে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে আটক ও গ্রেপ্তার এড়াতে দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে গতকাল আটক করা হয় যুবলীগ নেতা জি কে শামীমকে।

অবশ্য চার ক্যাসিনোতে অভিযানের পর অভিযান বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ বলছে, অভিযান চালিয়ে রাজধানীর ৫৬ ক্যাসিনো বন্ধ করা উচিত। একই সঙ্গে ক্লাবগুলোতেও অভিযান চালানো দরকার। ক্লাব ঘিরে যে অবৈধ বাণিজ্য চলছে সেটিও নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন, প্রভাবশালীদের চাপে এ অভিযান আর এগোবে না। এই ফাঁকে ক্যাসিনোর মালিক ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সবকিছু গুটিয়ে ফেলছেন। আর ক্লাবগুলো থেকে বিদায় দিচ্ছেন প্রভাবশালীরা।

তবে আলাপকালে সরকারি-বেসরকারি অনেকে আকস্মিক এই অভিযানের নেপথ্যে নানা কারণ জানতে চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তির পর এই শুদ্ধি অভিযান কি না প্রশ্ন তুলছেন তারা।

তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, শুদ্ধি অভিযানের ধরন পাল্টালেও সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সম্মতিতে শুদ্ধি অভিযান চলবে।  

অনেকে বলছেন, ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা গডফাদারদেরও পাত্তা দিচ্ছিলেন না। অনেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চাপের মুখে রাখছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তাদের কর্মকাণ্ডের খবর পৌঁছায়। যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, এই ক্যাসিনোগুলো হঠাৎ গড়ে ওঠেনি, তাহলে অনেক দিন কী চলছিল। কারাই বা চালাচ্ছিলেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এসব জানতেন। কিন্তু ব্যবস্থা নেননি কেন?

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকায় কিছু অবৈধ ক্যাসিনো চলছিল বলে শুনছিলাম। সে অনুযায়ী কাল রাতে ক্যাসিনো সিলগালা করা হয়েছে। সেগুলো অনুমতি ছাড়া গড়ে উঠেছিল। এর আগেও খবর আসছিল কলাবাগান ক্লাবের বিষয়ে। সেটা বন্ধ করা হয়েছে। কারওয়ানবাজারে একটি হয়েছিল, সেটাও বন্ধ করা হয়েছে। তবে শুক্রবার কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ঘিরে অবস্থান নেয় র্যাব।

আরেক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কে কতখানি জড়িত, কে কতখানি সহযোগিতা করেছে, কে কতখানি ব্যবস্থা নিয়েছে, এগুলো তদন্তের পর জানা যাবে। তদন্তের পর বেরিয়ে আসবে কে কোনটার সঙ্গে জড়িত ছিল, কার কতখানি ভূমিকা ছিল। এখানে যদি প্রশাসনের লোক জড়িত থাকে বা সহযোগিতা করে থাকে, তাহলে তিনিও আইনানুযায়ী বিচারের আওতায় আসবেন।

মতিঝিল থানার এক কিলোমিটারের মধ্যে আটটি ক্লাব। এর মধ্যে রয়েছে ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, সোনালী অতীত ক্রীড়াচক্র, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ক্লাব ও মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। থানার সামনে বছরের পর বছর এসব ক্লাবে জুয়া ও মাদক ব্যবসা চলে আসছিল। তবে গতকাল এসব ক্লাবে তালা ঝুলতে দেখা গেছে।

দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাবের পাশের এক দোকানদার জানিয়েছেন, এই ক্লাব ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকত। দলে দলে মানুষ আসত এখানে। বুধবার রাতে র্যাবের অভিযানের পরপরই ক্লাবে তালা মেরে পালিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতারা।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা শুক্রবার আলাপকালে বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে গুলশান, উত্তরা ও মতিঝিল এলাকায় গড়ে ওঠা ক্লাবগুলোর সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ আছে। এসব ক্লাবে যেমন পুলিশি পাহারা থাকত, তেমনি ক্লাবে কোনো বিরোধ হলে তা পুলিশই মেটাত। অনেক পুলিশ সদস্যের নিয়মিত যাতায়াত ছিল এসব ক্লাবে। অনেকে এটাকে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের আয়ের উৎস মনে করেন। অবশ্য এখন দায় যাচ্ছে রাজনৈতিক নেতাদের ওপরে।

জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশনের পর বিদেশে পাড়ি দিতে যাচ্ছেন অনেক প্রভাবশালী। তবে অনেকেই রয়েছেন গোয়েন্দা নজরদারিতে। ফলে রাজনৈতিক শিবিরে একটি থমথমে পরিস্থিতি চলছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads